আমার প্রথম বিদেশ সফর আর প্রথম উমরাহ একই সুতায় গাঁথা। সফরটা আমার জন্য ছিল আশাতীত রোমাঞ্চকর আর স্মৃতিবহুল।

জিদ্দা বিমান বন্দরে অবতরণ। তারপর ধীওে ধীরে মক্কাগেট পার হয়ে চলেছি আমার কাক্সিক্ষত গন্তব্যে। হৃদয়ে সঞ্চায়িত শিহরণ যেন উপচে পড়ছে দেহাবয়বে। আমি মুসাফির।

আমার রবের আমন্ত্রিত মুসাফির।

আমার চাওয়া আর পাওয়ার কি মধুর সমন্বয়।

একে তো উমরাহ তার উপর পবিত্র রমযান।

দুর্বার, দুর্দমনীয় ১৪০০০ মাইল গতিতে আমার মন যেন ছুটে চলেছে প্রায় ১৫০০ বছর আগের মক্কার অলি-গলি, দুর্গম পাহাড়ে ঘেরা পথ আর ঝঞ্চা বিক্ষুব্ধ মরুতে। যেখানে ছিলেন আমার প্রাণের প্রিয়জন।

হোটের-মোটেল মাড়িয়ে আমার অপেক্ষার অবসান ঘটল। আমি ছুটে চললাম রবের কাবাপ্রান্তরে। সে যেন ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে চলা এক ঘোড় সওয়াব যোদ্ধা। হেরেম পেরিয়ে কখন যে আমার দৃষ্টি সীমায় কাবার আগমন। উহ! যেন জান্নাতী অনুভূতি। রাব্বে কারিমের সিজদায় অবনত মস্তকে সিজদাতুশ শোকরে আবৃষ্ট হলো তনুমন।

আমার প্রথম কাবা দর্শন! মানে আমার রবের ঘর!! সেই সুখানুভুতি আমি কোনদিনই কাউকে বুঝাতে পারবো না। মাতাফ তখন আমার সামনে বাঁধার প্রাচীর! ‘কাবাকে’ ধরা যাবে না, যাবে না ছোঁয়া।

শুধু দূর থেকেই ভালবেসে ফিরে যেতে হবে।

তৃষ্ণার্ত নয়ন, মন জুড়িয়ে নেবার আপ্রাণ চেষ্টা করলাম মাতাফে নামায পড়ে অপলক নেত্রে কাবা দর্শনের মাধ্যমেই। এটাই আমার রব্বে কারিম আল্লাহ সুবহানাহু তা’য়ালার ইচ্ছা।

প্রিয় নবীর স্মৃতিবিজরিত মক্কার অলি-গলি, মরু-প্রান্তর ঘুরে দেখার পালা। আহ্! মক্কার আকাশবাতাস যেন আমার নবীর গায়ের সু-ঘ্রানে বিমোহিত হয়ে আছে। আর আমিও তাতে বুদ হয়ে চাতক পাখির মতো তৃষ্ণার্ত হৃদয়ের সুপ্ত ক্ষুধা নিবারণে ব্যতিব্যস্ত সময় পার করছি।

কাবার অদূরেই অবস্থিত আমার প্রাণের প্রিয় রাসুলের বাড়ি।

আমি যেন নবীজির সাথেই মক্কার পথে প্রান্তরে হারিয়ে গেলাম। জান্নাতি সুখের পরশে আন্দোলিত আমার দেহ-মন।

আমরা দেখে নিলাম-পিয়ারা হাবিব, ইব্রাহীম (আঃ) ও মা হাজার (আঃ) এর স্মৃতি বিজড়িত নগরী গারে সওর, জাবালে নুর, মিনা-মুজদালিফা আরাফা আর জাবালে রহমত। আরো কত মায়াভরা স্মৃতির শহর।

