মারজিয়া সাদিয়া
ইতিহাসের বিশাল প্রান্তরে কিছু নাম চিরকাল দীপ্ত নক্ষত্রের মতো জ্বলতে থাকে। সময়, স্থান কিংবা প্রজন্ম কোনো কিছুই যাদের কীর্তিকে ম্লান করতে পারে না। যারা যুগ-যুগান্তরে অনুপ্রেরণা হয়ে থাকেন তেজোদ্দীপ্ত মুক্তিকামী মানুষের জন্য। তেমনই এক অমর নাম খালিদ বিন ওয়ালিদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) । ইসলামের মহাবীর, রণকৌশলের অতুলনীয় শিল্পী, আল্লাহর পথে নিবেদিত এক অমিত সাহসী আত্মা। তাঁর তলোয়ারের ঝলকানি যেমন অন্ধকার ভেদ করে সত্যের আলোর দিশা দিয়েছে, তেমনি তাঁর ঈমানের দীপ্তি আজও ইতিহাসের বুকজুড়ে সগৌরবে প্রজ্বলিত।
খালিদ (রাঃ) জন্মগ্রহণ করেন মক্কার বিখ্যাত কুরাইশ বংশে, এক প্রভাবশালী ও সম্মানিত পরিবারে। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন দৃঢ়চিত্ত, উচ্চাভিলাষী ও প্রখর বুদ্ধিসম্পন্ন। যুদ্ধশিক্ষা, অশ্বারোহণ, তীরন্দাজি ও তরবারি চালনায় তিনি ছিলেন অনন্য। তাঁর বীরত্ব, শৃঙ্খলা ও কৌশল তাঁকে অল্প বয়সেই এক ভয়ংকর যোদ্ধায় পরিণত করেছিল। কিন্তু তখনও তাঁর অন্তর আল্লাহর পথে জাগ্রত হয়নি। উহুদের যুদ্ধে তিনি মুসলমানদের শত্রু হয়ে যুদ্ধ করেছিলেন, এবং তীক্ষè কৌশলে মুসলিম বাহিনীকে বিপর্যস্ত করেছিলেন। অথচ সেই যুদ্ধই পরবর্তীকালে তাঁর হৃদয়ে প্রশ্ন জাগিয়ে তোেেলা “সত্যের পথে কে, আর বিভ্রান্তির পথে কে?” চোখের সামনে মহাবীর হামজা (রাঃ) এর প্রাণহীন লাশের সাথে করা কাফেরদের সীমাহীন নির্মমতা খালিদের অন্তরে ভীষণ দাগ কাটে।
অবশেষে হুদাইবিয়ার সন্ধির পর যখন তিনি ইসলামের মহত্ত্ব ও নবীজির সা.চরিত্রের মহিমা প্রত্যক্ষ করেন, তখন তাঁর অন্তরে সত্যের আলো জ্বলে ওঠে। তিনি সমস্ত অহংকার, গর্ব ও কুসংস্কার ত্যাগ করে মদিনায় উপস্থিত হন এবং রাসূলুল্লাহ সা.-এর হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন। নবীজি সা. তাঁকে সাদরে গ্রহণ করে বলেছিলেন, “আমি জানতাম, খালিদের মতো মেধাবী ও বুদ্ধিমান মানুষ চিরকাল অজ্ঞতার অন্ধকারে থাকতে পারে না।” সেই দিন থেকে তাঁর জীবন সম্পূর্ণ বদলে যায়। তলোয়ারের ধার আর ব্যক্তিগত গর্বের জন্য নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য উৎসর্গিত হয়।
মুতার যুদ্ধ ছিল তাঁর জীবনের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। মাত্র তিন হাজার মুসলিম সৈন্যের বিপরীতে দাঁড়িয়েছিল দুই লক্ষাধিক রোমান বাহিনী। রাসূলুল্লাহ সা.-এর দত্তকপুত্র যায়েদ ইবন হারিসা (রাঃ) ছিলেন এই অভিযানের প্রথম সেনাপতি। তিনি অসীম সাহসিকতা ও ঈমানী দৃঢ়তার সঙ্গে যুদ্ধ করে শাহাদাত বরণ করেন। তারপর সেনাপতির দায়িত্ব পান জাফর ইবন আবি তালিব (রাঃ)। তিনি ছিলেন আলি (রাঃ)-এর বড় ভাই এবং রাসূলুল্লাহ সা.-এর প্রিয় চাচাতো ভাই। তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে অসাধারণ বীরত্ব প্রদর্শন করেন। যখন তাঁর ডান হাত কাটা পড়ে, তখন তিনি বাম হাতে পতাকা ধরেন; সেটিও কাটা গেলে তিনি বুকের সঙ্গে পতাকাটি চেপে ধরেন। শেষ পর্যন্ত তিনি শহিদ হন। নবী সা. বলেছিলেন, “আল্লাহ তাঁকে জান্নাতে দুটি ডানা দিয়েছেন।” জাফর (রাঃ) এর শাহাদাতের পরে মদিনার একজন সাহসী কবি ও যোদ্ধা আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা (রাঃ) যখন সেনাপতি হন, তখন কুরআনের আয়াত পড়ে নিজেকে দৃঢ় করেন এবং অদম্য বিশ্বাস নিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যান যতক্ষণ না শহিদ হন।
