এক.
২০২৪ সালে বর্ষপঞ্জির পাতায় যুক্ত হয়েছে নতুন তারিখ, জুলাই প্রলম্বিত হয়েছে ৩৬ পর্যন্ত। এজন্য ৫ আগস্ট ২০২৪-কে ছাত্র-জনতা নাম দিয়েছে ৩৬শে জুলাই। জুলাই-আগস্ট ২০২৪ এর বিপ্লবে শ্রমজীবী মানুষের ভূমিকা ছিল ঐতিহাসিক। ফ্যাসিস্টের পতন ও জুলাই বিপ্লবে শ্রমিকরাও গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়ে থাকবে ইতিহাসের পাতায়। কমপক্ষে ২৮৪ জন শ্রমজীবী মানুষ গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ হয়েছেন। বিশ্লেষণে দেখা যায়, যাঁরা শহীদ হয়েছেন, তাঁদের ৩৫ শতাংশ শ্রমজীবী, ৩৩ শতাংশ শিক্ষার্থী, ১৫ শতাংশ ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী এবং ১৩ শতাংশ বেসরকারি চাকরিজীবী। ১৬ জুলাই আবু সাঈদ, ওয়াসিম, শান্ত ও ফারুকের মৃত্যুর পর থেকে আন্দোলন ক্রমশ ঢাকার আশেপাশে শ্রমিক এলাকাগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ে। ছাত্র-জনতার ওপর নির্মম-নিষ্ঠুর নির্যাতন মেনে নিতে পারেনি সাধারণ খেটে খাওয়া শ্রমিকরা। নানা মাত্রায়, কায়দায় আন্দোলনে যুক্ত হয়েছে, সমর্থন জুগিয়েছে শ্রমিকারা। ঢাকার পাশে আশুলিয়া-সাভার, ভেতরে বাড্ডা-মহাখালী-উত্তরা, একপ্রান্তে গাজীপুর, আরেক প্রান্তে নারায়ণগঞ্জ, প্রত্যেকটিই পোশাক শ্রমিক এলাকায়। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় কারখানায় যাওয়া আর বাসায় ফেরার পথে আশেপাশে আন্দোলনে সতর্ক ও উৎসুক নজর বাড়ে শ্রমিকদের। কখনো সুযোগ পেয়েই যুক্ত হয়েছে মিছিলে। কখনো ছবি তুলেছে, ভিডিও করে ছড়িয়ে দিয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। সেই ছড়িয়ে দেওয়া ভিডিও নিহত ছাত্র-জনতা ও শ্রমিকদের লাশ শনাক্ত করতে সহায়তা করে।
ফ্যাসিবাদ বিরোধী ছাত্র-জনতার সাথে সাহসী ভূমিকা রাখে শ্রমিকরা। কারণ তাদের চোখের সামনে শত শত ছাত্র নিহত হওয়ার ঘটনা তারা মেনে নিতে পারেনি, তাই তারাও ছাত্রদের পাশে দাঁড়ায়, স্লোগানে স্লোগানে রাজপথ কাঁপায়। মেধা না কোটা, কোটা কোটা। আওয়ামী স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেমে দীর্ঘ জুলাই গণঅভ্যুত্থানে রাজপথে থেকেছেন ছাত্রদের সাথে হেটে খাওয়া শ্রমজীবী ও মেহনতি মানুষ। বন্দুকের মুখোমুখি নির্ভীক দাঁড়িয়ে অকাতরে জীবন দিয়েছেন, আহত হয়েছেন, অঙ্গহানির শিকার হয়েছেন এই শ্রমজীবী মেহনতি মানুষগুলো। ৩৬শে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ হওয়া শ্রমজীবী মানুষের আত্মত্যাগের কথা আমাদের বার বার প্রচার করতে হবে। তাদেরকে ভুলে গেলে চলবে না। গত সাড়ে ১৫ বছর ধরে বাংলাদেশের জনগণ একটি নজিরবিহীন ফ্যাসিবাদী ও মাফিয়া শাসনের অধীন চরম জুলুম-নির্যাতন, গুম-খুন, বাক-স্বাধীনতা-ভোটের অধিকার খর্ব, লাগামহীন দ্রব্যমূল্যের বৃদ্ধি সহ্য করেছে। বাংলার মানুষ হাতে হাত রেখে ৩৬শে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে লড়াই করে ভয়ংকর নিষ্ঠুর স্বৈরাচারী ও গণহত্যাকারী হাসিনা সরকারকে বিদায় করেছে। ফ্যাসিস্ট হাসিনার বিদায়ের বড় অবদান রেখেছে শ্রমজীবী মানুষ। জুলাই আন্দোলনে দিনমজুর, দোকানকর্মী, রিকশাচালক, পরিবহনকর্মী, পোশাক