সেই সফরের বিদায়কালের বেদনাসিক্ত দৃশ্যপট আজো মনকে আন্দোলিত করে, প্রাণ কেঁদে ওঠে আর অশ্রুধারা বয়ে চলে চোখের কোণে। মাতাফে দাঁড়িয়ে রবের কাবাকে অপলক নেত্রে চেয়ে দেখি। বিদায়ের শেষ দৃষ্টি বুলিয়ে নিতে চোখের পানিতে চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে উঠে। সেদিন কাঁপা-কাঁপা ঠোটে কম্পমান হৃদয় বীণায় বার বার উচ্চারিত হয়েছিল- হে বায়তুল্লাহ! আমি তোমার কাছে আবার ফিরে আসতে চাই। বারে বারে আসবো যদি তোমার আমার রাব্বে কারীম আমাকে কবুল করেন।

নবীজির শৈশব, কৈশর আর নবুয়তি জীবনের কত-শত স্মৃতির মায়া কাটিয়ে আমাদের যাত্রা এবার নববী রাষ্ট্রে।

পথ এবং পথের দুপাশের পাহাড় আর মরুভূমির অপরূপ সৌন্দর্য যেন আমাকে বিমোহিত করে তুলেছিলে। মরু-পাহাড়ের রুপ ঐশ্বর্য এই তো প্রথম দেখা হলো! এতো সেই মরু-বালুকণার প্রান্তর যা ধন্য হয়েছে হিজরতকালে পেয়ারা নবীর পবিত্র পদস্পর্শে। এতো সেই পাহাড়-তেপান্তর যা আমার নবীর দৃষ্টি পরশে স্নিগ্ধ হয়েছিল।

আমরা পৌঁছি গেলাম নবীর মদিনায়। দূর থেকে ভালোবাসার সবুজ গম্বুজ দেখে আনন্দে শিহরিত হলো মন। এ যেন অন্যরকম ভালোবাসা। যাকে ভাষার রূপ দেওয়া যায় না। গেলাম মসজিদে নববীতে, গেট পেরুতেই সবুজ গম্বুজের হাতছানি। একসময় আল্লাহর অপার মহিমায় পৌঁছে গেলাম রিয়াদুল জান্নাতে। দুনিয়ার বুকে জান্নাতি ঘ্রাণ! দু’রাকাত নামাযে সেদিন রবের কাছে সকল আরজি পেশ করতে চেয়েছিলাম। আর খুঁজেছিলাম পেয়ারা নবীর ভালোবাসা নিবিড় বন্ধন! আমি যেন পথ হারিয়েছিলাম পৃথিবীর। আর খুঁজে পেয়েছিলাম জান্নাতি সুখ। মদিনার আকাশবাতাস আর পথে-প্রান্তরে যেন নবীজীকে অন্যভাবে খুঁজে পেলাম। অবশেষে সবুজ গম্বুজের নির্মল ভালোবাসার মায়া কাটিয়ে আমাদের ফেরার পালা। ১৪ রমযান ১৫ এপ্রিল আমাদের বিদায়ী ঘণ্টা বেজে উঠল। মসজিদে নববীতে আমাদের শেষ ইফতার ও তারাবী আদায় করে যথারীতি বিদায় আয়োজন। মন বার বার ছুটে যেতে চাইছে সবুজ গম্বুজের মায়ায় ঘেরা নববী চত্ত্বরে। মনে মনে রবের কাছে কত-শত প্রার্থনা- হে আমার মালিক! তুমি আমাকে আবার রমযানের শুরুতে নিয়ে এসো যেন সারাটা রজমান মক্কা মদিনায় থাকতে পারি। আবার মন চাইছে- হে কাবার মালিক! আমাকে শেষ দশকে নিয়ে এসো, যেন এতেকাফে বসতে পারি।