একে একে তিনজন মুসলিম সেনাপতি শাহাদতবরণ করলে পতাকা আসে খালিদ (রাঃ)-এর হাতে। তিনি আশ্চর্য কৌশলে বাহিনী পুনর্গঠন করেন, যুদ্ধের কৌশল বদলান, এবং এক দুঃসাহসী পরিকল্পনায় শত্রুকে বিভ্রান্ত করে মুসলমানদের সম্মানজনক প্রত্যাবর্তনের ব্যবস্থা করেন।
রাসূলুল্লাহ সা. দূর থেকে ওহির মাধ্যমে এই দৃশ্য অবলোকন করে ঘোষণা দেন, “যায়েদ পতাকা বহন করলেন, শহিদ হলেন; তারপর জাফর ধরলেন, তিনিও শহিদ হলেন; তারপর ইবন রাওয়াহা ধরলেন, তিনিও শহিদ হলেন; অবশেষে আল্লাহর তরবারি (খালিদ বিন ওয়ালিদ) পতাকা তুলে নিলেন এবং আল্লাহ তাঁকে বিজয় দিলেন।” (সহিহ বুখারি)
এই নামেই তিনি ইতিহাসে অমর হয়ে থাকেন। আল্লাহর তরবারি, যার ধার কখনো ম্লান হয়নি।
নবীজির ইন্তিকালের পর যখন মিথ্যা নবী মুসাইলামা কাজ্জাব ইসলামের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে, তখন ইয়ামামার যুদ্ধে খালিদ (রাঃ) ছিলেন সেনাপতি। যুদ্ধক্ষেত্রে মুসলিম বাহিনী যখন দুর্বল হয়ে পড়েছিল, তখন তাঁর দৃপ্ত কণ্ঠে বজ্রনিনাদ শোনা যায়Ñ “আজ ইসলামের পতাকা নত হবে না!” তাঁর সাহস ও দৃঢ় নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী পুনরুজ্জীবিত হয় এবং শেষ পর্যন্ত মুসাইলামা নিহত হয়। পরবর্তীতে ইয়ামুক, হিরা, কাদিসিয়া ও দামেস্কের যুদ্ধে তাঁর কৌশল ও বীরত্ব বিশ্বকে বিস্মিত করে। তিনি শত্রুর বিরুদ্ধে যেমন নির্ভীক ছিলেন, তেমনি পরাজিতদের প্রতি ছিলেন করুণাময় ও মানবিক।
খালিদ (রাঃ)-এর চরিত্রে মিলে ছিল বিরল সমন্বয়। বীরত্বের সঙ্গে বিনয়, শক্তির সঙ্গে নম্রতা, আর বিজয়ের সঙ্গে কৃতজ্ঞতা। অসংখ্য যুদ্ধজয়ের পরও তাঁর হৃদয়ে কখনো গর্বের ছায়া পড়েনি। একবার খলিফা উমর (রাঃ) প্রশাসনিক কারণে তাঁকে সেনাপতির পদ থেকে অব্যাহতি দেন। কিন্তু তিনি কোনো অভিযোগ না করে নবীন সেনাপতির অধীনে সাধারণ সৈনিক হিসেবে যুদ্ধ চালিয়ে যান। তিনি বলেন, “আমি আল্লাহর জন্য যুদ্ধ করি, কোনো মানুষের সন্তুষ্টির জন্য নয়।” এই একটি বাক্যই তাঁর ঈমান, আনুগত্য ও আত্মসমর্পণের গভীরতার সাক্ষ্য বহন করে।
জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এই মহান যোদ্ধা একদিন বলেছিলেন, “আমার শরীরে এমন কোনো স্থান নেই যেখানে তলোয়ার, তীর বা বর্শার আঘাত লাগেনি; তবুও আমি বিছানায় মৃত্যুবরণ করছি! আহা, যদি আমি শাহাদত লাভ করতে পারতাম!” তাঁর এই উক্তি যেন মানব ইতিহাসে এক চিরন্তন বাণী হয়ে বাজেÑ বীরেরা মৃত্যুকে ভয় পায় না, বরং মৃত্যুকেও তারা বরণ করে নেয় আল্লাহর সন্তুষ্টির প্রত্যাশায়।
২১ হিজরিতে (৬৪২ খ্রিষ্টাব্দে) যখন তিনি ইন্তিকাল করেন, তখন মুসলিম উম্মাহ শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়ে। খলিফা উমর (রাঃ) কেঁদে বলেছিলেন, “নারীরা আর কখনো খালিদের মতো সন্তান জন্ম দেবে না।”
খালিদ বিন ওয়ালিদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর জীবন ছিল এক অবিনশ্বর কবিতা যেখানে প্রতিটি শব্দে সাহস, প্রতিটি ছন্দে ঈমান, আর প্রতিটি শ্বাসে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা। তিনি ছিলেন এমন এক যোদ্ধা, যিনি বিজয়ের উল্লাসে নয়, শাহাদতের আকাক্সক্ষায় বাঁচতেন। তাঁর নাম উচ্চারিত হলেই যেন শোনা যায় সেই পবিত্র ধ্বনি “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ!”
আজকের মুসলমানদের জন্য তাঁর জীবন এক আলোকবর্তিকা। তাঁর থেকে আমরা শিখি সত্যের পথে অটল থাকতে হয়, ত্যাগে ভয় পাওয়া যায় না, আর আল্লাহর পথে একাগ্রতা-ই মানুষের প্রকৃত মহত্ত্ব। খালিদ বিন ওয়ালিদ (রাঃ) তাই শুধু ইতিহাসের বীর নন, তিনি ঈমানের প্রতীক, আত্মত্যাগের প্রতিমূর্তি এবং চিরকালীন অনুপ্রেরণার উৎস।