পত্রিকা মানেই পাঠকের চাহিদা পূরণ করা। তার মনের খোরাক দেওয়া পাঠকের জানার আগ্রহকে প্রাধান্য দিয়ে খবর, ফিচার ও সম্পাদকীয়সহ অন্যান্য মতামত পরিবেশন করা। পাঠকবিহীন পত্রিকা কল্পনা করা যায় না। গত ৩০ বছর সময়কালকে বিশ্লেষণ করলেও দেখা যাবে, অল্প কিছুদিনের ব্যবধানে অনেক জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকা পত্রিকার পাঠক সংখ্যা তলানিতে নেমে গেছে। দুই একটা অবশ্য ব্যতিক্রম। এক্ষেত্রে অনেককে তাদের পলিসি থেকে সরে যেতে দেখা গেছে অথবা বড় রকমের পরিবর্তন আনার ঘটনাও কম না। কিন্তু দৈনিক সংগ্রাম বিগত ৫০ বছরেও সত্য ও ন্যায়ের পলিসি থেকে সরে যায়নি। পাঠক থেকে আলাদা হয়ে যায়নি। পাঠকও দৈনিক সংগ্রামকে ছেড়ে যায়নি। আগলে রেখেছেন সন্তানের মতো।
বলা হয়ে থাকে, সময়ের ব্যবধানে পত্রিকার পাঠক পরিবর্তন হয়। কিন্তু দৈনিক সংগ্রামের ক্ষেত্রে বিষয়টা কতটুকু প্রযোজ্য, তা বলার অপেক্ষা রাখে। দৈনিক সংগ্রাম প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে যেমন সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে লিখতে গিয়ে কোনোদিন কোন চাপের মুখে মাথা নত করেনি এবং লক্ষ্যচ্যুত হয়নি; তেমনি দৈনিক সংগ্রামের পাঠককেও সময়ের পরিবর্তনে তাদের পত্রিকা পরবর্তন করতে হয়নি। এই অর্ধ-শতাধিক বছর ধরে দৈনিক সংগ্রামের ওপর যেমন চাপ এবং হামলা মামলা হয়েছে তেমনি পাঠকেরও ওপর দিয়েও গেছে নানান রকমের অত্যাচার নির্যাতন। কিন্তু তাতেও দমে যায়নি কেউ। স্ব-স্ব আসনে অটল থেকেছেন।
আমার জানা মতে, বহু সংখ্যক পাঠক আছে প্রকাশনার শুরু থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত দৈনিক সংগ্রামের গ্রাহক। কয়দিন আগে দৈনিক সংগ্রামের প্রকাশনার ৫১ বছর পূর্তির দিনে একজন পাঠক বলে গেলেন তিনি ক্লাস ফাইভের বৃত্তিপ্রাপ্তির টাকা দিয়ে দৈনিক সংগ্রাম কিনে পড়া শুরু করেছেন। আজও তিনি দৈনিক সংগ্রাম পড়ছেন। এর কারণ একটাই।
এতদিন ধারাবাহিকভাবে দৈনিক সংগ্রাম তার মনের খোরাক দিয়েই গেছে। দৈনিক সংগ্রাম যেমন তার লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়নি, সেকারণেই পাঠকও দৈনিক সংগ্রামকে ছেড়ে যাননি। দৈনিক সংগ্রামের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে কত রকমের ঝড়ঝঞ্জা গেছে। পাঠক সমাজ এসব ঝড়ঝঞ্জাকে থোরাই তোয়াক্কা করেছেন।
ফ্যাসিস্ট হাসিনার শাসনামলে দৈনিক সংগ্রাম বহন করার কারণে আক্রমণের শিকার হয়েছেন অনেকেই। জামায়াত শিবির ট্যাগ দিয়ে গ্রেফতারের খবরও পাওয়া গেছে অনেক। এমনো হয়েছে দেওয়ালে সাঁটানো পত্রিকা পড়ার কারণে আইন-শৃঙ্খলাবাহিনী তুলে নিয়ে অত্যাচার নির্যাতন এবং মামলা দিয়ে জেলে প্রেরণ করা হয়েছে। সেই মামলা টানতে হয়েছে অনেকদিন পর্যন্ত। গ্রেফতার অত্যাচার নির্যাতনের পরও দৈনিক সংগ্রামের পাঠক পরিবর্তন হয়নি। পাঠকের অন্তর থেকে দৈনিক সংগ্রামের প্রতি ভালবাসা কমাতে পারেনি। বরং দৈনিক সংগ্রামের প্রতি টান আরও বেড়ে গেছে। এমনো কথা জানা গেছে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা ঘুম থেকে জেগে সবার আগে দৈনিক সংগ্রামে সবার আগে চোখ বুলাতেন। একদিন দৈনিক সংগ্রাম টেবিলেরও ওপর না পেয়ে নাকি তার স্টাফদের সাথে ভীষণ রাগারাগি করেছিলেন। স্বাভাবিক কারণেই পাঠক হিসেবে তার প্রয়োজনীয় খবর বা ফ্যাসিজম টিকিয়ে রাখতেই দৈনিক সংগ্রাম থেকে তথ্য সংগ্রহ করে প্রয়োজনীয় কৌশল অবলম্বন করতেন। বলা যায় পাঠক হিসেবে দৈনিক সংগ্রামের প্রয়োজনীয়তা হয়তো ছিল তার কাছে। শেখ হাসিনা যে দৈনিক সংগ্রামের ভাল পাঠক ছিলেন তা জানা যায় আরেকটি ঘটনা থেকে। ফ্যাসিস্ট হাসিনার শাসনামলে একদিন দৈনিক সংগ্রামসহ একবিট পিয়নকে আটক করে পুলিশ। তখন পিয়ন পুলিশকে তিনি বলেছিলেন যে আমি কোনোদিন দৈনিক সংগ্রাম বহন করবো না; আপনারা গণভবনে দৈনিক সংগ্রাম আসা বন্ধ করে দেন। একথা বলার সাথে সাথে পুলিশ তা ছেড়ে দিয়ে বলে আপনি আপনার ডিউটি করেন।