মালিকের কাছে একজন গোলামের চাওয়ার কি শেষ আছে? গাড়ি চলে এসেছে- আমাদের ‘গোল্ডেন টিউটিপ’ হোটেলের সামনে। লাগেজ উঠানোর কাজে ব্যস্ত সবাই। সাথে আমাদের সাহরীর খাবারও !! এই ফাঁকে আমি ছোট ছেলেকে নিয়ে সবুজ গম্বুজের মায়া ঘেরা সোনালী প্রান্তরে অশ্রু ভেজা কাতর কণ্ঠে রবের আছে আবেদন - হে আমার মালিক ! আমার মনটা কিছুতেই তোমার হাবীবের মায়া কাটিয়ে যেতে চায় না। তবুও যেতে হচ্ছে। তবে তুমি আমাকে খুব শ্রীঘ্রই আবার নিয়ে এসো। রাত প্রায় ১টা বাজে গাড়ি চলতে শুরু করল। গাড়ির জানালা ভেদ করে বিষন্ন দৃষ্টি আছরে পড়তে থাকে সবুজ গম্বুজে। যতদূর পর্যন্ত দেখা যায় চোখের কোণ বেয়ে ঝড়ে পড়ে অশ্রুধারা। এ যেন আমার প্রাণের রাসুলকে ছেড়ে যাওয়ার বেদনাশ্রু।

শুরু হয়ে গেল রহমানুর রহিমের পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ। ছেলে দুটি বরাবরই সামনের ছিটেই বসত। কিন্তু এই প্রথম বড় ছেলের এসির বাতাসে প্রচণ্ড শীত করতে থাকে। এসি কমানো, আরেকটি গেঞ্জি পড়ানো। কোন কিছুতেই শীত কমে না। সিট চেঞ্জ করে ছেলেকে আমার পাশে আর ওর বাবাকে ছোট ছেলের পাশে সামনে বসানো হয়। আল্লাহু সুবহানাহু তা’য়ালা যেটা চান সেটা অপ্রতিরোধ্য। রাতের মরুপথে গাড়ি চলছে যেন মরুঝড় সাইমুমের তীব্র গতি বেগে।

ক্লান্ত দেহ বুঝতেই পারেনি কখন হারিয়ে গেছে ঘুমের রাজ্যে। ছেলের ভয়ার্তকণ্ঠের ডাকে যখন ঘুম ভাঙে- তখন বুঝতে পারি অশান্ত সাইমুমের তীব্রতায় আমার সবকিছু লণ্ড-ভণ্ড হয়ে গেছে। গাড়ির ভিতরে ভয়ার্ত চিৎকার আর কান্নার রোল। ছেলে-মা মনি, মান মনি আমাদের কি হয়েছে! আমার মনে হলো এখানেই জীবনের সফর শেষ। তখন আমি শান্ত কণ্ঠে শুধু বললাম-বাবা ! আমরা আল্লাহর কাছে চলে যাচ্ছি। আল্লাহকে ডাকো! তীব্রগতিতে ছুটে আসা আমাদের গাড়িটা ব্রেক ফেইল করেছে। ফলশ্রুতিতে যা হবার তাই। গাড়ি বামে উল্টে পড়ে দূরন্ত গতিতেই গন্তবে ছুটে চলেছে যেন থামার কোন ইচ্ছেই নেই। ভিতরে যাত্রীদের ক্ষত-বিক্ষত রক্তাক্ত দেহের আহাজারী! আমি সেদিন দেখেছি জীবন-মরণের সন্ধিক্ষণে মানুষের বাঁচার কি তীব্র আকুতি। সবাই বাঁচতে চায়, শেষবারের মতো রবের কাছে আর্তনাদ করে আহ! দুনিয়ার জীবন তুমি কতো তুচ্ছ, তবুও কতো মায়াময়!

