১. সার্বভৌমত্ব, সীমান্ত নিরাপত্তা ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা
১.১ সীমান্ত নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা
বাংলাদেশের তিন দিক সীমান্তঘেরা এবং ভৌগোলিকভাবে সংবেদনশীল। সীমান্ত অঞ্চলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু আইন-শৃঙ্খলার বিষয় নয়, বরং রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষার মূল শর্ত।
প্রস্তাবনা:
ক) সীমান্তে সমন্বিত নজরদারি ব্যবস্থাকে আধুনিক প্রযুক্তি দ্বারা শক্তিশালী করা (স্মার্ট সেন্সর, ক্যামেরা, ড্রোন)।
খ) মানবপাচার, মাদক চোরাচালান ও অস্ত্র পাচার বন্ধে জিরো-টলারেন্স নীতি।
গ) সীমান্তবর্তী জনগোষ্ঠীর সামাজিক-অর্থনৈতিক উন্নয়ন, যেন তারা অবৈধ ও দেশের স্বার্থ বিরোধী কার্যক্রমে অনুপ্রাণিত না হয়।
ঘ) সীমান্ত চৌকি ও টহল ব্যবস্থাকে আবহাওয়া-উপযোগী করে অবকাঠামো উন্নয়ন।
১.২ আকাশসীমা রক্ষা
ক) উন্নত রাডার সিস্টেম, স্যাটেলাইট মনিটরিং এবং আকাশ নজরদারি ব্যবস্থা সম্প্রসারণ।
খ) ড্রোন শনাক্তকরণ ও ড্রোন-বিরোধী প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি বৃদ্ধির উদ্যোগ।
২. আধুনিক, সক্ষম ও পেশাদার সশস্ত্র বাহিনী গঠন
২.১ দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা
ক) “Forces Goal 2030”-এর মতো ধারাবাহিক ও বাস্তবসম্মত দীর্ঘমেয়াদি আধুনিকায়ন পরিকল্পনা বজায় রাখা।
খ) সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর নিজস্ব গবেষণা ও উন্নয়ন ক্ষমতা বাড়ানো।
২.২ স্বনির্ভর প্রতিরক্ষা শিল্প
ক) আধাসামরিক, নিরাপত্তা ও সামরিক সরঞ্জাম দেশেই উৎপাদনের লক্ষ্যে গবেষণা ও বিনিয়োগ।
খ) ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিতে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব উৎসাহিত করা।
গ) সামরিক প্রযুক্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্প সহযোগিতা বৃদ্ধি।
২.৩ মানবসম্পদ উন্নয়ন
ক) সামরিক সদস্যদের জন্য আধুনিক প্রশিক্ষণ, আন্তর্জাতিক কোর্স, কৌশলগত শিক্ষা (war-gaming, simulation)।
খ) পেশাদারিত্ব বৃদ্ধি, পদোন্নতিতে স্বচ্ছ প্রক্রিয়া, দক্ষতা-ভিত্তিক মূল্যায়ন ব্যবস্থার উন্নতি।
৩. সাইবার প্রতিরক্ষা ও তথ্য-নিরাপত্তা
৩.১ জাতীয় সাইবার প্রতিরক্ষা কাঠামো
ডিজিটাল অবকাঠামো বাড়ার সাথে সাথে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তায় সাইবার ঝুঁকি অন্যতম প্রধান হুমকি।
প্রস্তাবনা:
ক) একটি সমন্বিত “জাতীয় সাইবার কমান্ড” প্রতিষ্ঠা।
খ) ব্যাংকিং, টেলিকম, বিদ্যুৎ, বিমানবন্দর ও বন্দরসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে পুনবৎ-cyber-critical হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
৩.২ ভুয়া তথ্য ও বিভ্রান্তি মোকাবিলা
ক) fact-checking ও ডিজিটাল হুমকি-মনিটরিং ইউনিট।
খ) গণতান্ত্রিক তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিত রেখে বিভ্রান্তি-রোধে প্রযুক্তি ও জনসচেতনতা বৃদ্ধি।
৪. বঙ্গোপসাগর, নৌ-নিরাপত্তা ও নীল অর্থনীতি
৪.১ নৌবাহিনীর সম্প্রসারণ
ক) সাবমেরিন, ফ্রিগেট ও অফশোর প্যাট্রোল ভেসেলের সংখ্যা বৃদ্ধি।
খ) সমুদ্র নজরদারির জন্য স্যাটেলাইট ও সমুদ্র রাডার ব্যবস্থার উন্নতি।
৪.২ নীল অর্থনীতির নিরাপত্তা
ক) সমুদ্রের মাছ, গ্যাস, খনিজ সম্পদ ও জ্বালানি ব্লক রক্ষায় বিশেষ সমুদ্র নিরাপত্তা নীতি।
খ) সমুদ্রবন্দর, গভীর সমুদ্রবন্দর ও শিপিং রুটের নিরাপত্তা জোরদার।
৪.৩ কোস্টগার্ডের আধুনিকায়ন
ক) ঘূর্ণিঝড়, জাহাজ দুর্ঘটনা ও সমুদ্রদুর্যোগে দ্রুত উদ্ধার সক্ষমতা।
