সরকারি কর্মচারীদের পে-স্কেল দ্বিগুণ করার আলোচনা আবারও সামনে এসেছে। দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং প্রকৃত আয়ের অবক্ষয়ের প্রেক্ষাপটে এই দাবি অযৌক্তিক নয়। সরকারি চাকরিজীবীদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, বর্তমান বেতনে সম্মানজনক জীবনযাপন ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। ফলে পে-স্কেল দ্বিগুণের প্রস্তাব অনেকের কাছে স্বস্তির বার্তা হিসেবেই ধরা দিচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই স্বস্তি কি টেকসই হবে, নাকি এটি নতুন করে অর্থনৈতিক চাপের সূত্রপাত ঘটাবে?
পে-স্কেল দ্বিগুণ করতে গেলে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা এমন হিসাব বিভিন্ন মহলেই আলোচিত। এই বিপুল অর্থের উৎস কোথা থেকে আসবে, সেটিই মূল প্রশ্ন। সরকারের সামনে বিকল্প তিনটি পথই মূলত খোলা থাকে: কর বাড়ানো, ঋণ নেওয়া অথবা নতুন টাকা সরবরাহ করা। কর বাড়ালে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়বে, যা সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। ঋণ নিলে ভবিষ্যতে সুদ ও আসল পরিশোধের চাপ বাড়বে, ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষার মতো খাতে বরাদ্দ কমার ঝুঁকি তৈরি হবে। আর নতুন টাকা সরবরাহের পথ সবচেয়ে সহজ হলেও সেটিই সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কারণ এর সরাসরি ফল মূল্যস্ফীতি।
বেতন বাড়লে সরকারি কর্মচারীদের হাতে অতিরিক্ত অর্থ আসবে এবং তারা স্বাভাবিকভাবেই বেশি খরচ করবেন।এতে বাজারে চাহিদা বাড়বে, স্বল্পমেয়াদে ব্যবসা-বাণিজ্যে কিছুটা গতি আসতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় সমস্যা হলো, উৎপাদন ও সরবরাহের সক্ষমতা সেই হারে বাড়ে না। ফলে চাহিদা বাড়ার চাপ গিয়ে পড়ে দামের ওপর। চাল, ডাল, তেল, বাসাভাড়া, পরিবহন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যায়। যাদের আয় বাড়েনি দিনমজুর, কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কিংবা বেসরকারি খাতের বড় একটি অংশ তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। এমনকি যাদের বেতন বেড়েছে, তারাও কিছুদিন পর বুঝতে পারে যে বাড়তি আয়ের বড় অংশই চলে যাচ্ছে বাড়তি খরচ মেটাতে।
এই আলোচনা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে বর্তমান সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে। ২০২৫ সাল বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল একটি বছর ছিল। বড় কোনো ধাক্কা ছাড়াই বছরটি পার হয়েছে। বৈশ্বিক বাজারে খাদ্য ও জ্বালানির দাম কিছুটা কমেছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ প্রায় ৩৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, রেমিট্যান্স প্রবাহও শক্তিশালী হয়েছে। এসব কারণে ২০২৬ সাল নিয়ে আশাবাদ তৈরি হয়েছে, বিশেষ করে ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের পর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরলে বিনিয়োগ বাড়বে এমন প্রত্যাশা রয়েছে।
কিন্তু এই আশাবাদের আড়ালেও গভীর কিছু ঝুঁকি রয়ে গেছে। ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ এখন প্রায় ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা, যা মোট ঋণের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি।
পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠিত ঋণ ধরলে ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের পরিমাণ আরও বাড়ে। এই পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলো উচ্চ সুদহার ধরে রাখতে বাধ্য হচ্ছে, ফলে উৎপাদনশীল খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যাচ্ছে। বিনিয়োগ কমছে, কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি মন্থর হচ্ছে। অর্থনীতিবিদেরা একে ‘বিষাক্ত চক্র’ বলে আখ্যা দিচ্ছেন উচ্চ সুদহার, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, নিম্ন বিনিয়োগ ও নিম্ন প্রবৃদ্ধির ফাঁদ।
এই প্রেক্ষাপটে যদি সরকার একসাথে বড় অঙ্কের ব্যয়ভার গ্রহণ করে পে-স্কেল দ্বিগুণ করে, তাহলে সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে যখন রাজস্ব আদায়ের হার এখনো কাক্সিক্ষত পর্যায়ে পৌঁছায়নি, এলডিসি উত্তরণের ফলে সামনে রপ্তানি সুবিধা কমার আশঙ্কা রয়েছে এবং বৈদেশিক স্বল্পসুদে ঋণ পাওয়াও কঠিন হতে যাচ্ছে।
এখানে আয় বৈষম্যের প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। পে-স্কেল দ্বিগুণ হলে একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির আয় হঠাৎ করে অনেক বেড়ে যাবে, কিন্তু সমাজের বড় অংশ একই আয়ে থেকে যাবে। দামের চাপ সবার ওপর সমানভাবে পড়লেও আয়ের বৃদ্ধি সবার ক্ষেত্রে সমান হবে না। ফলে বৈষম্য বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়, যা সামাজিক অসন্তোষও বাড়াতে পারে।
তাই প্রশ্নটি হওয়া উচিত বেতন বাড়ানো হবে কি না নয়, বরং কীভাবে বেতন বাড়ানো হবে। একসাথে পে-স্কেল দ্বিগুণ করার পরিবর্তে ধাপে ধাপে বেতন সমন্বয় করলে অর্থনীতির ওপর চাপ তুলনামূলকভাবে কম পড়বে। একই সঙ্গে কর নেট সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি রোধ, অপ্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয় কমানো এবং সরকারি সেবার দক্ষতা বাড়ানো জরুরি। বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে যদি কর্মদক্ষতা, জবাবদিহি ও সেবার মান বৃদ্ধির বিষয়টি যুক্ত করা যায়, তাহলে সমাজও তার প্রত্যক্ষ সুফল পেতে পারে।
সব মিলিয়ে পে-স্কেল দ্বিগুণ করা নিছক একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি একটি গভীর অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত। এর প্রভাব শুধু সরকারি কর্মচারীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, এটি বাজার, মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে সরাসরি প্রভাবিত করে। সরকারি কর্মচারীদের ন্যায্য দাবি অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে।
তবে সেই সিদ্ধান্ত যদি সামষ্টিক অর্থনীতিকে নতুন করে চাপে ফেলে এবং সাধারণ মানুষের কষ্ট বাড়িয়ে তোলে, তাহলে সেই স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হয় না। খুশির ঘোষণা দেওয়ার আগে তাই প্রয়োজন বাস্তব হিসাব, সতর্ক পরিকল্পনা এবং দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি, নইলে পে-স্কেল দ্বিগুণ করার আনন্দ খুব দ্রুতই দ্রব্যমূল্যের চাপে ঢাকা পড়ে যেতে পারে।