“শোন মর্তের জীব-
অন্যকে যে করিবে পীড়ন, নিজে হইবে তত ক্লীব।” -কাজী নজরুল ইসলাম
বাংলা সাহিত্যের বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম শুধু প্রেম ও সাম্যের কবিই নন, তিনি মানবমর্যাদা, ন্যায়বিচার ও নৈতিকতার প্রবক্তাও। নজরুলের সাহিত্যজগৎ মূলত মানবিকতার ওপর প্রতিষ্ঠিত-যেখানে অত্যাচারীর বিরুদ্ধে তীব্র ঘৃণা এবং নিপীড়িত মানুষের প্রতি মমত্ববোধ দেখা যায়। তাঁর উক্ত পংক্তিটি একদিকে যেমন সমাজে পীড়নকারীর নৈতিক পতনকে নির্দেশ করে, অন্যদিকে বিশ্বমানবতার চিরন্তন সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করে যে-অন্যকে কষ্ট দেওয়া মানে নিজের মানবিক শক্তিকে ধ্বংস করা।
এই প্রবন্ধে উক্ত পংক্তিকে কেন্দ্র করে সামাজিক, সাহিত্যিক, ধর্মীয়, দার্শনিক ও মানবতাবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করা হলো।
পীড়নের বীজে সমাজের অবক্ষয়:
সমাজ হলো পরস্পর নির্ভরশীল মানবসম্পর্কের বুনন। সেখানে নির্যাতন ও অবিচার সমাজের ভিত্তিকে দুর্বল করে। তাই সমাজবিজ্ঞানী এমিল দুর্খেইম (Emile Durkheim) বলেছেন-
“অন্যায় ও অবক্ষয় সমাজের সংহতি নষ্ট করে, আর সংহতি নষ্ট হলে মানুষ নিজেরাই দুর্বল হয়ে পড়ে।”
নজরুলের পংক্তি এই সামাজিক সত্যেরই কাব্যিক ঘোষণা। “ক্লীব”-এখানকার ইঙ্গিত নৈতিক অক্ষমতা, আত্মিক শক্তিহীনতা।
সমাজে মানুষ মানুষের ওপর অন্যায় পীড়নের ফলে যা হয়- ক্ষমতার অপব্যবহার সামাজিক ভাঙন সৃষ্টি করে, অন্যায়কারী নিজেই নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়ে, পরিবার ও সমাজে আস্থা ভেঙে যায়, নিপীড়নকারী শেষতক নিজের সম্মান হারায়।
বিখ্যাত দার্শনিক থমাস হবস (Thomas Hobbes) বলেছেন-
“অন্যের ওপর অত্যাচারই মানুষকে ভয় ও অস্থিরতার বন্দী করে।” এটি নজরুলের “ক্লীব” শব্দের অর্থকে আরও স্পষ্ট করে।
মানবতাবাদী কাব্যের শীর্ষবিন্দু:
নজরুলের ভাষা, হৃদয় ও চেতনায় ছিল মানুষের মুক্তির গান। তাঁর মানবতাবাদী কাব্যচেতনা রবীন্দ্রনাথ, শেলি, ওয়ার্ডসওয়ার্থের মতোই গভীর মানব-সচেতনতা বহন করে। নজরুল অত্যাচারীকে কঠোর ভাষায় আঘাত করেন-
নজরুলের অন্যান্য প্রাসঙ্গিক পংক্তি- “যে অত্যাচার করে তার চাইতে বড় কাপুরুষ আর নেই।” “চির উন্নত মম শির-শির নত করি না।”
“পীড়ন” শব্দটি এখানে একটি প্রতীক, যা বোঝায়- অন্যায়, নিষ্ঠুরতা, অহংকার, ক্ষমতার অপব্যবহার
আর “ক্লীব” শব্দটি বোঝায়- নৈতিক অক্ষমতা, মানবিক শক্তির ক্ষয় ও চরিত্রের দুর্বলতা।
