সাংবাদিকতা একটি পেশা। রাজনৈতিক কর্মী হওয়া আরেকটি পরিচয়। দুটো এক নয়। এক হওয়া উচিতও নয়। কিন্তু বাংলাদেশে সেই সীমারেখা ক্রমেই ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে।

এখন প্রশ্ন উঠছে-সাংবাদিকরা কি সাংবাদিকই আছেন, নাকি তারা দলীয় কর্মীতে রূপান্তরিত হয়েছেন? এই প্রশ্ন হঠাৎ করে আসেনি। এটি এসেছে বাস্তব ঘটনার ভেতর দিয়ে। এটি এসেছে লজ্জাজনক কিছু নজিরের মধ্য দিয়ে। এটি এসেছে নীরবতার পাহাড় ডিঙিয়ে।

কিছুদিন আগে অনুষ্ঠিত গণমাধ্যম সম্মিলনে প্রবীণ সাংবাদিক শফিক রেহমান ডেইলি স্টার ও প্রথম আলোর উদ্দেশ্যে সরাসরি কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, ‘আপনাদের যখন দালাল বলা হয়, আমার দুঃখ লাগে।’ এরপর আরও গুরুতর কথা বলেছেন। যারা কদিন আগেও আওয়ামী লীগের পক্ষে ছিলেন, তারা এখন সবাই বিএনপির পক্ষে হয়ে গেছেন-এটা কি ম্যাজিক?

এই বক্তব্যের প্রতিবাদ হয়নি। কারণ হলো-কেউ সাহস পায়নি। আরও একটি কথা তিনি বলেছেন। যখন নয়া দিগন্ত, দৈনিক সংগ্রাম আক্রান্ত হয়েছিল, তখন কেউ কথা বলেনি। এই স্মরণ করিয়ে দেওয়া ছিল নির্মম। এই নীরবতার রাজনীতি অনেক কিছু প্রকাশ করে।

গণমাধ্যম সম্মিলনের আয়োজক ছিল নোয়াব ও সম্পাদক পরিষদ। মূলত এর পেছনে ছিল ডেইলি স্টার ও প্রথম আলো। অর্থাৎ যাদের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন, তারাই মঞ্চের কেন্দ্রে।

এই প্রতীকী চিত্রটিই বর্তমান গণমাধ্যম বাস্তবতার সারসংক্ষেপ। আজ এমন অবস্থা দাঁড়িয়েছে-কিছু সম্পাদক দলীয় কর্মীর মতো আচরণ করছেন। কিছু সম্পাদক সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে মাঠে নেমেছেন। তাদের লেখা, বক্তব্য, ভাষা শুনলে মনে হয় তারা রাজনৈতিক নেতা। এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে। যদি সম্পাদক রাজনৈতিক নেতা হয়ে ওঠেন, তাহলে সাংবাদিকতা থাকে কোথায়?

সম্প্রতি আরও ভয়াবহ একটি ঘটনা ঘটেছে। ঢাকার দুইটি সংসদীয় আসনে বিএনপি প্রার্থীর পক্ষে ৯৯ জন সাংবাদিক নিয়ে মিডিয়া টিমের কমিটি হয়েছে। হ্যাঁ, ৯৯ জন সাংবাদিক। এটি অরাজকতা ছাড়া আর কী?

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একজন লিখেছেন, ‘This is remarkable. Possibly unprecedented’ অর্থাৎ, এটি সম্ভবত নজিরবিহীন। সত্যিই কি পৃথিবীর কোথাও এমন ঘটনা ঘটেছে? একটি সংসদীয় আসনে কর্মরত সাংবাদিকদের বড় অংশ সরাসরি কোনো প্রার্থীর ক্যাম্পেইনে যুক্ত? এটি সাংবাদিকতার ইতিহাসে কালো অধ্যায়। একটি সমাজ কতটা পচে গেলে এমন দৃশ্য তৈরি হয়? একটি বিটের প্রায় সব সাংবাদিক। প্রায় সব মিডিয়া হাউসের প্রতিনিধি। একজন রাজনৈতিক ব্যক্তির নির্বাচনী মিডিয়া টিমের সদস্য। এর চেয়ে বড় কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট আর কী হতে পারে?

যাদের দায়িত্ব হলো সেই ব্যক্তিকে প্রশ্নের মুখে রাখা। যাদের কাজ হলো তার ক্ষমতার সীমা টানা। যাদের ভূমিকা হলো তার ভুল তুলে ধরা। তারাই যখন তার প্রচারক হয়ে ওঠেন। তখন সভ্য সমাজের প্রত্যাশা করা অর্থহীন হয়ে পড়ে। একজন যোগাযোগ ও গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞ বলেছেন, ‘সাংবাদিকতার ভিত্তি হলো স্বাধীনতা ও দূরত্ব। সাংবাদিক ও ক্ষমতার মধ্যে স্বাস্থ্যকর দূরত্ব না থাকলে সাংবাদিকতা আর থাকে না, থাকে প্রচারণা।’

