বিনোদন ও সংস্কৃতি একটি জাতির আত্মপরিচয় ও মানসিক বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। মানুষের চিন্তাধারা, মূল্যবোধ, সামাজিক আচরণ ও জীবনবোধ গঠনে বিনোদন ও সংস্কৃতির ভূমিকা অপরিসীম। বাংলাদেশের মতো একটি সমৃদ্ধ ইতিহাস ও ঐতিহ্যের দেশে বিনোদন ও সংস্কৃতি কেবল আনন্দের মাধ্যম নয়, বরং জাতীয় চেতনা ও সামাজিক বন্ধনের ভিত্তি। তবে বর্তমান সময়ে এই অঙ্গনে কিছু ইতিবাচক দিকের পাশাপাশি নানা নেতিবাচক প্রবণতাও লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
বাংলাদেশের বিনোদন অঙ্গনের মধ্যে টেলিভিশন নাটক (মঞ্চ বা টিভি নাটক, সিরিয়াল ও টেলিফিল্ম), চলচ্চিত্র, সংগীত(বাউল, ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, আধুনিক গান ও ব্যান্ডসংগীত), ডিজিটাল মাধ্যম (ইউটিউব, ফেসবুক, ওটিটি প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ওয়েব সিরিজ ও অনলাইন কনটেন্ট) নৃত্য এবং খেলাধুলা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। টিভি নাটক ও চলচ্চিত্র দীর্ঘদিন ধরে মানুষের প্রধান বিনোদনের উৎস। লোকসংগীত, আধুনিক গান ও ব্যান্ডসংগীত আমাদের সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে। পহেলা বৈশাখ, নবান্ন উৎসব, পিঠা উৎসব, ঈদ ও দুর্গাপূজার মতো সামাজিক ও ধর্মীয় উৎসবগুলো বাংলাদেশের বহুমাত্রিক সংস্কৃতির পরিচায়ক। এছাড়া বাংলা ভাষা ও সাহিত্য, মঞ্চনাটক ও লোকনৃত্য আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সামগ্রিক প্রভাব: নেতিবাচক দিকসমূহ
সাম্প্রতিক সময়ে বিনোদন ও সংস্কৃতি অঙ্গনে কিছু উদ্বেগজনক নেতিবাচক দিক সামনে আসছে। অশ্লীলতা ও অতিরিক্ত বাণিজ্যিকীকরণ অনেক কনটেন্টের মান নষ্ট করছে। সহজ জনপ্রিয়তা ও ভিউয়ের আশায় অনেক নির্মাতা সামাজিক ও পারিবারিক মূল্যবোধ উপেক্ষা করছেন। কিছু নাটক, চলচ্চিত্র ও অনলাইন কনটেন্টে অপ্রয়োজনীয় অশ্লীলতা ও নিম্নমানের উপস্থাপনা বাড়ছে। বিনোদনের নামে এমন কনটেন্ট প্রচার হচ্ছে যা পরিবার ও সমাজের নৈতিক মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
নিজস্ব সংস্কৃতির পরিবর্তে বিদেশি পোশাক, ভাষা ও জীবনধারা অযাচিতভাবে অনুকরণ করা হচ্ছে। বিদেশি সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণে নিজস্ব ঐতিহ্য ও লোকজ সংস্কৃতি ক্রমেই উপেক্ষিত হয়ে পড়ছে। ইউটিউব, ফেসবুক ও ওটিটি প্ল্যাটফর্মে মানহীন ও বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট সহজলভ্য হয়ে উঠেছে। সহজ জনপ্রিয়তা ও ভিউয়ের জন্য গুণগত মানের চেয়ে হালকা কনটেন্টে ঝোঁক বাড়ছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে এসব নিয়ন্ত্রণহীন কনটেন্ট শিশু ও তরুণ সমাজকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করছে। পাশাপাশি কিছু সেলিব্রিটির দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ তরুণদের জন্য ভুল রোল মডেল তৈরি করছে। সাইবার বুলিং, ট্রলিং ও অপসংস্কৃতিও বিনোদনের একটি অনাকাক্সিক্ষত অংশ হয়ে উঠছে।
ইতিবাচক দিকসমূহ