খ) উপকূলবর্তী জেলেদের নিরাপত্তায় প্রশিক্ষণ, রেডিও-কমিউনিকেশনসহ জরুরি সহায়তা ব্যবস্থা।
৫. আঞ্চলিক সহযোগিতা, সামরিক কূটনীতি ও বহুপাক্ষিক অংশগ্রহণ
৫.১ আঞ্চলিক শান্তি ও সহযোগিতা
ক) SAARC, BIMSTEC, IORA, CSC, UN Peacekeeping সহ আঞ্চলিক/বহুপাক্ষিক প্ল্যাটফর্মে নিরাপত্তা সংলাপ।
খ) সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও মানবিক সহায়তায় যৌথ মহড়া বৃদ্ধি।
৫.২ সামরিক কূটনীতি
ক) Officers' exchange, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তি বিনিময়।
খ) আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা প্রদর্শনী, সামরিক উদ্ভাবন সহযোগিতা।
৬. দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও মানবিক সহায়তা (HADR)
বাংলাদেশ একটি দুর্যোগপ্রবণ দেশ। সশস্ত্র বাহিনী সবসময় দুর্যোগে প্রথম সাড়া প্রদানকারী হিসেবে কাজ করে।
প্রস্তাবনা:
ক) বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, ভূমিকম্প, অগ্নিকাণ্ড ও ভূমিধস মোকাবিলায় বিশেষ সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ ইউনিট গঠন।
খ) দ্রুত উদ্ধার কার্যক্রমের জন্য হেলিকপ্টার, নৌযান, অ্যাম্ফিবিয়াস যান ও আধুনিক সরঞ্জাম।
গ) সকল জেলার জন্য দুর্যোগ-প্রস্তুতি উপযোগী সিভিল-ডিফেন্স শিক্ষা-প্রোগ্রাম।
৭. প্রতিরক্ষা বাজেটে স্বচ্ছতা, গবেষণা ও জবাবদিহিতা
৭.১ স্বচ্ছ বাজেট ব্যবস্থাপনা
ক) প্রতিরক্ষা ব্যয়ের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, অডিট ও মূল্যায়নে স্বচ্ছতা।
খ) আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ক্রয় ও দরপত্র পদ্ধতি উন্নয়ন।
৭.২ গবেষণা ও নীতি মূল্যায়ন
ক) স্বাধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও থিঙ্ক-ট্যাঙ্কের মাধ্যমে প্রতিরক্ষা নীতি বিশ্লেষণ উৎসাহিত করা।
খ) নতুন প্রযুক্তি ও অস্ত্র কেনার আগে প্রয়োজনীয়তা যাচাই (needs assessment)।
৮. জনসম্পৃক্ততা, নাগরিক সচেতনতা ও যুবসমাজ
৮.১ সিভিল ডিফেন্স ও জাতীয় প্রস্তুতি
ক) স্কুল–কলেজে নাগরিক সুরক্ষা, দুর্যোগ প্রস্তুতি ও প্রাথমিক চিকিৎসা প্রশিক্ষণ।
খ) আগুন, ভূমিকম্প বা সাইবার জরুরি পরিস্থিতিতে জনগণের প্রতিক্রিয়া-ক্ষমতা বাড়ানো।
৮.২ তরুণদের সম্পৃক্ততা
ক) স্কাউটিং, ক্যাডেট প্রোগ্রাম, ন্যাশনাল রিজার্ভিস্ট প্রোগ্রাম।
খ) সামরিক ক্যারিয়ার পরিকল্পনা ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিরক্ষা গবেষণা উৎসাহিত করা।
৯. প্রযুক্তি, উদ্ভাবন, এবং ভবিষ্যতের যুদ্ধক্ষেত্রের প্রস্তুতি
৯.১ উদ্ভাবনে বিনিয়োগ
ক) ড্রোন, সাইবার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ((AI), রোবটিক্স ও স্যাটেলাইট প্রযুক্তিতে গবেষণা।
খ) সামরিক উদ্ভাবন কেন্দ্র, বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ল্যাব।
৯.২ ইনফরমেশন ওয়ারফেয়ার মোকাবিলা
ক) সাইবার-মনস্তাত্ত্বিক ((cyber-psycho-logical) হামলার ঝুঁকি মোকাবিলায় সক্ষমতা বৃদ্ধি।
খ) সামাজিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় ডিজিটাল নিরাপত্তা শিক্ষার প্রসার।
আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো: নিরাপদ, আধুনিক ও দায়িত্বশীল বাংলাদেশ।
এই নীতি কাঠামোর লক্ষ্য: ১. নিরাপদ সীমানা, ২. আধুনিক সশস্ত্র বাহিনী, ৩. শক্তিশালী সাইবার প্রতিরক্ষা, ৪. সমুদ্র সম্পদের সুরক্ষা, ৫. আঞ্চলিক শান্তি ও সহযোগিতা, ৬. দুর্যোগে দ্রুত সহায়তা এবং ৭. স্বচ্ছতা ও জনসম্পৃক্ততা। সব মিলিয়ে- একটি কৌশলগতভাবে আত্মবিশ্বাসী, নিরাপদ ও ভবিষ্যৎ-প্রস্তুত বাংলাদেশ।