দৈনিক সংগ্রাম। ৫১বছরের সময়ের সাহসী কণ্ঠস্বর। শুধু সাহসীই নয়, সময়ের সেরা সাহসী কণ্ঠস্বর। সাহসী কণ্ঠস্বরকে যুগেযুগে অপশক্তিরা সবসময় থামিয়ে দিতে চেষ্টা করেছে। তাদের প্রচেষ্টা কখনো কখনো পাহাড়সম বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই বাঁধা ডিঙিয়ে আজ এ পত্রিকা বুক উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে বাংলার জমিনে। সবচেয়ে বড় কথা হলো-পত্রিকার নামের মধ্যেই একটা স্পিরিট কাজ করে। নাম উচ্চারণেই সাহস যেন আরো দ্বিগুণ হয়ে যায়। সংগ্রাম। আন্দোলন, প্রতিদিন সংগ্রাম, প্রতিদিন আন্দোলনÑ ভোর হতেই যেন এই আন্দোলনের যাত্রা শুরু। এ যেন সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে আন্দোলন, সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে এ আন্দোলন। প্রতিদিন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় সত্য প্রতিষ্ঠা না করলে এ দেশ এগিয়ে যাবে না।
এদেশে পত্রিকার জন্ম হতে হতে আজ এত পত্রিকা জন্মেছে যে তাদের নামই কয়জনে বা মুখস্ত রাখে? পত্রিকা জন্মের পিছনের ইতিহাস থাকে। থাকে জেগে উঠার কারণ। কিন্তু দৈনিক সংগ্রাম জন্মেছে স্বাভাবিক সংবাদ প্রচার তুলে ধরতে নয়, কেবল সংবাদ প্রচার মাধ্যম হিসেবে এদেশের স¦াভাবিক সব খবর সংগ্রহ করে জনসম্মুখে তুলে ধরতে জন্মেনি। সত্য মিথ্যা সংমিশ্রণে ভুয়া সংবাদ উপস্থাপন করতে তার জন্ম হয়নি। এমপি মন্ত্রীদের পা চাটা গোলামী করতে জন্ম নেয়নি। এদেশের ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা, বিজয়, ঐতিহ্য, বীরগাথা ও সংস্কৃতি প্রচারে এর অগ্রণী ভূমিকা থাকবে এদিক কেন্দ্র করেও এর জন্ম হয়নি। দৈনিক সংগ্রামের জন্ম হয়েছে সত্য মিথ্যার সংমিশ্রণ ঠেকাতে, স্বাভাবিক সংবাদগুলোকে মানুষের অন্তরে পৌঁছে দিতে, স্বাভাবিক খবর সংগ্রহগুলোকে বিশ্বস্তভাবে জনসম্মুখে তুলে ধরতে, ইতিহাসের পিছনের ইতিহাসকে সামনে আনতে, মুক্তিযুদ্ধের পিছনের প্রকৃত মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ফোকাস করতে, স্বাধীনতার পিছনের প্রকৃত স্বাধীনতার মূল চেতনার আয়না হয়ে বিজয়ের শুভেচ্ছা নয় বিজয়ের গভীর আস্বাদ পাবার গল্পকে আত্মস্থ করতে, ঐতিহ্যকে সত্যিকার ঐতিহ্যের রূপায়ন ঘটাতে, বীরগাথা নয় প্রকৃত বীরের প্রকৃত দেশ প্রেমের উদ্বুদ্ধ প্রেরণার দিক নির্দেশনার জন্যে, সংস্কৃতি নয়, সংস্কৃতিকে অপ-সংস্কৃতির থেকে আলাদা করে সভ্য রুচিশীল সংস্কৃতির দ্বার উন্মোচনে এ পত্রিকার জন্ম।