জানা মতে ফ্যাসিস্ট আমলে ময়মনসিংহ জেলার গফরগাঁও উপজেলায় তৎকালীন এমপি দৈনিক সংগ্রাম বিক্রি এবং পড়া নিষিদ্ধ করেছিল। কিন্তু দৈনিক সংগ্রামের পাঠক সেই নিষেধাজ্ঞাকে থোরাই তোয়াক্কা করেছেন। তারা ময়মনসিংহ থেকে পত্রিকা সংগ্রহ না করে গাজীপুর থেকে পত্রিকা সংগ্রহ করে নিজেরা পড়েছেন, অন্যদের পড়তে দিয়েছেন। খবর নিয়ে জানতে পারি, সেই সময়ে একটি ইউনিয়নে যে পরিমাণ দৈনিক সংগ্রাম কেনা হতো। তা ছিল অনেক শীর্ষস্থানীয় দৈনিকের চেয়ে বেশি। রাজধানীর উত্তরা এলাকায় একজন নারী পাঠককে চিনি যার বয়স প্রায় ৮০ বছর। ওনার সাথে আমার দেখা হয় ওনার ছেলের সাথে পরিচয় হওয়ার সুবাধে। তিনি ৫০ বছর ধরে দৈনিক সংগ্রাম নিজে পড়েন এবং নিজ দায়িত্বে অন্তত ৭ জনকে পড়তে দেন। এই কাজটি করেছেন ফ্যাসিস্ট হাসিনার সময়েও। দৈনিক সংগ্রাম পড়ার কারণে পরিবারটি নানাভাবে হয়রানির শিকার হলেও তিনি কাজটি করেছেন।
দৈনিক সংগ্রামের প্রতি ভালবাসা পরিমাপ করতে গিয়ে যেটা দেখেছি, পাঠকেরা প্রতিদিন যেমন খাবার খাওয়া এবং নামাজ আদায়কে রুটিন হিসেবে মেনেছেন; তেমনি দৈনিক সংগ্রাম পাঠ করাকেও দৈনন্দিন জীবনে রুটিনের অংশ মনে করেন। একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বিভিন্ন প্রতিকূল সময়ে দৈনিক সংগ্রাম পড়ার কারণে অনেক পাঠককে জেলজুলুম অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছে। বিজ্ঞাপন দাতারা ভয়ে বিজ্ঞাপন দিতে পারেনি। কিন্তু পাঠকরা দৈনিক সংগ্রামকে আগলে রেখে যে অনন্য ভূমিকা পালন করেছেন তার তুলনা হয় না।
২০২৪ইং সালের ৫ই আগস্ট ফ্যাসিবাদের পতনের পর দেশবাসীর জন্য যেমন সুসময় এসেছে। তেমনি দৈনিক সংগ্রাম হয়রানিমুক্ত পরিবেশ পেয়েছে। বিজ্ঞাপন, শুভাকাক্সক্ষী ও পাঠক সংখ্যা।
নিকট অতীতের দিতে তাকালেই মনে পড়ে যায়, বিশেষ করে ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনার শাসনামলে দৈনিক সংগ্রাম পাঠ করার কারণে কিংবা দৈনিক সংগ্রাম বাসায় পাওয়া গেলে জামায়াত-শিবির ট্যাগ দিয়ে তাদের জেলে প্রেরণ করা হয়েছে। এরপরও তারা দৈনিক সংগ্রাম কেনা বন্ধ করেননি। এগুলো মেনেই দৈনিক সংগ্রাম টাকা দিয়ে কিনেছেন, পড়েছেন। অন্তর থেকে দোয়া করেছেন, দৈনিক সংগ্রাম কর্তৃপক্ষ, সংবাদকর্মীসহ সংশ্লিষ্ট কাজের সঙ্গে জড়িত সবার জন্য। অনেক সময় নানা সীমাবদ্ধতার কারণে দৈনিক সংগ্রাম কাক্সিক্ষত সেবা দিতে না পারলেও পাঠকসমাজ দৈনিক সংগ্রামকে ছেড়ে যাননি। অন্তর থেকে ভালোবেসে তারা সংগ্রামকে গ্রহণ করেছেন। এজন্য পাঠকের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো ছাড়া আর কোনো উপায় নাই।
ফ্যাসিবাদী শাসনের সময়টাতে দৈনিক সংগ্রামে হামলা হয়েছে। আক্রমণ হয়েছে, সংবাদ বিভাগসহ সব বিভাগে। সম্পাদককে জেলে নেওয়া হয়েছে। প্রকাশে বিক্রি করতে সমস্যা সৃষ্টি করা হয়েছে। কিন্তু পাঠকমহল থেমে থাকেনি। দৈনিক সংগ্রামকে ভালবেসে আঁকড়ে রেখেছেন। যেভাবে পেরেছে দৈনিক সংগ্রাম সংগ্রহ করেছেন। এমনও পাঠক আছেন, নিজে দৈনিক সংগ্রাম পড়েছেন আরও অনেককে পড়তে দিয়েছেন। তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা না জানালেই নয়।