শ্রমিক, নির্মাণশ্রমিক, হকার, হোটেলকর্মী, ওয়ার্কশপ শ্রমিক, ডাইভার, গৃহিণী, চিকিৎসক, নার্সসহ সব শ্রেণী পেশার মানুষের সাথে শ্রমজীবী মানুষরাও রাস্তায় এক কাতারে সমবেত হন। স্বৈরাচারের পতন না হওয়া পর্যন্ত তারা রাজপথ ও অনলাইনে সক্রিয় ছিলেন। একদিকে যেমন শ্রমিকরা মাঠে নেতৃত্ব দিয়েছেন, সুসংগঠিত করে সাহস জুগিয়েছে শিক্ষার্থীদের; তেমনি রিকসা চালক, ভ্যান চালক, অটোরিকসা চালকরা আহত ছাত্র-জনতাকে হাসপাতালে পৌঁছে দিয়েছেন, কর্মজীবী ও শ্রমজীবী নারীরা আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতাকে রাস্তায় পানি ও খাবার খাইয়েছেন। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শতাধিক শ্রমিক নিহত হয়েছেন। আহত ও পঙ্গুত্ববরণকারী শ্রমিকের সংখ্যা কয়েক হাজার। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা ও শ্রমিক অধিকার নিয়ে আন্দোলনকারীদের প্রত্যাশা, ফ্যাসিবাদ-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে শ্রমিকদের এ আত্মত্যাগ যেন বৃথা না যায়। তাদের অধিকার যেন নিশ্চিত করা হয়। ন্যায্য মজুরিসহ যেকোনো দাবি আদায়ে কোনো শ্রমিককে যেন রাস্তায় নামতে না হয়। শ্রমিকরা যেন স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে পারেন। নারী শ্রমিকদের জন্য কর্মপরিবেশ যেন নিশ্চিত হয়।
দুই. দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি শ্রমিকবান্ধব নয়। রাজনৈতিক দলগুলো শ্রমিকদের রাজনৈতিক হাতিয়ার বা ক্ষমতা পালাবদলের সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করে। যে কারণে দেশে ৮০ শতাংশ শ্রমিকের পেশা ও কাজেরই স্বীকৃতি নেই। শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর যেখানে স্বীকৃতিই নেই, সেখানে তার অধিকার অনেক পরের বিষয়। অথচ ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে শ্রমিকদের মূল্য দিতে হয়েছে অনেক বেশি। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ছাত্র-জনতার এ গণ-অভ্যুত্থানে সহিংসতায় অন্তত ১১২ শ্রমিক নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ২১ জন দোকানদার, ১৫ রিকশাচালক, ১২ পরিবহনকর্মী, নয় পোশাক শ্রমিক, নয় দিনমজুর, ছয় নির্মাণশ্রমিক, পাঁচ হকার, চারজন হোটেলকর্মী। বাকিরা বিদ্যুৎ ও ওয়ার্কশপসহ বিভিন্ন খাতে কাজ করতেন। নিহতদের মধ্যে ২৩ জন ছিল শিশুশ্রমিক। যাদের বয়স ১৩-১৮ বছরের মধ্যে বলে ওই প্রতিবেদনে জানানো হয়। জুলাই অভ্যুত্থানেও শতাধিক শ্রমিক জীবন দিয়েছে কিন্তু জাতীয় পলিসি বা সমাজে তাদের স্বীকৃতি নেই। শহীদ শ্রমিকদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিয়ে সব প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিকদের স্বীকৃতি দিতে হবে।