এতোকিছুর মাঝেও আমি আবার অচেতন হয়ে যাই, হুঁশ ফেরে ছেলের ডাকে। “মা-মনি, মা-মনি দেখ, আমার মাথায় রক্ত”। অন্ধকারে মাথা হাতড়ে ভেজা অনুভূত হয়। আমি যেন তখন নিশ্চিত আমরা স্বপরিবারে রবের দীদারের যাত্রী! বললাম- “বাবা কালিমা পড়ো। আমরা আল্লাহর কাছে যাচ্ছি”। নিজেও কালিমা পড়ে রবকে ডাকছি। তখন যেন শেষবারের মতো মানসপটে ভেসে উঠল মমতাময়ী মায়ের মুখ। ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজনের কথা। মনে হলো আর কখনো তোমাদের সাথে দেখা হবে না। হবে না কোন কথা। গাড়ি তখনও থামেনি বাম পাশের সিটে বসা আমাদের ছিন্ন-ভিন্ন রক্তাক্ত দেহ আর বিভীষীকাময় আত্মচিৎকারে ভারি হয়ে উঠেছে অন্ধকার দুর্গম, জনমানবহীন মরু প্রান্তর। হঠৎ করেই মনে হলো আমরা ঘন কালো অন্ধকারাচ্ছন্ন দুর্গম গভীর টানেলের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছি। যেখান থেকে বের হওয়ার কোন রাস্তা নেই।

কয়েক কিলোমিটার যাওয়ার পরে রাস্তার পাশেই মরুপ্রান্তরে গাড়ির গতি থেমে গেলেও নামার কোন উপায় নেই। গাড়ির বন্ধ দরজা উপরের দিকে। বিভীষীকাময় আর্তনাদ, জনহীন মরুভূমির আকাশ-বাতাশ যেন থমকে দাড়ালো। হঠাৎ চারদিক থেকে আবাবিল পাখির ন্যায় ছুটে এলো রবের সাহায্য। চলতে থাকে গাড়ির সামনের গ্লাস ভেঙে গেট ক্সতরি করার প্রাণপণ চেষ্টা। কিছু ভাইয়ের কেডস পায়ে ছিল। তারা ভিতর থেকে লাত্থি আর বাইরে থেকে আরবীয় ভাইয়েরা পাথর মেরে যৌথ চেষ্টায় সামনের দিকে উপরে নীচে দুটি রাস্তা বের করে। আর সেদিক দিয়েই একে একে সবাই বের হয়।

মরুর বুকচিরে আর্তনাদ আর কান্নার রোল চর্তুদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। পথের পাশে মরুভূমির মধ্যে আহত ব্যক্তিরা অবস্থান নিল। কিউ শুয়ে কেউ বসে চিৎকার আর কান্না। ক্ষত-বিক্ষত রক্তাক্ত চেহারাগুলো বড়ই ভয়ার্তআর অসহায় ছিল। অজানা-অচেনা মরুর বুকে কে কি করবে দিশা নাই। আমাদের সাহায্যের জন্য চারদিকে পথচারিরা জড়ো হয়েছে। নিজ নিজ অবস্থা থেকে সাহায্য করার কি অসাধারণ প্রাণান্তকর চেষ্টা। যেন কত আপনজন। আমি প্রথমে বড় ছেলেটাকে বের করে নিজে বেরিয়ে আসলাম। এতক্ষণে ছোট ছেলে আর ওর বাবার কথা মাথায়ই ছিল না। বের হয়েই ওদের সাথে দেখা। এ যেন কারবালার করুণ দৃশ্য। সবার মধ্যেই বাঁচার আকুতি। আলহামদুলিল্লাহ! আলহামদুলিল্লাহ! আমরা ক্ষত-বিক্ষত দেহ নিয়েও চারজনই বেঁচে আছি। মহান আল্লাহ সুবহানাহু তা’য়ালা যেন বোনাস জীবন দান করলেন। ছোট ছেলেকে দিয়ে সিজদাতুল শোকর দিলাম।

