গত ২০ জানুয়ারি ২০২৬ রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ‘পলিসি সামিট ২০২৬’ অনুষ্ঠিত হয়। এই পলিসি সামিটে বিভিন্ন প্যানেল ডিসকাশনের মাধ্যমে নতুন বাংলাদেশ গঠনের লক্ষ্যে ৩১ দফা নীতি ও কর্মসূচি ঘোষণা করে দলটি। জামায়াত ঘোষিত পলিসি নিয়ে জনমনে বেশ আশা জাগানিয়া তৈরি হচ্ছে। সাধারণ মানুষের মুখে মুখে এই পলিসি বিষয়ক আলোচনা শোনা যাচ্ছে। সত্যিকারার্থে জামায়াতে ইসলামী সমর্থিত জোট যদি সরকার গঠন করে এবং এই পলিসিগুলো বাস্তবায়ন করতে পারে তাহলে বাংলাদেশের চেহারা বদলে যাবে সহসাই সেটাই মনে হচ্ছে।

পলিসি সামিটের ঘোষিত মূল কর্মসূচির মধ্যে ছিল অর্থনীতি ও দুর্নীতি সংক্রান্ত বিষয়ের মধ্যে রয়েছে-দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ, ট্যাক্স ও ভ্যাট ক্রমান্বয়ে কমিয়ে ট্যাক্স ১৯ শতাংশ এবং ভ্যাট ১০ শতাংশে আনা, ব্যবসাবান্ধব নীতি প্রণয়ন ও সহজ লাইসেন্সিং ব্যবস্থা চালু, আগামী তিন বছরে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির চার্জ না বাড়ানো, বন্ধ কলকারখানা পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপে চালু হবে এবং ১০ শতাংশ মালিকানা শ্রমিকদের দেয়া এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকদের জন্য সুদবিহীন ঋণসুবিধা প্রদান করা।

শিক্ষা সংক্রান্ত কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে-গ্র‍্যাজুয়েশন শেষে চাকরি পাওয়া পর্যন্ত পাঁচ লাখ গ্র‍্যাজুয়েটকে সর্বোচ্চ দুই বছর মেয়াদি মাসিক ১০ হাজার টাকা সুদমুক্ত ঋণ দেয়া, মেধা ও প্রয়োজনের ভিত্তিতে এক লাখ শিক্ষার্থীকে মাসিক ১০ হাজার টাকা সুদমুক্ত শিক্ষাঋণ দেয়া, প্রতি বছর বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১০০ শিক্ষার্থীকে সুদমুক্ত শিক্ষাঋণ প্রদান, ইডেন, বদরুন্নেসা ও হোম ইকোনমিকস কলেজ একীভূত করে বিশ্বের বৃহত্তম নারী বিশ্ববিদ্যালয় গঠনের উদ্যোগ নেয়া, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন বড় কলেজগুলোকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করা এবং সব নিয়োগ মেধাভিত্তিক করা।

স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে-৬০ বছরের ঊর্ধ্বে বয়স্ক ও ৫ বছরের নিচে শিশুদের জন্য বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা, ৬৪ জেলায় ৬৪টি বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা, ‘ফার্স্ট থাউজেন্ড ডেইজ প্রোগ্রাম’-এর আওতায় গর্ভধারণ থেকে শিশু দুই বছর বয়স পর্যন্ত মা ও শিশুর স্বাস্থ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

যুবশক্তি ও কর্মসংস্থান সংক্রান্ত কর্মসূচিতে রয়েছে-দক্ষ জনশক্তি ও জব প্লেসমেন্টের জন্য নতুন মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা, পাঁচ বছরে এক কোটি তরুণকে বাজারভিত্তিক স্কিল প্রশিক্ষণ, প্রতিটি উপজেলায় ‘ইয়ুথ টেক ল্যাব’ এবং প্রতিটি জেলায় ‘জেলা জব ইয়ুথ ব্যাংক’ গঠন, নারী, তরুণ ও অবহেলিত জনগোষ্ঠীর জন্য পাঁচ লাখ উদ্যোক্তা এবং ১৫ লাখ ফ্রিল্যান্সার তৈরি করা এবং স্বল্পশিক্ষিত যুবকদের জন্য উপযোগী স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম।

আইসিটি ও ভিশন ২০৪০ সংক্রান্ত কর্মসূচিতে রয়েছে-আইসিটি খাতের উন্নয়নে ‘ভিশন ২০৪০’ ঘোষণা, ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ লাখ আইসিটি জব সৃষ্টি, ফ্রিল্যান্স ও ডিজিটাল রফতানির জন্য ন্যাশনাল পেমেন্ট গেটওয়ে, আইসিটি খাতে ৫০০ কোটি মার্কিন ডলার রফতানি আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ, সরকারের ১৫০ কোটি মার্কিন ডলার ব্যয় সাশ্রয় এবং শ্রমনির্ভর অর্থনীতি থেকে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তর করা।

রেমিট্যান্স সংক্রান্ত বিষয়ের মধ্যে রয়েছে- দক্ষ জনশক্তির মাধ্যমে ৫-৭ বছরের মধ্যে রেমিট্যান্স আয় ২-৩ গুণ বৃদ্ধি এবং প্রবাসী প্রফেশনাল, গবেষক ও শিক্ষকদের দেশে ফিরিয়ে আনা ‘ইন্টেলেকচুয়াল রেমিট্যান্স’ হিসেবে ব্যবহার।

উল্লেখ্য, জামায়াতে ইসলামীর সামিটে প্রদত্ত সরকার গঠনের রূপরেখা দেখে স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে, একটি সরকারের যাবতীয় খুটিনাটি বিষয় তারা অবজারভেশন করে অভিজ্ঞ ব্যক্তিবর্গের সমন্বয়ে এই রূপরেখা প্রণয়ন করেছে। সবচেয়ে যে বিষয়টি বেশ গুরুত্বের সাথে নিয়েছেন সেটা হলো শিক্ষা ও চিকিৎসা। আমাদের সর্বনিম্ন ও মধ্যবিত্তের সংসারে এই দুটি মৌলিক অধিকার নিয়ে রাষ্ট্র ও সরকার সাধারণত দায়সারা দায়িত্ব পালন করে থাকে। মানুষ যেটুকু সেবা গ্রহণ করতে পারে তাও অনেক কাঠ খড় পুড়িয়ে। নানা জায়গা ধরনা দিতে দিতে শ্রান্ত-ক্লান্ত হয়ে যেতে হয়। নিজের বৈধ নাগরিক সেবা পেতেও কতই না পেরেশানি পোহাতে হয়। আর যুব সমাজ বেকারত্বসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত। এসব বিষয় মাথা রেখে জামায়াতে ইসলামী তার পলিসি সামিটে এ সকল বিষয় অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে দূরদর্শীতার পরিচয় দিয়েছে। জামায়াতে ইসলামী রাষ্ট্র ও সরকার পরিচালনার পলিসিতে যে অনেক দূর এগিয়েছে সেটা অনুমেয়।

প্যানেল ডিসকাশনের পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের বক্তব্যে বেশ চমকপ্রমদ বিষয় উঠে এসেছে।

সম্মেলনে ডা: শফিকুর রহমান বলেন, দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ববাদী শাসনের পর বাংলাদেশ এখন একটি সংবেদনশীল গণতান্ত্রিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে আসন্ন নির্বাচন শুধু একটি রাজনৈতিক আয়োজন নয়, বরং ১৮ কোটির বেশি মানুষের দেশের জন্য শাসনব্যবস্থার নতুন দিশা নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। গত ১৭ বছরে শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতা ও কর্তৃত্ববাদী চর্চায় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ভেতর থেকে ফাঁপা হয়ে গেছে এবং গণতান্ত্রিক পরিসর সঙ্কুচিত হয়েছে বলে উল্লেখ করেন জামায়াত আমির।

২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের কথা উল্লেখ করে বলেন, সে সময় সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে তরুণেরা তাদের অধিকার, কণ্ঠস্বর ও ভবিষ্যৎ পুনরুদ্ধারের দাবিতে রাজপথে নেমে এসেছিল। ফ্যাসিবাদী শাসনের একটি ‘অন্ধকার সময়’ পার করে বাংলাদেশ এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে দেশ পুনর্গঠনের পথে এখনো বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।

বর্তমানে দেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ টিকে থাকা নয়, বরং স্থিতিশীলতাই বড় চ্যালেঞ্জ। অর্থনীতি সম্প্রসারিত হলেও কর্মসংস্থানের মান কমেছে। দেশের অধিকাংশ কর্মসংস্থান এখনো অনানুষ্ঠানিক, অনিরাপদ ও স্বল্প মজুরিভিত্তিক।

এই বাস্তবতাগুলো সৎভাবে মোকাবেলা করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সাফল্যের একমাত্র মানদণ্ড হতে পারে না। অর্থনৈতিক সাফল্য এমন হওয়া উচিত, যাতে মানুষ আত্মবিশ্বাসের সাথে জীবন পরিকল্পনা করতে পারে, মর্যাদার সাথে পরিবার পরিচালনা করতে পারে এবং সমাজে অর্থবহভাবে অংশ নিতে পারে।

প্রবাসী শ্রমিকদের বিষয়ে তিনি বলেন, দেশের বাইরে কর্মরত লাখো প্রবাসী শ্রমিক তাদের শ্রম ও ত্যাগের মাধ্যমে গভীর দেশপ্রেমের পরিচয় দিচ্ছেন। তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স পরিবারকে সহায়তা করার পাশাপাশি অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখছে এবং বাংলাদেশকে বৈশ্বিক শ্রমবাজারের সাথে যুক্ত করছে। তবে তাদের অবদান শুধু অর্থেই সীমাবদ্ধ নয়। তারা দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা নিয়ে দেশে আরো বড় ভূমিকা রাখতে আগ্রহী।

প্রাকৃতিক পরিবেশ নিয়ে বলেন, বাংলাদেশের রয়েছে ঊর্বর জমি, বিস্তৃত নদী-নালা, দীর্ঘ উপকূলরেখা এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে একটি কৌশলগত অবস্থান। এসব প্রাকৃতিক ও ভৌগোলিক সম্পদ টেকসই প্রবৃদ্ধি, আঞ্চলিক সংযোগ এবং বহুমুখী উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করে। প্রশ্নটি আর বাংলাদেশে সম্ভাবনা আছে কি না- তা নয়; বরং প্রশ্ন হলো, বিদ্যমান প্রতিষ্ঠান, নীতি ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এই সম্ভাবনাকে কতটা সমৃদ্ধিতে রূপ দিতে পারছে।

অর্থনৈতিক চিন্তায় পরিবর্তন আনার কথা উল্লেখ করে জামায়াত আমির বলেন, কর্মসংস্থানকে বিনিয়োগের পার্শ্বফল হিসেবে নয়, বরং একটি রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। ধীরে ধীরে অনানুষ্ঠানিক শ্রমকে আনুষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় আনতে হবে। শ্রমিকের অধিকার কার্যকরভাবে নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষার সাথে বাস্তব সুযোগের সংযোগ ঘটাতে হবে। সামাজিক কল্যাণকে দান হিসেবে নয়, বরং অংশগ্রহণ সক্ষম করে এমন সামাজিক অবকাঠামো হিসেবে দেখতে হবে। এই রূপান্তরের কেন্দ্রে রয়েছে সুশাসন।

জামায়াত আমিরের মতে, একটি স্থিতিশীল ও অগ্রসর বাংলাদেশ শুধু দেশের মানুষের স্বার্থেই নয়, বরং পুরো অঞ্চল ও বিশ্বের স্বার্থেও গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, বাংলাদেশ আবারো এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। ন্যায়বিচার (ইনসাফ), মর্যাদা ও যৌথ সমৃদ্ধির ভিত্তিতে একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে। জনগণের শক্তি, প্রবাসীদের অঙ্গীকার, নারীর নেতৃত্ব, তরুণদের উদ্দীপনা এবং আন্তর্জাতিক বন্ধুদের সহায়তায় বাংলাদেশ ন্যায্য, সমতাভিত্তিক ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার সক্ষমতা রাখে।

বাংলাদেশের ভবিষ্যতে নারীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে সম্মেলনে উল্লেখ করেন জামায়াত আমির। তিনি বলেন, কাঠামোগত নানা বাধা থাকা সত্ত্বেও নারীরা ইতোমধ্যে শিক্ষকতা, স্বাস্থ্যসেবা, উদ্যোক্তা, স্থানীয় নেতৃত্ব ও সামাজিক উদ্ভাবনে সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন। নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো শুধু ন্যায়ের প্রশ্ন নয়; এটি অর্থনৈতিক প্রয়োজন। জনসংখ্যার অর্ধেককে পূর্ণাঙ্গভাবে অন্তর্ভুক্ত না করে কোনো দেশ টেকসই সমৃদ্ধি অর্জন করতে পারে না।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান বলেছেন, অতীতে আমাদের দেশকে খেয়ে দেয়ে লুটপাট করে শেষ করে দেয়া হয়েছে, আমরা একটা কঙ্কাল পেয়েছি, এটা নিয়ে আমরা এগিয়ে যাব। এই কঙ্কালকে জীবন্ত বাংলাদেশ বানাব।

বাংলাদেশ ভালো না থাকলে কেউ ভালো থাকবে না। শৈশবে আমরা যে দেশ পেয়েছিলাম, বিশ্বের অন্যান্য দেশ যেভাবে এগিয়ে গেছে, সেখানে আমরা পিছিয়ে যাচ্ছি। আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে আমরা কি এভাবে রেখে যাব? তাই আমি বলতে চাই আমাদের আরেকবার যুবক হয়ে লড়তে হবে। যুবকদের উদ্দেশ্যে তিনি আরো বলেন, তোমাদের কাজ শেষ হয়নি। কাজ মাত্র শুরু হয়েছে। তোমরা একটা স্বৈরাচার তাড়িয়েছ, কিন্তু স্বৈরাচারী মানসিকতা এখনো দেশ থেকে যায়নি। এটাকে নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত লড়াই অব্যাহত থাকবে। এজন্য আমরা তোমাদের সাথে এবং পাশে থাকব।

আমাদের দু’টি লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করতে হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমাদের কাজ শুরু করতে হবে প্রাইমারি লেভেলের শিক্ষা থেকে। আমরা ওই সব থিওরেটিক্যাল শিক্ষা এই দেশের জন্য চাচ্ছি না, ওটাকে বিদায় করে দিবো। দ্বিতীয়ত, সোশ্যাল জাস্টিস ঠিক করতে হবে। এই দুই জায়গায় কোনো ছাড় নাই। ন্যায়বিচার কায়েম করতে হবে, এতে যদি আমার মাথা উড়ে যায়, যাক। সবার জন্য সুবিচার ও সমান বিচার করতে হবে।

সমাজে কোনো অন্যায়, ঘুষ, দুর্নীতি থাকতে পারবে না। বিচার মানে বিচার, এখানে কোনো ক্ষমতাধর-ক্ষমতাহীন দেখা যাবে না। অন্যায় বিচারকে আমাদের থেকে দূর করতেই হবে।

রাষ্ট্রের কোনো সুযোগ গ্রহণ করব না উল্লেখ করে আমির বলেন, আমরা ঘোষণা করেছি। যদি সেবার সুযোগ পাই, রাষ্ট্রের বৈধ সব সুযোগও আমরা গ্রহণ করব না। যা না করলেই নয়, শুধু তা গ্রহণ করব। আমরা রাজনীতিকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করি নাই, আমরা রাজনীতিকে কর্তব্য হিসেবে গ্রহণ করেছি। সম্পদ ফুলানোর জন্য আমরা রাজনীতি করি না। আমাদের রাজনীতি তখনই সার্থক হবে, যখন জনগণের চোখের পানি থেমে গিয়ে ঠোঁটের কোণায় সামান্য একটু হাসি ফুটে উঠে। এটাই হবে আমাদের রাজনীতি।

সামিটে উপস্থিত ছিলেন দেশ ও বিদেশের রাষ্ট্রদূত, রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী ও প্রফেশনালস। জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান সামিটের উদ্বোধনী বক্তব্য পেশ করেন।