তিন. বাংলাদেশের বাস্তবতায় কাজ বা জান হারানোর ভয় কিংবা হয়রানির দমবন্ধ পরিবেশে আটকা পোশাক শ্রমিকসহ অন্যান্য শ্রমিকের জীবন এমনটাই সবাই জেনে এসেছে। সেই জীবনেও যে ফ্যাসিবাদ বিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে বিরাট সাহসী হয়ে প্রভাব ফেলেছে শ্রমিকদের, সেটা হয়তো অনেকেরই অজানা নয়। শ্রমিক ও মেহনতি মানুষরা জুলাই বিপ্লবে রাজপথে আন্দোলনে ছিলেন আশীর্বাদ স্বরূপ। আমি একজন জুলাইযোদ্ধা সাংবাদিক হিসেবে দেখেছি, কেউ গুলি খেয়ে বা আহত হয়ে পড়ে যাচ্ছেন, সাথে সাথে রিকসা-ভ্যান চালক মামারা কোনো কথা ছাড়াই সেই রক্তাক্ত বডি নিয়ে হাসপাতালে ছুটছেন। রাস্তার পাশের বিভিন্ন কারখানা শ্রমিকেরা আশ্রয় দিচ্ছেন, সাপোর্ট দিচ্ছেন। হোটেলবয়’রা পুলিশের হাত থেকে বাঁচাতে আমাদের হোটেলে ঢুকিয়ে সাটার নামিয়ে দিচ্ছেন। দোকান কর্মচারীরা খাবারের দাম রাখছেন না। পরিবহন শ্রমিকরা রাস্তা থেকে আমাদের তথ্য দিচ্ছেন, হামলা সম্পর্কে সতর্ক করে দিচ্ছেন আগেভাগে। গার্মেন্টস শ্রমিকেরা রাস্তায় নেমে পড়ছেন। মার্কেটের কর্মচারী, সেলসম্যানরা রাস্তায় নেমে এসেছেন। নারী শ্রমিকেরা আমাদের পাশাপাশি আন্দোলন করছেন, আহতদের সেবাও করছেন, হাসপাতালেও দৌড়াচ্ছেন। এই চিত্র শুধু আমার এলাকার না, ঢাকার সবগুলো হটস্পট ও সারাদেশেরই চিত্র এটা ছিল। এই শ্রমিক শ্রেণির ভাই-বোনদের রক্তাক্ত দেহের উপরদিয়ে আমরা আজকের নতুন বাংলাদেশ পেয়েছি।
চার. রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দেয়া হোক জুলাই গণঅভ্যুত্থানে লড়াই করা সাহসী শ্রমিকযোদ্ধাদের। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে লড়াকু গুলিবিদ্ধ একেকজন শ্রমিকের গল্প আত্মত্যাগের সাক্ষ্য দেয়। সাক্ষ্য দেয় ছাত্র-জনতার আন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থানের প্রবল স্রোত কীভাবে শ্রমিকের কারখানায় চার দেয়ালেও প্রতিধ্বনিত হয়েছিল। জানান দেয়, কীভাবে ইতিহাসের ভয়ংকর নিষ্ঠুর ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার লড়াই পাড়া-মহল্লায় শ্রমিকদের মধ্যে সাহস সঞ্চার করেছিল। সেই অভূতপূর্ব সাহস ও হাজারো ছাত্র-শ্রমিক-জনতার প্রাণের বিনিময়ে পাওয়া নতুন বাংলাদেশে এখন পোশাক শ্রমিকরাও নতুন করে ভয়হীন মুক্ত কর্ম পরিবেশে মর্যাদার জীবনের স্বপ্ন দেখছে। যার নজির সাম্প্রতিক কারখানাভিত্তিক শ্রমিকদের আশু দাবি ও দীর্ঘ মেয়াদের দাবির আন্দোলনের মধ্য থেকে বোঝা যায়।
পাঁচ. শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্রভাব সমাজের সব প্রান্তে বৈষম্য ও ফ্যাসিবাদ-বিরোধী চেতনা ছড়িয়েছে, যা সবাইকে একবিন্দুতে দাঁড় করিয়েছে। নিপীড়ন-নির্যাতন কোনোভাবেই চিরস্থায়ী হয় না এবং তার ওপর ভর করে চিরস্থায়ীভাবে টিকে থাকা যায় না সেটাই প্রমাণ করেছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতা ও শ্রমজীবী মানুষরা। সব নির্যাতন-নিপীড়নের ভয় উপেক্ষা করে আবু সাঈদ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রতীক হয়ে সব ভয়-জড়তা ভেঙে চুরমাচুর করে সবাইকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে।
সবার দায়বোধকে প্রশ্ন করেছে। বাধ্য করেছে আন্দোলনে নামতে। আবু সাঈদের ডাক শ্রমিকের জীর্ণ ঘরেও কীভাবে পৌঁছেছে, সেটা গুলিবিদ্ধ সুমনের মৃত্যুর আগের কথাগুলোয় স্পষ্ট। শ্রমিকদের আন্দোলনে গণঅভ্যুত্থানের অর্জন নস্যাতকারীদের নানা তৎপরতাও লক্ষ্য করা যাচ্ছে গত একবছরে, কিন্তু জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শ্রমিকদের অবদান কেউ যেন চক্রান্ত করে নস্যাৎ না করতে পাবে সেইজন্য কাজ করছে বাংলাদেশ শ্রমিককল্যাণ ফেডারেশন। শ্রমিক ও শিল্পের স্বার্থে শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধতাই সব অপচেষ্টা রুখে দেবে সেই ভরসা ও সাহস দিচ্ছে শ্রমিককল্যাণ ফেডারেশন।
