বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে দৈনিক সংগ্রাম একটি অনন্য নাম। ৫১ বছর ধরে এই পত্রিকা সত্য, ন্যায় ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করে আসছে। স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত নানা প্রতিকূলতা, চাপ ও বাধা-বিপত্তি সত্ত্বেও সংগ্রাম তার পথচলা অব্যাহত রেখেছে। বিশেষ সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নায়েবে আমীর সাবেক সংসদ সদস্য ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের দৈনিক সংগ্রামের অবদান, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সমাজ ও অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং পাঠকদের উদ্দেশ্যে বার্তা তুলে ধরেছেন।
সাক্ষাতকারটি নিয়েছেন দৈনিক সংগ্রাম এর বার্তা সম্পাদক সামছুল আরেফীন।
দৈনিক সংগ্রাম: দৈনিক সংগ্রাম ৫১ বছর পূর্ণ করলো। আপনি দৈনিক সংগ্রামের অবদান কীভাবে মূল্যায়ন করেন?
ডা. তাহের: দৈনিক সংগ্রাম বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। ৫১ বছর ধরে সংগ্রাম সত্য, ন্যায় ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করেছে। বিশেষ করে ইসলামি মূল্যবোধ, গণতন্ত্র ও জনস্বার্থের পক্ষে এর অবস্থান প্রশংসনীয়। আমি মনে করি, সংগ্রাম সত্য ও ন্যায়ের পথে চলার এক উজ্জ্বল বাতিঘর।
সংগ্রাম কখনো হলুদ সাংবাদিকতার গড্ডলিকা প্রবাহে গা ভাসায়নি। বরং সব সময় সত্যের অনুসন্ধানে নির্ভীক থেকেছে। স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত সংগ্রাম দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতার প্রতি গভীর শ্রদ্ধাশীল থেকেছে। সাংবাদিকতার নীতিমালা ও পেশাদারিত্ব বজায় রেখে জনগণের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছে।
দৈনিক সংগ্রাম: বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা কীভাবে তুলে ধরবেন?
ডা. তাহের: জামায়াতে ইসলামী সবসময় জনগণের পাশে থেকেছে। আমরা গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, ন্যায়বিচার ও জনগণের অধিকার রক্ষায় কাজ করছি। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আমাদের ভূমিকা হলো জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করা, অন্যায় ও জুলুমের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এবং একটি সুশাসনভিত্তিক রাষ্ট্র গড়ে তোলার জন্য কাজ করা।
আমরা বিশ্বাস করি, রাজনীতি মানে জনগণের কল্যাণ। তাই আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপ জনগণের স্বার্থে। আমরা চাই, বাংলাদেশে একটি আদর্শ ও জবাবদিহিমূলক শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হোক। জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা হোক। গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হোক।
দৈনিক সংগ্রাম: আপনি কি মনে করেন, বাংলাদেশ এখন ফ্যাসিবাদ-উত্তর রাজনৈতিক পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছে?
ডা. তাহের: বাংলাদেশ এখনও পুরোপুরি ফ্যাসিবাদ-উত্তর পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। জনগণের আন্দোলন ও ত্যাগের ফলে পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে, তবে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হলে আরও অনেক কাজ করতে হবে।
সুশাসন, জবাবদিহি এবং জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হলে আমরা কাক্সিক্ষত অবস্থায় পৌঁছাতে পারব না। আজও আমরা দেখি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বাধাগ্রস্ত, ভোটাধিকার হরণ করা হচ্ছে। এগুলোই প্রমাণ করে যে আমরা এখনও ফ্যাসিবাদ-উত্তর পরিস্থিতি থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারিনি।
দৈনিক সংগ্রাম: দারিদ্র্য, বেকারত্ব, শিক্ষা ও নৈতিক অবক্ষয়Ñএই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলায় জামায়াতের দৃষ্টিভঙ্গি কী?
ডা. তাহের: আমরা বিশ্বাস করি, দারিদ্র্য ও বেকারত্ব দূর করতে হলে উৎপাদনমুখী অর্থনীতি গড়ে তুলতে হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকদের জন্য সুদবিহীন ঋণ সুবিধা দিতে হবে। শিল্পে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির চার্জ না বাড়িয়ে উৎপাদনকে উৎসাহিত করতে হবে।
শিক্ষা ব্যবস্থায় সংস্কার আনতে হবে, যাতে তরুণ প্রজন্ম নৈতিকতা ও দক্ষতায় সমৃদ্ধ হয়। মেধা ও প্রয়োজনের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের জন্য সুদমুক্ত শিক্ষাঋণ দিতে হবে। বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সুযোগ করে দিতে হবে। নারী শিক্ষার প্রসারে বড় উদ্যোগ নিতে হবে।
নৈতিক অবক্ষয় রোধে ইসলামি মূল্যবোধকে সমাজে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সমাজে নৈতিক শিক্ষা জোরদার করতে হবে।
দৈনিক সংগ্রাম: বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী, বিশেষ করে সীমান্ত সমস্যা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার প্রেক্ষাপটে?