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান তার অনন্য দৃষ্টান্ত। তথাকথিত রাজনীতি যে দেশকে গিলে খেয়েছে, হজম করার পূর্বেই এদেশে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান এ দেশকে নতুন করে স্বাধীন করেছে। যে দেশে দিনদিন ইসলামকে, ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের অবজ্ঞা, অবহেলা, অপমান করা হচ্ছে সেদেশে জুলাই বিপ্লব কেবল দরকারই ছিল না বরং নামাজ-রোজার মতো ফরজ ছিল। আমার দেশের তরুণ প্রজন্মরা দেখিয়ে দিয়েছে-তোমরা টুপি দাড়িওয়ালাদের, কুরআন হাদিসের কথা বলনেওয়ালাদের মুখ সাময়িক বন্ধ রাখতে পারলেও একসময় নিজেদের মুখ স্থায়ী বন্ধের ইতিহাস হবে। হলোও তাই। আমি শাসন দেখেছি, এরকম বিকৃতমনা শাসন দেখিনি। ২০২৩ সালের একটি ঘটনার কথা না বললেই নয়, বাংলাদেশ টেলিভিশনে ছন্দিত নন্দিত অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হয়ে গিয়েছিলাম। অনুষ্ঠানটি উপভোগের মতই ছিল। কারণ, এটা ছিল টেলিভিশনে করা আমার জীবনের প্রথম অনুষ্ঠান। বুঝতেই পারছেন কতটা আগ্রহ নিয়ে গিয়েছিলাম! অনুষ্ঠান শুরুর সামান্য পূর্বে হঠাৎ প্রসিউডর, কলাকুশলীরা আমার কাছে এসে বললেন হুজুর, আপনার টুপিটা খুলে ফেলতে হবে। আমি বললাম কেন? -“এ অনুষ্ঠান কবিতার, এখানে টুপি চলবে না।” আমি গভীর ভাবে আহত হলাম। আমি চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালাম, আবার তাৎক্ষণিক নিজেকে শান্ত রেখে বসে পড়লাম। ভাবলাম, যদি প্রতিবাদ করি তাহলে আমার অনুষ্ঠান করা হবে না, তারা আমাকে বের করে দিবে। তারচেয়ে বরং আমার চেয়ারটা দখলে রাখি পরবর্তী সময়ের ইতিহাসের জন্যে। যে সময়টার কথা বলছি সেসময়টায় আমার ধারণা হয় যে, একজন হুজুর কবিতা লিখতে পারবে না, কবি হতে পারবে না, সাহিত্যিক হতে পারবে না, যদি কবি হতে হয় তাহলে তাকে টুপি দাড়ি পাঞ্জাবি বাদ দিতে হবে। এ কেমন বাংলাদেশ! কবিতার অনুষ্ঠানে একজন হুজুর যদি টুপি পরে অনুষ্ঠান করতে না পারে তাহলে এ কীসের স্বাধীনতা? মাস দু‘এক পর আবার গেলাম ছন্দিত নন্দিত অনুষ্ঠানে। এবার রেকর্ডিং হবে আউট ডোওে, বাগানে ও প্রকৃতির কাছে, খোলামেলা। সেজেগুজে যখন ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালাম, ঠিক তখন সেই একই বাঁধা এলো-“হুজুর টুপি খুলে ফেলুন। টুপি চলবে না।” আমি হেসে বললাম, “থাকুক না, চালিয়ে দিই।” -না, চলবে না, আপনাকে টুপি ছাড়াই অনুষ্ঠান করতে হবে। আগের বার যেমন করেছিলেন।” আমি আবারও আহত হলাম। আমার পরনে ছিল লম্বা জুব্বা। সে কারণেই কী না? তো এ অনুষ্ঠানও টুপি বিহীন করলাম। একটা জাতীয় প্রোগ্রাম, কোটি কোটি লোক