ছয়. কোটা সংস্কার আন্দোলনে একপর্যায় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও ভোটাধিকারের প্রশ্নও যুক্ত হয়। এরইসঙ্গে যখন নিপীড়ন, নির্যাতন, হত্যাকাণ্ড ক্রমশ বাড়তে শুরু করে, তখন সব ভয়কে প্রতিহত করে শিক্ষার্থীরা ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। ছাত্রদের নির্বিচারে হত্যার দৃশ্য দেখে প্রতিবাদী ক্ষোভে ফেটে পড়ে কারখানায় শ্রমিকরাও। ঢাকা ইপিজেডের শান্তা গার্মেন্টের শ্রমিক সুমন মৃত্যুর আগের কথাগুলো কেমন গায়ে কাটা দিয়ে যায় বারবার। আবু সাঈদ-মুগ্ধরা যদি সাহস করে দেশের জন্য জীবন দিতে পারে তবে আমরা কেন পারবনা। কীভাবে আবু সাঈদ, মুগ্ধ, ফারহান, নাঈমার মতো করে পোশাক শ্রমিকরাও আমাদের সাহসের প্রতীক হয়েছে, তারই দৃষ্টান্ত সুমনসহ প্রাণ হারানো শ্রমিকরা। সুমনের মতো অনেক কারখানার শ্রমিক বলেছেন, আমার খুব ইচ্ছা, আবু সাঈদ যেমন দেশের জন্য জীবন দিসে, আমিও যদি সেরকমভাবে দেশের পাশে দাঁড়াতে পারি, তাহলে নিজেকে ধন্য মনে করবো। সবাই দোয়া করবেন, যাতে দেশ স্বাধীন করতে পারি! স্বাধীনভাবে চলতে পারি! আর যদি বেঁচে না ফিরি, আমার দোষ-ত্রুটি ক্ষমা করবেন।
গণঅভ্যুত্থানে শহীদ হওয়া শ্রমজীবীদের অনেকেই ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তাঁদের মৃত্যুতে পরিবারগুলো বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গণ–অভ্যুত্থানের সময় রাজধানী ঢাকার যাত্রাবাড়ী, উত্তরা, মিরপুর, মোহাম্মদপুর ও রামপুরা এই পাঁচ এলাকায় সবচেয়ে বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। এই পাঁচ এলাকায় কমপক্ষে ৩২৪ জনের মৃত্যু হয়। আবার এসব এলাকায় শ্রমজীবী মানুষের বসবাস বেশি। বিশেষ করে যাত্রাবাড়ী, মোহাম্মদপুর ও মিরপুরের যেসব স্থান গণঅভ্যুত্থানের সময় ব্যাপক প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয়েছিল, ওই এলাকাগুলোয় শ্রমজীবী মানুষের বড় ভূমিকা ছিল।
যাত্রাবাড়ীতে গত বছরের ১৯ জুলাই গুলিতে নিহত হন সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক রাজীব হোসেন। তাঁর বাবা তোফাজ্জল হোসেন বলেন, তাঁর ছেলে যাত্রাবাড়ীতে একটি ভাড়া বাসায় স্ত্রী ও দুই শিশুসন্তান নিয়ে থাকতেন। ছেলের মৃত্যুর পর পরিবারে বিপর্যয় নেমে এসেছে।
যাত্রাবাড়ীর ভাড়া বাসা ছেড়ে ছেলের পরিবার এখন শরীয়তপুরের ডামুড্যায় চলে এসেছে। সেখানে ছেলের স্ত্রীর বাবার বাড়িতে থাকছেন তাঁর নাতিরা। গণঅভ্যুত্থানের সময় সাভার, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে বহু মানুষ হতাহত হয়েছেন। এসব এলাকায় পোশাককর্মীসহ আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক খাতের অনেক শ্রমিক বাস করেন। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গণ-অভ্যুত্থানের সময় সাভারে ৬৫ জন, গাজীপুরে ৩৬ জন ও নারায়ণগঞ্জে ৩৪ জন নিহত হন। তাঁদের মধ্যে অনেকেই শ্রমজীবী মানুষ। গণঅভ্যুত্থানে শ্রমজীবী মানুষের ভূমিকা সম্পর্কে শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রধান সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহম্মদ বলেন, অনেক শ্রমিক কাজের সন্ধানে বাসা থেকে বেরিয়ে রাস্তায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন। শ্রমজীবী মানুষের মৃত্যু হলে পরিবার পথে বসে যায়।