ডা. তাহের: বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক পারস্পরিক সম্মান ও সমতার ভিত্তিতে গড়ে উঠতে হবে। সীমান্তে বাংলাদেশিদের হত্যা, নদীর বাঁধ কেটে দেওয়া, একতরফা পানি প্রত্যাহারÑএসব আচরণ বন্ধ করতে হবে। অর্থনৈতিক সহযোগিতাও হতে হবে ন্যায্যতার ভিত্তিতে, যেন বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
আমরা চাই, প্রতিবেশী সম্পর্ক হবে বন্ধুত্বপূর্ণ, তবে জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় কোনো আপস করা যাবে না। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আমরা আপসহীন।
দৈনিক সংগ্রাম: গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছেÑআপনার দৃষ্টিতে এর কারণ ও সমাধান কী?
ডা. তাহের: গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বাধাগ্রস্ত হওয়ার মূল কারণ হলো রাজনৈতিক চাপ ও মত প্রকাশের প্রতি অসহিষ্ণুতা। এর সমাধান হলো গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি শক্তিশালী করা, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জনগণকে সচেতন করা।
স্বাধীন গণমাধ্যম ছাড়া গণতন্ত্র টেকসই হয় না। তাই গণমাধ্যমকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। সাংবাদিকদের ওপর হামলা বন্ধ করতে হবে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে।
দৈনিক সংগ্রাম: আগামীর বাংলাদেশ কেমন দেখতে চান?
ডা. তাহের: আগামীর বাংলাদেশ বিনির্মাণে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মূল লক্ষ্য হলো একটি ইনসাফভিত্তিক, মানবিক ও শোষণমুক্ত মডেল রাষ্ট্র গঠন করা। জামায়াত কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, বরং প্রতিটি নাগরিকের জানমাল ও সম্মানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায়। তাদের পরিকল্পনায় রয়েছেÑদক্ষ ও নৈতিকতাসম্পন্ন জনশক্তি গড়ে তোলা, বেকারভাতার বদলে সম্মানজনক কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠা করা।
ইসলামী মূল্যবোধই হবে আধুনিক ও বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার মূল ভিত্তি। বিশেষ করে নারীদের অধিকার ও নিরাপত্তা রক্ষায় জামায়াত আপসহীন। তিনি সাম্প্রতিক এক সংবাদ সম্মেলনে নারী কর্মীদের ওপর চলমান হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, নারীর সম্মান ও কণ্ঠ রুদ্ধ করে প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। জামায়াতের আগামীর বাংলাদেশ হবে দুর্নীতিমুক্ত, স্বনির্ভর এবং প্রতিটি ধর্মের মানুষের জন্য সমান অধিকারের এক নিরাপদ জনপদ। তিনি বিশ্বাস করেন, জনগণের আস্থা ও নৈতিক নেতৃত্বের মাধ্যমেই একটি নতুন ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়া সম্ভব।
আমরা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তায় গুরুত্ব দেব। আমরা চাই, একটি উন্নত ও আত্মমর্যাদাশীল বাংলাদেশ গড়ে উঠুক। যেখানে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি থাকবে। ব্যবসাবান্ধব নীতি থাকবে। তরুণদের জন্য স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম থাকবে। আইসিটি খাতকে উন্নত করে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলা হবে।
দৈনিক সংগ্রাম: দৈনিক সংগ্রামের পাঠক ও শুভানুধ্যায়ীদের উদ্দেশ্যে আপনার বার্তা কী?
ডা. তাহের: আমি পাঠকদের আহ্বান জানাই-আপনারা সত্য ও ন্যায়ের পাশে থাকুন, স্বাধীন সাংবাদিকতাকে সমর্থন করুন। দৈনিক সংগ্রাম ৫১ বছর ধরে জনগণের কণ্ঠস্বর হয়ে কাজ করছে। ভবিষ্যতেও যেন এটি সত্য প্রকাশে সাহসী থাকে, সে জন্য আপনাদের সহযোগিতা অপরিহার্য। এই সাক্ষাৎকারে ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের স্পষ্ট করেছেন যে, জামায়াতে ইসলামী জনগণের অধিকার, গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচারের জন্য কাজ করছে। তিনি বলেছেন, দারিদ্র্য, বেকারত্ব, শিক্ষা ও নৈতিক অবক্ষয় মোকাবেলায় ইসলামি মূল্যবোধই সমাধান। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক পারস্পরিক সম্মান ও সমতার ভিত্তিতে গড়ে উঠতে হবে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। তিনি আরও বলেছেন, আগামীর বাংলাদেশ হবে একটি ইসলামী মূল্যবোধভিত্তিক রাষ্ট্র, যেখানে ন্যায়বিচার, সুশাসন ও জনগণের অধিকার নিশ্চিত হবে। দৈনিক সংগ্রামের ৫১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে তিনি পাঠকদের আহ্বান জানিয়েছেন সত্য ও ন্যায়ের পাশে থাকার জন্য।