দেখবে। একজন মাওলানা কবিতা পাঠ করছেন, মুসলিম দেশ হিসাবে যেখানে গর্বের কথা , সেখানে টুপি পরিধান করে কবিতা পাঠ করা হলে দেশের কলঙ্ক হয়? তার মানে হলো সমস্যা টুপি-জুব্বাতে, পাঞ্জাবিতে। একজন মাওলানা টুপি পরিধান করে কবিতা পাঠ করবে কোটি মানুষ তা দেখবে এটা তাদের সহ্য হয়নি। এভাবে তারা মুসলমানদের কোণঠাসা করে রেখেছে যুগের পর যুগ, জেল জুলুম হত্যা, ফাসি তো আছেই। এতো গেলো মিডিয়ার কথা। দেশের নামি দামি জাতীয় পত্রিকাগুলোও আমার সাথে একই আচরণ করেছে। ফলে আমাকে টুপি বিহীন ছবি ফেইসবুকে রাখতে হয়েছে। যখন টুপি দাড়িওয়ালার ছবি দেখলো তখন অনেক মহিলা কবি, হুজুর বিদ্বেষী কবি আমার কবিতায় লাইক কমেন্ট করেন না। এমন কি কয়েকজন কবি আমাকে “হুজুর কবি” বলে কটাক্ষ করেছে। মুসলিম দেশ হিসেবে একজন মাওলানা কবিতা লিখলে দোষের হয়ে যাচ্ছে। আর মাওলানারা তাদের বিরুদ্ধে ফতোয়া দিলেই তারা রাজাকার , রাজাকারের সন্তান হয়ে যাচ্ছে। এ জন্যই তো দেখি দেশের সনামধন্য পত্রিকাগুলো সৈয়দ আলী আহসান, আল মাহমুদের মতো মহান কবিদের জন্মদিনে সাহিত্যপাতা এতো সংকির্ণ কেন করে? অথচ প্রসিদ্ধ নয় এমন কবিদের জন্মদিনে পৃষ্ঠার পৃষ্ঠা তাদের লেখা, জীবন ও কর্ম নিয়ে ছাপা হয়। কবি ফররুক আহমদ তো তাদের কাছে কোনো কবিই নন।
জীবনে প্রথম “দৈনিক সংগ্রাম”এ আমার একটা কবিতা প্রকাশ হলে ফেইসবুকে পোস্ট করায় ঘটলো এক বিপত্তি। ম্যাসেঞ্জারে কবিরা এসে পরামর্শ দিলেন-“কবি, সংগ্রামে লেখা পাঠাবেন না, তাহলে আপনি কোণঠাসা হয়ে পড়বেন। দেশের অনেক খ্যাতনামা পত্রিকাগুলো আপনার লেখা ছাপবে না। তারা আপনাকে বর্জণ করবে।”
অনেক কবি ফোন করে বললেন,“ সর্বনাশ! আর সংগ্রামে লেখা পাঠাবেন না, তাহলে আপনার ক্যারিয়ার নষ্ট হয়ে যাবে। আপনি চিহ্নিত হয়ে যাবেন।” বেশ অবাক হলাম। কয়েক মাস থেমে থাকলাম। দেখলাম অন্যান্য জাতীয় দৈনিকগুলোকে। তারা কবি ছাপে, কবিতা নয়। তারা ফেইস ভ্যালুতে বিশ্বাসী। তারা কোনো পরিচয় ছাড়া কবিতা ছাপে না, কোনো যোগাযোগ ছাড়াও কবিতা ছাপে না।
আরও জানলাম পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদককে টাকা দিতে হয়। তারা টাকার বিনিময়ে লেখা ছাপে। আবার কিছু সম্পাদক আছেন যাদের ফেইসবুক পোস্টে লাইক কমেন্ট না করলেও লেখা ছাপবে না। আমি এগুলোর একটি করতেও রাজি নই।