নানা সংকট ও নেতিবাচক প্রবণতা থাকা সত্ত্বেও বর্তমান বাংলাদেশের বিনোদন ও সংস্কৃতি অঙ্গনে কিছু আশাব্যঞ্জক পরিবর্তন ও ইতিবাচক দিক পরিলক্ষিত হচ্ছে। যেমন - ইউটিউব, ওটিটি ও সোশ্যাল মিডিয়ায় নতুন প্রতিভা প্রকাশের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তরুণ নির্মাতা, সংগীতশিল্পী ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের সৃজনশীলতা বৃদ্ধি পেয়েছে। বাউল, ভাটিয়ালি, জারি-সারি গান ও গ্রামীণ ঐতিহ্য নতুনভাবে উপস্থাপিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক উৎসব ও অনলাইন মাধ্যমে বাংলা সংস্কৃতি বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ছে। মাদক, নারী নির্যাতন, সামাজিক বৈষম্য ইত্যাদি বিষয় নিয়ে সচেতনতামূলক কাজ বাড়ছে। এই ইতিবাচক দিকগুলো ভবিষ্যতে একটি সুস্থ, রুচিশীল ও ঐতিহ্যনির্ভর সাংস্কৃতিক পরিবেশ গড়ে তোলার সম্ভাবনা সৃষ্টি করছে।
সমাধান কোন পথে
বিনোদন ও সংস্কৃতি মানুষের মানসিক বিকাশ, সামাজিক বন্ধন ও জাতীয় পরিচয় গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশ্বায়নের প্রভাবে আধুনিক ও বিদেশি সংস্কৃতির প্রভাব বাড়লেও নিজস্ব সংস্কৃতি সংরক্ষণ জরুরি। নেতিবাচক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কার্যকর ও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রথমত, নৈতিকতা ও সামাজিক মূল্যবোধভিত্তিক কনটেন্ট নির্মাণে গুরুত্ব দিতে হবে। নাটক, চলচ্চিত্র ও ডিজিটাল কনটেন্টে সামাজিক শালীনতা ও মূল্যবোধ বজায় রাখতে হবে। রাষ্ট্রীয় সেন্সর বোর্ড ও সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করা জরুরি। লোকজ ও ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতা বাড়িয়ে লোকসংগীত, মঞ্চনাটক, পালাগান ও গ্রামীণ উৎসবকে সরকারি ও বেসরকারিভাবে উৎসাহ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দিয়ে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। শিক্ষা ব্যবস্থায় সংস্কৃতিচর্চা ও নৈতিক শিক্ষার গুরুত্ব বাড়ালে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সচেতন ও রুচিশীল সংস্কৃতিবান দর্শক হিসেবে গড়ে উঠবে। পাশাপাশি ডিজিটাল কনটেন্টের জন্য সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন প্রয়োজন। ইউটিউব, ওটিটি ও সামাজিক মাধ্যমে মানহীন ও ক্ষতিকর কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণে থাকতে হবে সুস্পষ্ট নীতিমালা। গুণগত মানের কাজের জন্য শিল্পীদের প্রণোদনা ও স্বীকৃতি দেওয়া হলে সৃজনশীলতা উৎসাহিত হবে।
পরিশেষে বলা যায়, সুস্থ বিনোদন ও সমৃদ্ধ সংস্কৃতি ছাড়া একটি জাতির টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। বিনোদন ও সংস্কৃতিকে যদি দায়িত্বশীলভাবে পরিচালনা করা যায়, তবে তা সমাজ গঠনের শক্তিশালী হাতিয়ার হতে পারে। এজন্য রাষ্ট্র, শিল্পী, গণমাধ্যম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ মানুষÑসবার সম্মিলিত সচেতন উদ্যোগ অপরিহার্য। প্রয়োজন ইতিবাচক রোল মডেল উপস্থাপন (শিল্পী ও সেলিব্রিটিদের সামাজিক দায়িত্ববোধ জাগ্রত করা)। গুণগত মানের কনটেন্টে প্রণোদনা দান (মানসম্মত ও সৃজনশীল কাজের জন্য পুরস্কার ও আর্থিক সহায়তা)। পরিবারকেন্দ্রিক বিনোদন উৎসাহিত করা (পারিবারিক নাটক, চলচ্চিত্র ও অনুষ্ঠান নির্মাণে গুরুত্ব দেওয়া)। স্থানীয় পর্যায়ে সাংস্কৃতিক সংগঠন ও ক্লাবগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করা। সুস্থ বিনোদন ও সমৃদ্ধ সংস্কৃতি গড়ে তুলতে রাষ্ট্র, সমাজ, শিল্পী এবং দর্শকÑসবার সম্মিলিত দায়িত্বশীল ভূমিকা অপরিহার্য।