সাত. বিশেষ করে, জুলাই গণআন্দোলন এক দফায় পরিণত হওয়ার পরপর ২ থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত শ্রমিকদের অংশগ্রহণ ছিল লক্ষণীয়। গণভবনের দিকে রওনা হতে গিয়ে এবং ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট হাসিনার পদত্যাগ ও দেশছাড়ার পর বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকরা মিছিলে যোগ দিলে সবচেয়ে বড় হত্যাকাণ্ড চলে। শ্রমিকদের ওপরে সবচেয়ে বড় হত্যাকাণ্ড হয়েছে ৫ আগস্ট। শ্রমিকদের বড় অংশ গুলিতে প্রাণ হারায় ওই দিন। আশুলিয়া থানার সামনে যখন মৃত দেহের স্তূপ, ভ্যানে তুলে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হচ্ছিল, তখনও পোশাক শ্রমিক সুমন তার আশেপাশে। পরিবার থেকে বোন মনিজা ও স্ত্রী মরিয়ম তাকে বাড়ি যেতে বললেও তার মন সায় দিচ্ছিল না। বাড়ি ফেরার আশ্বাস দিয়েও সুমন ওইখানে দাঁড়িয়ে থাকে।
তারপর গুলিবিদ্ধ হয় এবং লাশ হয়ে নিজ গ্রাম পঞ্চগড়ে বাবা-মায়ের কাছে ফেরে। ৫ আগস্ট পর্যন্ত নানা সময়ে সুমনের মতোই শাকিনুর, নাজমুল, নাঈম, তৌহিদুর, রহমত, শুভশীল, রাসেল, মিনারুল, সোহেল, রহমত, রবিউল, ইয়ামীন, আয়াতুল্লাহ, শরীফুল, সোহাগ, রাশেদুল, আসিফুরসহ অনেক শ্রমিক নিহত হন। তাদের কারো পিঠে, কারো মাথায়, কারো বুকে লাগে গুলি। বর্তমানে নতুন বাংলাদেশে পোশাক শ্রমিকরাও নতুন কর্ম পরিবেশ চায়। যেখানে তাদের দাবিগুলো দমনের ভাষায় পাঠ না করে, উদ্যোক্তা ও সরকার হৃদয় দিয়ে শুনবে। শ্রমিকরাও শিক্ষার্থীদের মতো নতুন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় প্রাণ খুলে তাদের দাবি দাওয়া সামনে আনার সাহস পাচ্ছে, যা ইতিবাচক। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে আর সবার মতো শ্রমিকদেরও অনেক প্রত্যাশা। যে প্রত্যাশায় শ্রমিক আন্দোলন দমনের সংস্কৃতির সিন্ডিকেট ভেঙে ফেলা জরুরি।
আট. জুলাই গণঅভ্যুত্থানে গাজীপুর, সাভার ও আশুলিয়া এলাকায় শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনসহ অন্যান্য শ্রমিক সংগঠনের অভিজ্ঞতা: গত সাড়ে ১৫ বছর আওয়ামী লীগের শাসনামল ছিল পোশাক শ্রমিকদের নিপীড়ন, হত্যা, বঞ্চনা ও প্রতারণার আমল। পোশাকশ্রমিকদের এসব ক্ষোভ বারবারই প্রকাশ পেয়েছে বিভিন্ন আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের মাত্র সাত মাস আগে, ২০২৩ সালের ৮ ও ৯ নভেম্বর গাজীপুর ও সাভারে মজুরির দাবিতে আন্দোলন হয়েছিলো। সে আন্দোলনে সরকারি বাহিনীর গুলিতে প্রাণ দিতে হয়েছে পোশাকশ্রমিক আঞ্জু আরা, রাসেল হাওলাদার, জালাল উদ্দিন ও মোহাম্মদ ইমরানকে। এসবের কোনো বিচার হয়নি। আগেরও অনেক হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়নি। উপর্যপুরি হত্যা-নিপীড়নের