বড় ছেলের বাম হাতের কব্জি থেকে উপর নীচে মাংস রাস্তার ঘর্ষনে ঘর্ষনে একেবারেই শেষ। আর মাথায় ইঞ্জুরী। অ্যারাবিয়ান বোনের টিস্যুর সাহায্যে হাত মাথা পরিষ্কার করে গায়ের গেঞ্জি খুলে শক্ত করে বেঁধে দিলাম। আর ডান হাতে মাথায় টিস্যু চেপে ধরিয়ে দিলাম। রবের অপার কৃপায় ছোট ছেলে সম্পূর্ণ অক্ষত। ওকে বসিয়ে দিলাম ভাইয়ের খেদমতে। এবার ওদের বাবার কাছে গেলাম তার অবস্থা বড়ই নাজুক। পাজরের ৭টি রিবে ফ্রাক্চ্যার।

নড়াচড়া করার অবস্থা নাই, শুধু চিৎকার। সেদিন মরুর বুকে কি বিভীষীকাময় রাতের দেখাই না পেলাম। তাকে সান্ত্বনা দিয়ে চর্তুদিকে ছড়িয়ে থাকা ভাই বোনদের খোঁজ-খবর নিতে ছুটে গেলাম। একেক জনের অবস্থা এতই করুণ ছিল যে, দেখার মতো না। রাব্বে কারীম সবাইকে হেফাযত করেছেন। আরও খারাপ হতে পারতো। আলহামদুলিল্লাহ।

ফিরে এলাম আপনজনের কাছে। এবার আমার পালা। বাম হাতের অবস্থা ভয়াবহ। বাম সাইডে বসায় হাতটা নীচে পড়ে সমস্ত হাতের মাংস ঘর্ষনে ঘর্ষনে রাস্তার পিচে মিশে গেছে। শুধু হাড্ডি আর ছেড়াফাটা মাংস চামড়া ঝুলেছিল। সে এক বিভৎস দৃশ্য। ছোট ছেলে দেখেই চিৎকার- মা, মা তোমার হাত!

আমি তৎক্ষণাৎ হিজাব দিয়ে হাতটা ঢেকে সবার সাহায্যে হাত বাড়াই। খুব অল্প সময়ের মধ্যে ফায়ার সার্ভিস, অ্যাম্বুলেন্স চলে আসে। শুরু হয়ে যায় চিকিৎসা সেবা। আমার সাইড ব্যাগে পাসপোর্ট, প্রয়োজনীয় কাগজ ও টাকা ছিল। সেটা গাড়ির মধ্যেই পড়ে ছিল। একবার গিয়ে খুঁজে আসি কিন্তু পাইনা। কিছুক্ষণ পর অ্যাম্বুলেন্সের দিকে যাওয়ার সময় ব্যাগটি গাড়ির পাশেই পড়ে থাকতে দেখি। হাসপাতালে ভর্তি, চিকিৎসা সবকিছুর জন্যই পাসপোর্টগুলো অতিব জরুরি ছিল।

আমার রব আমাকে কখনও একা ছাড়েননি বা ছেড়ে যাননি। আমার সকল প্রয়োজনে মহামহিম রব আমাকে সঙ্গ দিয়েছেন। দিয়েছেন পথের দিশা। একজন ডা: সবার আগে স্ট্রেচারে করে আমার হাসবেন্ডকে অ্যাম্বুলেন্সে তুলে নিলেন সাথে আমাদেরকেও। আমরা ‘কিং ফাহাদ’ হাসপাতালে ভর্তি হলাম। এখানে আমরা যেন আরেক দুর্যোগের সম্মুখীন হলাম। কেউ কারো ভাষা বুঝিনা। ক্ষুধা, পিপাসা আরো কতো হাসপাতালের বালা। অপরিচিত কেউ একজন বার বার পাসপোর্ট নিজের কব্জায় নেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছিল। তখনও রবের সাহায্য পেলাম।