এই কথার সঙ্গে দ্বিমত করার সুযোগ নেই। এ ধরনের সাংবাদিকের করা কোনো রিপোর্ট পৃথিবীর কোনো মানসম্পন্ন পত্রিকা অবজেক্টিভ হিসেবে গ্রহণ করবে না। কারণ বিশ্বাসযোগ্যতা শেষ হয়ে গেছে। অথচ আশ্চর্য বিষয় হলো- বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব চুপ। সামাজিক নেতৃত্ব চুপ। বুদ্ধিজীবীরা চুপ। সাংবাদিক নেতৃত্ব চুপ। এই নীরবতা কাকতাল নয়। এই নীরবতা সুবিধাভোগী নীরবতা।

একজন যোগাযোগ বিশ্লেষক বলেছেন, ‘যখন কোনো পেশাজীবী গোষ্ঠী সংগঠিতভাবে নৈতিক সীমা ভাঙে এবং ভেতর থেকে কোনো প্রতিরোধ তৈরি হয় না, তখন সেই পেশা ধ্বংসের পথে যায়।’ সাংবাদিকতায় এখন ঠিক সেটাই হচ্ছে। প্রশ্ন আসে-সংশ্লিষ্ট মিডিয়া হাউসগুলো কি জানে না যে তাদের রিপোর্টাররা দলীয় প্রার্থীর মিডিয়া টিমে?

অবশ্যই জানে। না জানার কোনো সুযোগ নেই। তাহলে তারা কী করছে? কিছুই করছে না।

কিন্তু আন্তর্জাতিক সাংবাদিকতা নীতিমালায় বিষয়টি পরিষ্কার। যদি কোনো সাংবাদিক সক্রিয়ভাবে রাজনৈতিক ক্যাম্পেইনে যুক্ত থাকেন, তাকে নির্বাচনী কাভারেজ থেকে সরিয়ে দিতে হবে। এমনকি অনেক দেশে তাকে সাময়িক বরখাস্তও করা হয়। কারণ সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতা প্রতিষ্ঠানগত বিষয়। একজন সাংবাদিকের আচরণ পুরো প্রতিষ্ঠানের ওপর প্রভাব ফেলে।

কিন্তু বাংলাদেশে উল্টো চিত্র। এখানে সম্পাদকীয় নেতৃত্ব নীরব। এই নীরবতাই সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। একজন রাজনৈতিক নেতার সমালোচনা করলে যদি সাংবাদিকরাই সেই নেতার পক্ষে ঢাল হয়ে দাঁড়ান, তাহলে তারা আর সাংবাদিক থাকেন কোথায়? তারা তখন হয়ে যান রাজনৈতিক কর্মী। এখানে একটি মৌলিক সত্য স্বীকার করতে হবে।

রাজনৈতিক অ্যাক্টিভিজম খারাপ নয়। কিন্তু সেটি সাংবাদিকতা নয়। দুই পরিচয় একসাথে বহন করা অসম্ভব। যোগাযোগ গবেষকরা বলেন, ‘সাংবাদিক যদি আগে থেকেই পক্ষ নির্ধারণ করে নেন, তাহলে তার কাছে তথ্য নয়, দলীয় স্বার্থই মুখ্য হয়ে ওঠে।’এটাই হচ্ছে বর্তমান বাস্তবতা।

সাংবাদিকদের এই সংগঠিত প্রতিক্রিয়া, কমিটি গঠন, ক্যাম্পেইনে অংশগ্রহণ- এসবকে কোনোভাবেই সাংবাদিকতা বলা যায় না। এগুলো সরাসরি রাজনৈতিক অ্যাক্টিভিজম।

আরও ভয়াবহ বিষয় হলো-এই প্রবণতা ক্রমে স্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছে। মানুষ অবাক হচ্ছে। কিন্তু ক্ষুব্ধ হচ্ছে না। প্রতিবাদ করছে না। এই স্বাভাবিকীকরণই সবচেয়ে বিপজ্জনক।

কারণ একবার নৈতিকতা ভেঙে গেলে, পরের প্রজন্ম সেটাকেই মানদণ্ড ভাববে। তখন আর সাংবাদিক তৈরি হবে না। তৈরি হবে দলীয় প্রচারক।

একটি গণতান্ত্রিক সমাজে স্বাধীন সংবাদমাধ্যম বিলাসিতা নয়। এটি মৌলিক প্রয়োজন। সাংবাদিকতা ভেঙে পড়লে গণতন্ত্র ভেঙে পড়ে। আজ বাংলাদেশের সামনে সেই বাস্তবতা। সাংবাদিক ও রাজনৈতিক কর্মীর পার্থক্য কি মুছে যাচ্ছে? দুঃখজনকভাবে উত্তর হচ্ছে-হ্যাঁ।

এখনো সময় আছে। কিন্তু সময় খুব কম। মিডিয়া হাউসগুলোকে অবস্থান নিতে হবে। সম্পাদকদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সাংবাদিক সংগঠনগুলোকে কথা বলতে হবে। সাংবাদিক সংগঠনগুলোর নেতাদের সাংবাদিক হতে হবে। দলীয় নেতারা সাংবাদিক নেতা হলে যা হবার তাই হবে। হচ্ছেও তাই। তবে এরকম চললে ইতিহাস ক্ষমা করবে না। আর জনগণও না। কারণ শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই-আমরা সাংবাদিকতা চাই, নাকি দলীয় প্রচার যন্ত্র?

এই প্রশ্নের উত্তরের মধ্যে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে।