বাংলাদেশের রাস্তায় দাঁড়িয়ে যদি চারপাশে তাকাই, একটা প্রশ্ন মনে আসে - এই যে আমরা প্রতিদিন বাঁচছি, সংগ্রাম করছি, স্বপ্ন দেখছি, এটা কি আসলেই আমাদের নিজেদের গল্প? বাংলাদেশের গল্প কে লিখছে? আমরা নিজেরা, নাকি অন্যরা আমাদের গল্প নির্ধারণ করছে অজান্তেই?

১৯৭১ সালে যখন আমরা স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছিলাম, তখনও এই একই প্রশ্ন ছিল - আমরা কি নিজেদের ভাগ্য নিজেরা ঠিক করব, নাকি অন্যরা আমাদের জন্য সিদ্ধান্ত নেবে? লাখো মানুষের রক্তের বিনিময়ে আমরা সেদিন বলেছিলাম - আমরা নিজেরাই আমাদের গল্প লিখব। কিন্তু আজ ২০২৫ সালে এসে সত্যিটা কী? আমরা কি সত্যিই নিজেদের গল্পের লেখক? রাজনীতিবিদরা চায় তাদের মতো করে দেশের গল্প লেখা হোক। ক্ষমতায় থাকলে বলে “আমরাই দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি”, আর বিরোধীতে গেলে বলে “দেশ ধ্বংসের মুখে”। দুই পক্ষই আসলে নিজেদের সুবিধামত গল্প বলছে।

বড় ব্যবসায়ীরা চায় এমন গল্প যেখানে তাদের লাভ হবে। তাই পোশাক কারখানার মালিকরা বলে “আমরা দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড”, কিন্তু শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরীর কথা আসলে সেটা তাদের গল্পে থাকে না।

আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো - বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবি - তারাও আমাদের অর্থনীতির গল্প লিখতে চায়। তারা বলে “এই নীতি নাও, ঐ সংস্কার করো”, আর আমরা শুনি কারণ আমাদের টাকা দরকার। কিন্তু এই সব নীতি কি সত্যিই সাধারণ মানুষের জন্য ভালো, নাকি তাদের নিজেদের স্বার্থে?বিদেশি দেশগুলোও খেলছে। কেউ চায় আমরা ভারতের দিকে ঝুঁকি, কেউ চায় চীনের দিকে, কেউ আমেরিকার দিকে। আমাদের ভূরাজনৈতিক অবস্থান এমন যে সবাই আমাদের নিয়ে টানাটানি করে।এমনকি আমাদের নিজেদের ভেতরেও ভাগ আছে। ধনী শ্রেণী চায় একরকম গল্প, গরিব মানুষ চায় অন্যরকম। শহুরে মধ্যবিত্ত যা ভাবে, গ্রামের কৃষক তা ভাবে না। তরুণরা যে দেশ চায়, বয়স্করা সেটা নিয়ে সংশয়ে থাকে।

কিন্তু এত কিছুর পরও, একটা সত্য আছে - শেষ পর্যন্ত গল্পটা লেখে মানুষ। ১৭ কোটি মানুষ প্রতিদিন যা করছে, যা ভাবছে, যেভাবে বাঁচছেÑ সেটাই তো আসল গল্প।

রানা প্লাজা ধসের পর শ্রমিকরা নিজেদের অধিকারের জন্য লড়াই করে অনেক কিছু বদলে দিয়েছে। কেউ তাদের জন্য গল্প লিখে দেয়নি, তারা নিজেরা লিখেছে রাস্তায় নেমে, আন্দোলন করে।

আমাদের তরুণরা কোটা সংস্কার আন্দোলনে নেমে দেখিয়ে দিয়েছে যে তারা নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেরা ঠিক করতে চায়। কেউ তাদের বলেনি, তারা নিজেরা জেগে উঠেছে।

প্রযুক্তি খাতে আমাদের তরুণরা নিজেদের দক্ষতায় কাজ পাচ্ছে, ব্যবসা করছে। পথেঘাটে ছোট উদ্যোক্তারা নিজেদের মতো করে এগিয়ে যাচ্ছে। এগুলো কি কারো লেখা গল্প? না, এটা মানুষ নিজেরাই তৈরি করছে।

আসল সমস্যা হলো, আমরা অনেক সময় নিজেদের ক্ষমতা বুঝি না। আমরা ভাবি “আমি তো একজন সাধারণ মানুষ, আমি কী করতে পারব?” কিন্তু ভুলে যাই যে লাখো সাধারণ মানুষ মিলেই তো দেশ। আরেকটা সমস্যা হলো শিক্ষাব্যবস্থা। আমাদের স্কুল-কলেজে শেখানো হয় মুখস্থ করতে, প্রশ্ন করতে না। ফলে আমরা বড় হয়ে ভাবি যা বলা হচ্ছে সেটাই মেনে নিতে হবে। নিজে থেকে ভাবার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলি।