এভাবেই দিন চলে যায়। আমার আর ছেলের অপারেশন আরো কতো ঝক্কি-ঝামেলাই না সামলাতে হলো। কত শুভাকাক্সিক্ষ আত্মীয়-অনাত্মীয় দেখতে এসে সান্ত্বনার বাণী শুনালেন। অপারেশনে দেরী হওয়াতে কষ্ট হয়েছে অনেক। বাংলাদেশ অ্যাম্বাসী থেকে দেখতে গেলো। আস্তে আস্তে ভাষার সমস্যা দূর হলো। ডাক্তারদের ব্যবহার ছিল অসাধারণ, অমায়িক। যেন তারা আমার পরম আত্মীয়, রবের দেওয়া নিয়ামত!

অপারেশন পরবর্তী ড্রেসিং ছিল বড় বেশি পীড়াদায়ক। সবচেয়ে বেশি কষ্টের দিন ছিল গ্রাফটিংয়ের পিন কাটার দিন। যা কখনও ভুলব না। প্রতিটি পিন কাটার সময় মনে হচ্ছিল আমার আত্মায় ছুরি চালানো হচ্ছে। অবচেতন অবস্থায় কেটে যায় ৪/৫ দিন। রাত-দিনের কোন পার্থক্য টের পাইনি। চেতনা এলে মাঝে মধ্যে ছেলের কাছে জানতে চাই-বাবা, এখন দিন না রাত? কোন নামাযের সময়? আমাকে তায়াম্মুম করে দাও। নামাযের নিয়ত করে কতোবার যে ঘুমিয়ে যেতাম ছেলে বলতো- মামুনি, তুমি ঘুমিয়ে গিয়েছো। আবার তায়াম্মুম করাতো।

আহ্! দিনগুলো কত যে কষ্টের ছিল রব ছাড়া কেউ জানে না। “নিশ্চই কষ্টের সাথেই আছে স্বস্তি”। আয়াতটি আমার রব যেন আমাকেই উদ্দেশ্য করে বলেছেন। আলহামদুলিল্লাহ! ছোটো ছেলেটি সুস্থ ছিল। আমাকে দেখাশোনার সমস্ত দায়িত্ব পালনের জন্যই মহান রব ওকে সুস্থ রেখেছিলেন। যদিও বয়স মাত্র এগারো বছর। তবুও সমস্ত কাজ ওকে দিয়েই করেছেন। কখনও আমার বেপর্দা হতে দেয়নি।

এমনকি কাউকে আমার ছবি পর্যন্ত তুলতে দেয়নি। আংকেল আমার আম্মুর ছবি উঠাবেন না। আম্মু ছবি উঠায় না। একদিন জানতে পারি আমাদের দু’বোন মহান রবের ডাকে সাড়া দিয়ে চলে গেছেন। একজন ঘটনাস্থলেই, আরেকজন চিকিৎসাধীন অবস্থায়। এক বোনের দেহের অর্ধেকটা গাড়ির নিচে, বাকীটুকু ভিতরে থাকায় ছিন্নভিন্ন বিভৎসরূপ ধারণ করেছিল। মহান আল্লাহ তাদের শাহাদাত কবুল করুন আমিন।

রমযান মাস প্রায় শেষের দিকে আমি কিছুটা সুস্থ। আমার মন পাগল প্রায়। মসজিদে নববীর হাতছানি মনের ভিতরটাকে অশান্ত করে তুলেছে। ইতিমধ্যে অনুরোধ করে রোজা রাখতে শুরু করেছি। ডাক্তারের নিষেধ হোটেলে যাওয়া যাবে না জীবাণুর ভয়ে। টিকেট করে একবারে বাংলাদেশ। আমার হাসবেন্ডও তাতেই রাজি। ২৬ শে রমযান দিবাগত রাত আরবে যেন রহমের বসন্ত উৎসব! আমাকে ধরে রাখে সাধ্য কার। এটা রহমানের আহ্বান। আমাকে যেতেই হবে।