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন-
“মানুষের প্রতি অবমাননা শেষত নিজের প্রতি অবমাননা।”
ইংরেজ কবি শেকসপিয়র বলেছেন-
He who injures others injures himself. অর্থাৎ- ‘যে অন্যকে আঘাত করে, সে নিজেকেই আহত করে।’
আমরা দেখি জাতীয় কবি নজরুলের পংক্তি এই সার্বজনীন সাহিত্যিক সত্যেরই বাঙালি রূপকথন। কুরআন, হাদীস ও অন্যান্য ধর্মের আলোকে পীড়নের পরিণতিও আলোচনা করা যেতে পারে।
ইসলামে অন্যায় ও পীড়ন কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। কুরআনে বারবার বলা হয়েছে- “আল্লাহ জালিমদের পছন্দ করেন না।” (সুরা আল ইমরান)। “তোমরা একে অপরের ওপর অবিচার করো না।” (হাদীস, মুসলিম) আল্লাহর রাসুল সা. আরও বলেছেন- “জুলুম হলো অন্ধকারের স্তূপ।”
অর্থাৎ পীড়নের শেষ পরিণাম অন্ধকার, পতন ও পরাজয়।
হিন্দু ধর্মের মনুসংহিতা তে বলা হয়েছে- “যে অন্যায় করে, তা তার কাছেই ফিরে আসে।”
মহামতী গৌতম বুদ্ধ বলেছেন- “ঘৃণা ঘৃণায় নাশ হয় না; করুণাই তা নাশ করে।”
খ্রিষ্টান ধর্মের গভীরেও রয়েছে মানবতাবোধের উচ্চারণ। বাইবেলে বলা হয়েছে- “যে অন্যকে কষ্ট দেয়, সে নিজের আত্মাকে আঘাত করে।”
সব ধর্মই নজরুলের কবিতার মূল বাণীকেই সমর্থন করে- অন্যের প্রতি পীড়ন মানে নিজের মানবিকতার ধ্বংস।
কর্মফল ও মানবপ্রকৃতির সত্য:
বিশ্বদর্শনে “কারণ-কার্য” তত্ত্বের মূল কথা- যে কাজ করবে, তার ফল সে নিজেই পাবে। গ্রীক দার্শনিক অ্যারিস্টটল বলেছেন- “অসততা আত্মাকে দুর্বল করে।” সুফী দার্শনিক রুমি বলেছেন- “আঘাত দিলে তোমার হৃদয়ই প্রথম ভাঙে।” ইমানুয়েল কান্টের নৈতিক দর্শন হচ্ছে- তুমি অন্যকে যেমন আচরণ করো, সেটাই মানবতার প্রকৃত মূল্যায়ন।” নজরুলের পংক্তি- “অন্যকে যে করিবে পীড়ন” এই দার্শনিক তত্ত্বেরই কাব্যিক সংক্ষেপণ।
মানুষের শক্তি তার ভালোবাসায়:
মানবতাবাদীরা বিশ্বাস করেন- মানুষের প্রকৃত শক্তি আসে তার নৈতিকতা, সহমর্মিতা ও সদাচরণ থেকে। ইতালীয় মানবতাবাদী পিকো দেলা মিরানডোলা বলেছেন-
মানুষের মহত্ত্ব তার দয়ার মধ্যেই।” নজরুল সেই দয়ার শক্তিকেই গানে-ছন্দে তুলেছেন।
যিনি অত্যাচারী, তিনি শক্তিশালী নন-তিনি দুর্বল, ক্লীব, কারণ তিনি নিজের মানবতাকে ক্ষতবিক্ষত করেছেন।