মিডিয়াও একটা বড় ভূমিকা রাখে। কোন খবর দেখাবে, কোনটা দেখাবে না, কীভাবে দেখাবে - এসব সিদ্ধান্তে আমাদের গল্প তৈরি হয়। সোশ্যাল মিডিয়ায় আমরা যা দেখি, সেটাও অ্যালগরিদম ঠিক করে দেয়। আমরা ভাবি নিজে থেকে দেখছি, কিন্তু আসলে আমাদের দেখানো হচ্ছে।

দুর্নীতি আর অনিয়ম আমাদের দুর্বল করে রাখে। যখন একজন সাধারণ মানুষ ন্যায্য অধিকার পেতে ঘুষ দিতে বাধ্য হয়, তখন সে নিজের ক্ষমতা হারায়। ব্যবস্থার কাছে অসহায় হয়ে পড়ে।

আমরা ও নিজেদের গল্প লিখতে পরবো-

প্রথম কাজ হলো শিক্ষিত হওয়া। শুধু সার্টিফিকেট নয়, আসল শিক্ষাÑ যা আমাদের চিন্তা করতে, প্রশ্ন করতে, বিশ্লেষণ করতে শেখায়। আমাদের বাচ্চাদের শেখাতে হবে গতানুগতিক পথে না চলে নতুন পথ খুঁজতে।

দ্বিতীয়ত, সচেতন থাকতে হবে। চারপাশে কী হচ্ছে, দেশে কী হচ্ছে, বিশ্বে কী হচ্ছে - জানতে হবে। কিন্তু শুধু জানলেই হবে না, সেটা নিয়ে ভাবতে হবে, বুঝতে হবে। তৃতীয়ত, একসাথে কাজ করতে হবে। একা একা কিছুই করা যায় না। কমিউনিটি তৈরি করতে হবে, সংগঠিত হতে হবে। পাড়ায়, গ্রামে, শহরে - যেখানে আছি সেখানে মানুষের সাথে মিলে কাজ করতে হবে। চতুর্থত, ছোট ছোট পদক্ষেপ নিতে হবে। পুরো দেশ রাতারাতি বদলে যাবে না, কিন্তু নিজের এলাকা পরিষ্কার রাখা, ঠিকভাবে ভোট দেওয়া, দুর্নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়ানো - এগুলো তো পারি। এই ছোট ছোট কাজ জমলে বড় পরিবর্তন আসে।পঞ্চমত, নৈতিকতা ধরে রাখতে হবে। অনেক সময় দেখি যারা পরিবর্তনের কথা বলে, ক্ষমতায় গেলে তারাও একই হয়ে যায়। নিজেদের নীতি, মূল্যবোধ ধরে রাখতে হবে।

আমরা জানি, এটা সহজ না। দারিদ্র্যের চাপে থাকা একজন মানুষকে বলা সহজ “তুমি তোমার গল্প লেখো”, কিন্তু সে যখন তিন বেলা খাবার জোগাড় করতে পারে না, তখন গল্প লেখার ইচ্ছা কোথায়?

যে মেয়েটাকে স্কুলে যেতে দেওয়া হয় না, তাকে বলা “তুমি তোমার ভবিষ্যৎ তৈরি করো” - এটা তো হাস্যকর। যে যুবক চাকরি পায় না যোগ্যতা থাকলেও, তাকে স্বপ্ন দেখতে বলা কষ্টের।

কিন্তু তারপরও, হাল ছাড়া যাবে না। কারণ ইতিহাস বলে, যখনই মানুষ একসাথে দাঁড়িয়েছে, পরিবর্তন এসেছে। ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন থেকে ডিজিটাল বাংলাদেশ - সব কিছুতেই মানুষের শক্তিই মূল চালিকা ছিল।

তাহলে বাংলাদেশের গল্প কে লিখছে? এটা একটা চলমান যুদ্ধ। অনেকেই আমাদের গল্প লিখতে চায় - রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, বিদেশি শক্তি, আমলা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত গল্পটা লেখে ১৭ কোটি মানুষ - তাদের প্রতিদিনের কাজে, সিদ্ধান্তে, সংগ্রামে। আমরা যদি সচেতন না থাকি, যদি নিজেদের দায়িত্ব না নিই, তাহলে অন্যরা আমাদের গল্প লিখবে। কিন্তু আমরা যদি জেগে উঠি, শিক্ষিত হই, সংগঠিত হই, তাহলে আমরাই আমাদের গল্পের লেখক হতে পারব। এই গল্পে নায়ক কোনো একজন না, নায়ক হলো পুরো জাতি। এই গল্পের সুখী সমাপ্তি নিশ্চিত না, কিন্তু চেষ্টা করার দায়িত্ব আমাদের। বাংলাদেশের গল্প লিখছে আমরা নিজেরাই - তবে সেই লেখনী হাতে আমাদের জোরে ধরতে হবে। নইলে অন্যরা ছিনিয়ে নিয়ে তাদের মতো লিখবে। এটাই বাস্তবতা, এটাই চ্যালেঞ্জ, এটাই আমাদের দায়িত্ব।