জামায়াতের অন্য নেতাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন নায়েবে আমির ডা: সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের ও মাওলানা আ ন ম শামসুল ইসলাম, সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এ টি এম মা’ছুম, মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান, ড. হামিদুর রহমান আযাদ, মাওলানা আবদুল হালিম ও অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন ও মোবারক হোসাইন।

অন্যান্য দলের নেতাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, খেলাফত আন্দোলনের নায়েবে আমির মাওলানা মুজিবুর রহমান হামিদী, আরেক অংশের মহাসচিব মুফতি ফখরুল ইসলাম, এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন, উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম ও যুগ্ম সদস্যসচিব জয়নাল আবেদীন শিশির প্রমুখ।

সামিটে আরো উপস্থিত ছিলেন সিপিডির ডিস্টিংগুইসড ফেলো ও প্রথম নির্বাহী পরিচালক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী শাহদীন মালিক, সাবেক সংসদ সদস্য মেজর (অব:) আখতারুজ্জামান, ইবনে সিনা ট্রাস্টের সদস্য প্রশাসন অধ্যাপক ড. এ কে এম সদরুল ইসলাম, ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম, প্রবীণ সম্পাদক আবুল আসাদ, দৈনিক নয়া দিগন্তের সম্পাদক সালাহউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর, নির্বাহী সম্পাদক মাসুমুর রহমান খলিলী, দ্য নিউ ন্যাশন সম্পাদক মোকাররম হোসেন, দৈনিক প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ, ডিইউজের সভাপতি ও দৈনিক মানবকণ্ঠের সম্পাদক মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম, ঢাকা মেইলের নির্বাহী সম্পাদক হারুন জামিল, ডিইউজের সাধারণ সম্পাদক খুরশীদ আলমসহ বিভিন্ন গণমাধ্যম নেতৃবৃন্দ।

বিগত ১৭ বছর আওয়ামী দুঃশাসনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে নানাভাবে কোণঠাসা করে রাখা হয়। জেল, জুলুম, ফাঁসি, বাড়ি-ঘর লুটপাট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা বাণিজ্যে হামলা, জমি দখলসহ নানা অপÑকৌশলে জামায়াতের স্বাভাবিক কার্যক্রমকে স্থবির করে দেয়া হয়। এমনকি জামায়াতে ইসলামী কেন্দ্রীয় অফিস ও সকল শাখা অফিস সিলগালা করে রাখা হয়। বলা যায়, চুপিসারে, গোপনে গোপনে, ইশারাÑইঙ্গিতে জামায়াতে ইসলামী তার দলীয় কার্যক্রম অব্যাহত রাখে। গত জুলাই বিপ্লবে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানেও রয়েছে জামায়াতে ইসলামীর বিশেষ অবদান।

চব্বিশের জুলাই গণঅভুত্থানের পর বাংলাদেশের টোটাল রাজনীতির একটা পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে একটা পরিবর্তনের হাওয়া বয়ছে। সবাই চায় দেশটা পরিবর্তন হোক। জনতার ভাগ্যের পরিবর্তন হোক। এই পরিবর্তনের আকাক্সক্ষায় জনসাধারণের মধ্যে জামায়াতের ব্যাপক সমর্থন তৈরি হয়েছে। তাদের মধ্যে একটা আস্থা ও বিশ্বাস প্রবলভাবে কাজ করছেÑ জামায়াত ক্ষমতায় এলে দুর্নীতি হবে না। জবর দখল হবে না। ঘুষ-চাঁদাবাজি বন্ধ হবে। মানুষকে হত্যার রাজনীতির অবসান ঘটবে।