শিকার শ্রমিকদের মধ্যে ক্ষোভ তীব্র হচ্ছিলো। শ্রমিকরা ফুঁসছিলেন সরকারের বিরুদ্ধে। গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া, মিরপুরে মাঝে মাঝেই সে সব ক্ষোভের স্ফূরণ দেখা যাচ্ছিলো। ঢাকার নিকটতম জেলাগুলোর মধ্যে সরকারের সতর্ক নজর ছিল গাজীপুরের দিকে। কারণ দেশের সবচেয়ে বড় সিটি করপোরেশন ও শ্রমিক অঞ্চল এটা। জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী ছাত্রশিবির এবং শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন মিলে যৌথভাবে ১৭ জুলাই ২০২৪ শ্রমিকরা পথে নামার পর প্রতিবাদ-প্রতিরোধের সাহস ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। গাজীপুরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ওইদিন মিছিল বের করে শিক্ষার্থীরা। বিশেষ করে ডুয়েট-এর ইসলামী ছাত্রশিবির ও সাধারণ শিক্ষার্ধীরা বড় একটা অংশ সেদিন বিশেষ ভূমিকা রাখে। গাজীপুর চৌরাস্তায় দশ হাজারের মতো ছাত্র-শ্রমিক-জনতার সমাবেশ হয় সেদিন। তার পরের দিন থেকেই আন্দোলনকারীদের ধরপাকড় করতে সরকারদলীয় গুন্ডা, র্যাব-পুলিশ-বিজিবি বাসাবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কারখানায় অভিযান চালাতে শুরু করে। এসব সরকারি তৎপরতা ছাত্র-শ্রমিকদের মধ্যে ভীতি সৃষ্টির বদলে উল্টো ক্ষোভ ও ক্রোধ সৃষ্টি করে। গাজীপুরের প্রধান প্রধান সড়ক ও অলিগলি দখলে নেয় ছাত্র-শ্রমিক-জনতা।
১৮ জুলাই ২০২৪ গাজীপুর চৌরাস্তায় ভয়াবহ হামলা করে র্যাব-পুলিশ। সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টার থেকে গুলি ছোঁড়া হয় আন্দোলনকারীদের ওপর। নজরুল ইসলাম নামের আমাদের একজন পোশাক শ্রমিক সেদিন গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। অনেক শ্রমিক আহত হন। এরপর মানুষের মাঝে যেমন ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে তেমনই সরকারের দমনপীড়নের মাত্রাও বেড়ে যায়। পাড়া-মহল্লায়, বাসাবাড়িতে ঢুকে ধরপাকড় করতে থাকে সরকারি বাহিনীর লোকজন। ওই কারণে আন্দোলনকারী জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী ছাত্রশিবির এবং শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের নেতাকর্মীরা বাসা ছেড়ে দেই। আত্মগোপনে থেকে আন্দোলন এগিয়ে নিতে থাকেন। ২২ জুলাই ২০২৪ জয়দেবপুর এলাকায় পুলিশের তাণ্ডব শুরু হয়। নির্বিচারে গুলিবর্ষণ, টিয়ারগ্যাস, ছাত্রদের গ্রেফতার শুরু হলে অনেক শ্রমিক বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নিতে থাকেন। ২ আগস্ট ২০২৪ থেকে পোশাকশ্রমিক, ইজিবাইক শ্রমিক, হকার ও ছাত্রদের নিয়ে গাজীপুর চৌরাস্তা, জয়দেবপুর, কোনাবাড়ি, সালনাতে আন্দোলন গড়ে তোলে ছাত্র-শ্রমিক জনতা। সরকারি বাহিনীর বর্বরতা তো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে উঠে এসেছ। গুলি করে হত্যার পর আশুলিয়ায় শ্রমিকদের লাশ পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। কোনাবাড়ি ইজিবাইক শ্রমিক হৃদয়কে গুলি করে হত্যার পর লাশ গুম করে ফেলা হয়েছে। অসংখ্য শ্রমিক আহত-নিহত হয়েছে। অনেক লাশ খুঁজেও পাওয়া যায়নি। গাজীপুর আশুলিয়া সাভারে এখনো অনেক শ্রমিক নিখোঁজ রয়েছেন।