বেশিরভাগ জাতীয় পত্রিকার এ অবস্থা দেখে আমার অন্তর চোখ খুলে গেল। আমার সিদ্ধান্ত নিতে সহজ হলো। পার্থক্য করতে দৈনিক সংগ্রামে আবার লেখা পাঠাতে থাকলাম, তারা ছাপতেও থাকলো। ভুল ভেঙ্গে গেলো আমার। ঐ সম্পাদকদের গুনাহর সাথে শরিক হতে চাই না। আমরা যারা লিখি তারা নিজেরাই যদি অসৎ, মিথ্যার বিরুদ্ধে না দাঁড়াই তাহলে লিখছি কেন? আমরাই চোর, আমরাই মিথ্যুক আবার আমরাই লেখক, কবি সাহিত্যিক। বিষয়টা নিজের কাছে ঘৃণার। এখানে স্পষ্ট করা প্রয়োজন যে, দৈনিক সংগ্রামে আমি যতবার লেখা পাঠিয়েছি ততবারই লেখা ছেপেছে যদি সে লেখাটা মানসম্মত হয়েছে। কিন্তু একটিবারের জন্যে হলেও সাহিত্য সম্পাদকের সাথে আমার কোনো যোগাযোগ হয়ে উঠেনি কিংবা কোনো পরিচয়। যদিও পরবর্তী সময়ে চেনা জানা হয়েছে। নিরহংকারী, সদা সদালাপী,নির্মোহ এই সরল হাস্যপ্রাণ সাহিত্য সম্পাদক মহোদয়ের আরেকটি কাজ খুবই প্রশংসার। যাদের লেখা পত্রিকায় প্রকাশ হবে তাদেরকে প্রকাশের পূর্বেই জানিয়ে দেওয়া হয় যে,আপনার কবিতা আগামীকাল যাচ্ছে। এই যে সংবাদ দেওয়া এটা ছোট করে দেখার বিষয় নয়। কোনো পত্রিকা মাসের পর মাস, লেখা ছাপবে এই নিশ্চয়তাটুকু আমাদেরকে দেয় না। ছাপলেও না। এ জন্যই আমি নির্দ্ধিধায় বলতে পারি দৈনিক সংগ্রাম কবিতা ছাপে, কোনো কবি নয়। পরিচিত মুখ ছাপে না, লেখার মান ছাপে। টাকার বিনিময়ে নয়, সম্মান ছাপে। এই যে মূল্যায়ন, এই যে পরিচ্ছন্নতা যে পত্রিকায়, সেখানে লেখা পাঠালে যদি আমার পুরো বাংলাদেশ একদিকে, আর আমি এবং আমার পত্রিকা একদিকে তবু ভয় পাই না। সংগ্রামে লিখে যদি পঁচে যাই, মূল্যায়িত না হই, বিবর্জিত হই, তবু আমার সামান্যতম আপসোস থাকবে না।
কারণ সংগ্রাম শুধু পত্রিকার নাম নয়, এটা সত্যের মানদন্ড, অপশক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে শেখায়। তাই দৈনিক সংগ্রাম আমার দেখা দেশের সর্বোচ্চ মানের সেরা দৈনিক। আমি আজীবন এই একটি পত্রিকার লেখক হয়েই বেঁচে থাকতে চাই, আদর্শ বর্জিত, নীতি-নৈতিকতা হারানো পত্রিকার সংস্পর্শে নিজেকে বিকিয়ে দেওয়ার চেয়ে দৈনিক সংগ্রামের যে আদর্শ, সততা, নির্ভীকতা, নৈতিকতা, সত্য বলার যে সাহসী ভূমিকা এ রকম আদর্শে বলিয়ান ২৪ এর জুলাই বিপ্লবের দ্বার উন্মোচন করতে পেরেছে। লেজ ভাঙা, আত্মবিক্রি করে দেওয়া সম্পাদকগণ জুলাই বিপ্লবের আদর্শে উজ্জিবীত হয়ে দেশ গড়ার স্বপ্নও তারা দেখতে পাবে না।
চাটুকাররা কোনোদিন কোনো বিপ্লবের জন্ম দিতে পারেনি, নতুন দিনের সূচনা করতে পারেনি, আর পারবেও না। তাই আমার আহ্বান, দেশের সর্বস্তরের লেখকদের প্রতি দৈনিক সংগ্রামের ৫১ তম জন্মদিনে শুভকামনা জানাই। তার আদর্শে আদর্শিত হই, নতুন দেশ গড়ার অঙ্গীকার করি। নিজেও দেশের আদর্শ লেখক হিসেবে, সৎ ও নির্ভীক লেখক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করি।