ইতোপূর্বে ২০০১ সালের সরকারে জামায়াতের ২ জন মন্ত্রী ছিল। তারা দুর্নীতিমুক্ত থেকে রেকর্ড গড়ায় মানুষের ভেতরে আলাদা একটা পজিটিভ ইমেজ তৈরি হয়ে আছে। সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াতে ইসলামীর নানাবিধ কার্যক্রম ও পলিসি জনসাধারণের মাঝে আশার সঞ্চার করেছে। ইতোমধ্যে এসব কাজের কারণে জামায়াতে ইসলামী প্রশংসায় ভাসছে। পলিসি সামিট ২০২৬ অনুষ্ঠানটিও সর্বমহলে ইতিবাচক মনোভাব তৈরি করেছে। তবে জামায়াতে ইসলামী এই সামিটে মিডিয়া, সাহিত্য ও সংস্কৃতির মতো জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কোনো ডিসকাশন করেনি। যদি সময় স্বল্পতার কারণে ডিসকাশন সম্ভব না হয়ে থাকে তাহলে প্রেস রিলিজে উল্লেখপূর্বক মিডিয়ার মাধ্যমে এই পলিসি সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করতে হতো। মিডিয়া, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে উপেক্ষার সুযোগই নেই। জামায়াত কী কারণে বিষয়টা বেমালুম ভুলে গেল বুঝে আসে না। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে মিডিয়ার তথ্য সন্ত্রাস ভয়াবহ রূপ নিয়েছিল। মিডিয়ার মিথ্যা প্রোপাগান্ডায় অসংখ্য মানুষকে বিনা কারণে জীবন দিতে হয়েছে। এ দিকে আধিপত্যবাদী সাহিত্য-সংস্কৃতির আগ্রাসনে আমরা হাবু-ডুবু খাচ্ছি। এই পরিস্থিতির উত্তরণ দরকার। জামায়াতে ইসলামী সরকার গঠন করলে কি এগুলোর সংস্কার করতে চায় না? আমার মনে হয় ভারতীয় আধিপত্যমুক্ত মিডিয়া ও সাহিত্যÑসংস্কৃতির প্রসার খুবই জরুরি। নতুন বাংলাদেশে নাগরিক জীবনের স্বস্তির জন্য বিষয়টির সুরাহা নতুন সরকারের দায়িত্বের ভেতরে পড়বে। আমার বিশ্বাস, জামায়াতে ইসলামী তার পূর্ণাঙ্গ ইস্তেহার খুব তাড়াতাড়ি জনতার কাছে পৌঁছে দিবে।

জামায়াতে ইসলামী সম্পর্কে মানুষের সুধারণা ও আস্থা তৈরি হবার অন্যতম কারণ হলো তারা কমিটমেন্ট ঠিক রাখার চেষ্টা করে। সাম্প্রতিক সময়ে জনসম্পৃক্ত সকল কর্মসূচিতে জামায়াতের অংশগ্রহণ রয়েছে। কোথাও কোনো দুর্ঘটনায় ঘটলেই দেখা যায় কেন্দ্রীয় আমিরসহ নেতৃবৃন্দ সেখানে হাজির। সমাধানের পথ বাতলিয়ে দেন। শুধু এটা ঢাকা শহরে নয়Ñপ্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত এই পলিসি দেখা যায়। স্থানীয় পর্যায়ে স্থানীয় প্রতিনিধিরাও বেশ আন্তরিকতার সাথে এই সকল কর্মসূচি পালন করে যাচ্ছেন। ঘুষ ও দুর্নীতির ব্যাপারে জামায়াত নেতৃবৃন্দ যে জিরো টলারেন্সÑএ সম্পর্কে মানুষের মাঝে বিশ্বাস জন্মেছে গাঢ়ভাবে। সেই ধারাবাহিকতায় নানা ক্যালকুলেশনে এবার ধারণা করা হচ্ছে জামায়াতে ইসলামী সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। সাধারণ মানুষের মাঝে জামায়াতে ইসলামীর গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে। এখন সাধারণ মানুষ যদি নির্বিঘ্নে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পায়।

দেশে যদি সত্যিকারের ভোট উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। জনগণই যদি তাদের সরকার গঠনে মতামত পেশ করার সুযোগ পায়। জনগণই যে রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতার উৎস এটির বাস্তব প্রয়োগ দেখা মেলে।

জনগণকে যদি বাধা ও ভয়হীন ভোট উৎসব পালনের সুযোগ দেয়া হয় তাহলে সরকার গঠনের সমূহ সম্ভাবনা থাকবে জামায়াতে ইসলামীর। আর যদি ‘জোর যার মল্লুক তার’ এই প্রথা জারি থাকে। ডামি নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাহলে জনগণের কী আর করার থাকবে!