নয়. বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শ্রমিক আন্দোলন আজও মানুষের প্রেরণা জুগায়। যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোর হে মার্কেট চত্বরের আন্দোলনসহ বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় নানা সময় শ্রমিক আন্দোলন হয়েছে। যা আজও বিশ্বের কোটি কোটি শ্রমজীবী মানুষের মাঝে প্রেরণা হয়ে আছে।
১৮৮৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের হে মার্কেট চত্বরে শ্রমিকরা নেমেছিলেন তুমুল আন্দোলনে। আমেরিকা স্বাধীন হওয়ার আগে শ্রমজীবী মানুষের প্রথম সংগঠন গঠে ওঠে ১৬৮৪ সালে। আমেরিকায় নারী শ্রমিকরা প্রথম ধর্মঘট করে ১৮২৩ সালে। বিশ্বের শিল্প-কারখানাগুলোতে শ্রমিক আন্দোলন শুরু ১৮২৮ সালে। ঊনবিংশ শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শ্রমিক শ্রেনি নিজ নিজ দেশে ট্রেড ইউনিয়ন গড়ে তোলে। ১৮৬৪ সালে মার্কস-এঙ্গেলসের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী সমিতি। ইতিহাসে এটাই প্রথম আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী সংগঠন। ১৮৭১ সালের ১৮ মার্চ প্যারিসের শ্রমিকরা শহর থেকে বুর্জোয়া শাসকদের হটিয়ে নিজেদের হাতে ক্ষমতা নিয়ে নেয়। ১০ দিন পরে ২৮ মার্চ শ্রমিকরা গঠন করে পৃথিবীর প্রথম প্রলেতালিয়েত রাষ্ট্র প্যারিস কমিউন। অক্টোবর বিপ্লবকে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত অঞ্চলগুলোয় বলা হয় মহান অক্টোবর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব। ১৯১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার বলশেভিকরা ক্ষমতা দখল করে। দক্ষিণ আফ্রিকায় খনি শ্রমিকদের ওপর নানা নির্যাতনের প্রতিবাদে আন্দোলন গড়ে ওঠে। ১৯৪৬ সালে ৭০ হাজার শ্রমিকের অংশগ্রহণে ধর্মঘট পালিত হয় কমিউনিস্টদের নেতৃত্বে। ১৯৫৩ সালের ১৭ জুন তৎকালীন পূর্ব জার্মানির সরকারের বিরুদ্ধে জেগে উঠেছিল শ্রমিকসহ সাধারণ জনগণ। ১৯৮২ সালের ১৯ জানুয়ারি পশ্চিমবঙ্গ ও কেরালায় সর্বাত্মক বনধধ পালিত হয়েছিল।
পরিশেষে, জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গৌরবময় অধ্যায়। চাকরিক্ষেত্রে কোটা সংস্কার, রাজনৈতিক অধিকার বাস্তবায়ন, বাকস্বাধীনতা পুনরুদ্ধার এবং স্বৈরশাসনের অবসানের লক্ষ্যে ২০২৪ সালের এই অভ্যুত্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় তৈরি করেছে। ইতিহাস সাক্ষী যে, বাংলাদেশের প্রতিটি গণ-আন্দোলনে শ্রমজীবী মানুষ সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, বিজয়ের পরেও তাদের জীবনে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসে না। শ্রমজীবীদের সংগ্রাম, আত্মত্যাগ ও অবদান জাতীয় নীতি প্রণয়নে উপেক্ষিত থাকে। যে রিকশা শ্রমিকরা জুলাই আন্দোলনে রিকশাকে অ্যাম্বুলেন্স বানিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ছাত্র-জনতার পাশে দাঁড়িয়েছিল। যে পোশাকশ্রমিকরা জীবন বাজি রেখে অভ্যুত্থানে অংশ নিয়েছে, অকাতরে প্রাণ দিয়েছে, অভ্যুত্থানপরবর্তী বাংলাদেশে সে শ্রমিকদের মজুরির আন্দোলনকে “সরকারবিরোধী তৎপরতা” বলে প্রচার করা হয়েছে।