ইদানীং আমাদের শান্তিপ্রিয় পার্বত্য জনপদে কিছু মানুষের আচরণ এমনই অস্বাভাবিক হয়ে উঠেছে যে তারা নিজেদের মানবিক পরিচয় বিসর্জন দিয়ে অমানুষের স্বভাবে অবনমিত হয়েছে। সমাজে তাদের উপস্থিতি যেন এক অস্থির ছায়া- কখনো গোপনে, কখনো প্রকাশ্যে তাদের অশান্ত আত্মা ঘেউঘেউ করতে থাকে। এরা মানুষ নয়, বরং মানুষরূপী অবমানব; নৈতিকতার আলোহীন, আত্মবোধহীন ছায়াদেহ। টোকিও নগর গড়ার আগে প্রতিষ্ঠাতা একটি বাণী দিয়েছিলেন- ‘যে নিজেকে সংযত করতে পারে না, সে কোনো নগরের জন্য আশীর্বাদ নয়- অভিশাপ।’ এই বাণী বিশ্লেষণে আমরা দেখতে পাই এটি শুধু একটি শহর গড়ার নীতি নয়; এটি মানুষ গড়ারও প্রাথমিক শর্ত। যে নিজের বংশ, চরিত্র বা নৈতিক দীনতাকে ঢাকতে পারে না, সে সমাজে কেবল বিভ্রান্তি, বিশৃঙ্খলা আর অস্থিরতা সৃষ্টি করে। এমন চরিত্রহীন মানুষেরই আচরণ আমাদের জনপদে দেখা যাচ্ছে। তারা নিজেদের জন্মপরিচয়ের স্বচ্ছতা না থাকায়, নৈতিক দারিদ্র্য ছাপানোর ব্যর্থ চেষ্টায় লুকিয়ে থাকে আড়ালে। কিন্তু সেই আড়ালের ভেতর থেকেও তাদের অসুস্থ মনোবৃত্তি প্রকাশ পায় “ঘেউ ঘেউ” করে। তারা জানে-শক্তিহীনতার ভয়, পরিচয় সংকট, আর মানসিক বিষণ্নতা যখন মানুষকে গ্রাস করে, তখন মানুষের আত্মা শুকিয়ে গিয়ে পশুত্ব মাথা তোলে।
অমানুষের পশুত্বের লক্ষণ: এই মানুষরূপী অমানুষদের আচরণে দেখা যায়- উন্মত্ত রোষ, যার শিকড় হীনমন্যতা। হিংসার ফেনা, যা তাদের দুঃসাহসিক অশ্লীলতার পরিচয় বহন করে। আত্মিক দীনতা, যা তাদের বিবেককে অন্ধ করে। ব্যর্থতার ক্ষত, যা তারা অন্যের ওপর চাপিয়ে দিতে চায়।
মানুষ হওয়া সবচেয়ে বড় শক্তি:
অন্যায়কারী যত সাময়িকভাবে শক্তিশালীই মনে হোক, শেষ পর্যন্ত সে ভেঙে পড়ে। ধর্ম, নীতি, সাহিত্য ও দার্শনিক দৃষ্টিকোণে বুঝা যায়- ১. অন্যকে কষ্ট দেওয়া মহাপাপ, কারণ এতে মানুষের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়। ২. ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা প্রত্যেক মানুষের দায়িত্ব, নজরুল ছিলেন ন্যায়ের সৈনিক। ৩. চরিত্রই মানুষের প্রকৃত শক্তি, ক্ষমতা নয়, নৈতিকতাই আসল শক্তি। ৪. সমাজে সহমর্মিতা ও দয়া প্রতিষ্ঠা জরুরি, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোই মানবিকতা। ৫. পীড়ন থেকে বিরত থাকা মানে শান্তি ও কল্যাণের পথ, নিজেকে রক্ষা করতে হলে অন্যকে রক্ষা করতে হয়।
আমরা পরিশেষে বলতে পারি নজরুলের কবিতাংশটি কেবল একটি কবিতাশ্লোক নয়; এটি মানবতা, নৈতিকতা ও ন্যায়বিচারের এক চিরন্তন ঘোষণা- “অন্যকে কষ্ট দিলে তুমি শক্তিশালী নয়, বরং তুমি ভেতর থেকে ধ্বংসপ্রাপ্ত-ক্লীব।”
এই বাণী ধর্ম, সাহিত্য, দর্শন ও মানবতাবাদের সার্বজনীন সত্যের সঙ্গে মিলে যায়। সমাজের ন্যায় ও মানবিকতার পথে চলতে গেলে নজরুলের এই বানী আজও সমান প্রাসঙ্গিক, সমান শক্তিশালী।