ডাক্তার, ড্রেসিং সব কিছু উপেক্ষা করে রবের ডাকে সাড়া দিয়ে বৃষ্টিস্নাত মদিনার স্নিগ্ধ আকাশ বাতাশ, পথ মাড়িয়ে আমি এলাম নবীর রওজা প্রাঙ্গণে। কষ্ট যেন আমার কাছে রহমত হয়ে ধরা দিয়েছিল। ভয়াল এক্সিডেন্টের মাধ্যমেই আল্লাহ সুবহানাহু তা’য়ালা আমাকে শামিল করে নিলেন ২৭ রমযানে মহা আড়ম্বরে সাজানো দোয়ার মজলিসে। আমার জীবনের সেই রাতের মতো আর একটা রাতও আসেনি। জীবনে কানায় কানায় যেন রহমের বারি বর্ষিত হচ্ছিল। সেদিন আমি দেখেছি রহমানুর রাহিম মালিকের কাছে গোলামেরা কিভাবে কাঁন্না বিজরিত আর্তনাদে আকাশবাতাশ প্রকম্পিত করতে পারে। কিভাবে আকণ্ঠ গুনাহের ভারে নিমর্জ্জিত বান্দা রবের কাছে ফরিয়াদ জানায়। মদিনায় এতো মানুষের ঢল আমি কখনো দেখিনি। চারদিকে লোকারন্য কাঁন্নার কেউ যেন আছড়ে পড়ছে আকাশ-বাতাস পেড়িয়ে রবের আরশে। সেদিন বুঝি নববী প্রাঙ্গণে আসমান থেকে নেমে এসেছিল লাখো-কোটি ফেরেশতার দল! আবার যেন এমন ক্ষণ আমার জীবনে বার বার ফিরে আসে। এমন প্রার্থনাই করি রবের কাছে।

সেই রাত, আমাকে করেছে পুলকিত, আলোকিত। আমি যে কোথায় চলে গেলাম নিজেও বুঝতে পারিনি। রবের গুনাহগার এক অধম গোলাম, যেন তাঁরই একান্ত কাছাকাছি। যেন আমি তাঁকে একান্তে পেয়ে মন খুলে বলছি- মনের যত কথামালা! আমার জীবনে রবের রহমত উপভোগ করলাম দূর্ঘটনার মাধ্যমেই। তাই বুঝি সেদিন জ্ঞান ফেরার পরেই বলেছিলাম এটা কে অ্যাক্সিডেন্ট নয় রহমত বলো।

সেদিন মালিক যেন গোলামের চোখের পানির জোয়ারে পাপরাশি ধুয়েমুছে নিষ্পাপ করে দিলেন। আহ্! কি প্রশান্তি এক সময় উদ্বেলিত কাঁন্নার ঢেউ থেমে গেল। শরীর অসুস্থ হলেও প্রশান্ত হলো আত্মা। রব আমাকে উপহার দিলেন এক নব জীবন। আমি যেন অতীতের সকল পাপ থেকে মুক্ত হয়ে নব উদ্যোমে পথচলার বাইয়াত নিলাম। আলহামদুলিল্লাহ! রবের নিয়ামত স্বরূপ স্বপরিবারে ‘বোনাস জীবন’ উপভোগের সুযোগ পেলাম। ঈদের আগের দিন ফিরে এলাম নিজের দেশে, আপন ভূবনে।

কিন্তু আজও আমার মন আটকে আছে কালো গিলাফে ঢাকা কাবার আঙিনায়। আর সবুজ গম্বুজের চত্ত্বরে মায়াবী প্রিয় মানুষের ভালোবাসায়! আমি বার বার ফিরে যেতে চাই আপনালয়ে! আল্লাহ সুবহানাহু তা’য়ালা কবুল করুন আমিন।