টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম দুই ম্যাচেই জয় পায় পাকিস্তান। তবে তৃতীয় ম্যাচে এসে ভারতের কাছে হেরে যায় পাকিস্তান। বহু প্রত্যাশিত ম্যাচে একতরফা লড়াইয়ে হার মেনেছে পাকিস্তান। কলম্বোতে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ভারতের কাছে ৬১ রানে হারের পর সুপার এইটের যোগ্যতা অর্জনের স্থান দুই নম্বর থেকে সরে গেছে পাকিস্তান। শেষ গ্রুপ ম্যাচের আগে চাপে তারা। ‘এ’ গ্রুপে তিন ম্যাচে ৬ পয়েন্ট পেয়ে সুপার এইট নিশ্চিত করেছে ভারত। পাকিস্তান বর্তমানে তৃতীয় স্থানে। যুক্তরাষ্ট্র গ্রুপের সবগুলো ম্যাচ খেলে ফেলেছে। চার ম্যাচে ৪ পয়েন্ট নিয়ে দুই নম্বরে তারা। পাকিস্তানও তিন ম্যাচ খেলে চার পয়েন্ট পেয়েছে। তাদের শেষ গ্রুপ ম্যাচ বুধবার নামিবিয়ার বিপক্ষে। ভারতের কাছে বড় ব্যবধানে হারায় নেট রান রেটে পিছিয়ে সাবেক চ্যাম্পিয়নরা। তাদের নেট রান রেট পজিটিভ থেকে নেগেটিভে রূপ নিয়েছে (-০.৪০৩), যুক্তরাষ্ট্র (০.৭৮৮) তাদের উপরে। তার মানে পরের পর্বে যেতে হলে নামিবিয়ার বিপক্ষে পাকিস্তানকে জিততেই হবে। হারলে যুক্তরাষ্ট্রের সমান চার পয়েন্ট থাকবে তাদের এবং নেট রান রেটে পিছিয়ে থাকায় শীর্ষ দুইয়ের বাইরে থাকতে হবে। তবে ম্যাচ বৃষ্টিতে ভেস্তে গেলে পাকিস্তান উঠে যাবে সুপার এইটে। তখন তাদের পয়েন্ট হবে পাঁচ, পেছনে পড়ে যাবে আমেরিকা। কলম্বোর আলো ঝলমলে সন্ধ্যায় প্রত্যাশার চূড়ায় ছিল ভারত-পাকিস্তান দ্বৈরথ। কিন্তু মাঠের লড়াই শেষে পাকিস্তান শিবিরে ভর করেছে হতাশা। ৬১ রানের বড় ব্যবধানে পরাজয়ের পর অধিনায়ক সালমান আলী আগা স্পষ্ট ভাষায় স্বীকার করলেন পরিকল্পনা ঠিক থাকলেও বাস্তব প্রয়োগে ঘাটতিই ডুবিয়েছে দলকে। টসে জিতে প্রতিপক্ষকে আগে ব্যাট করতে পাঠায় পাকিস্তান। কন্ডিশন বিবেচনায় একাদশে রাখা হয় চারজন স্পিনার। ভাবনা ছিল ধীরগতির উইকেটে ঘূর্ণনই হবে প্রধান অস্ত্র। কিন্তু বাস্তবতা অন্য কথা বলেছে। ভারতের উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান ইশান কিষান শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে খেলেন। তার ঝড়ো অর্ধশতকে পাকিস্তানের ঘূর্ণি আক্রমণ ছন্দ হারায়। নির্ধারিত ২০ ওভারে পাঁচ উইকেট হারিয়ে ভারত তোলে ১৭৫ রান। যা টি-টোয়েন্টির মঞ্চে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ সংগ্রহের চেয়েও বেশি। বিশেষত চাপের ম্যাচে। আবরার আহমেদ তিন ওভারে ৩৮ রান খরচ করেন। অভিজ্ঞ শাদাব খান এক ওভারে দেন ১৭ রান। দুজনের কেউই উইকেট পাননি। ইশান কিশানের ৭৭ রানের ইনিংসে ভর করে ভারত ১৭৫ রান সংগ্রহ করে। জবাবে ভারতীয় বোলারদের তোপে পড়ে ১৮ ওভারে মাত্র ১১৪ রানেই অল-আউট হয়ে যায় পাকিস্তান। এই জয়ের মাধ্যমে টানা তিন জয় নিয়ে সুপার এইট নিশ্চিত করেছে ভারত, আর পাকিস্তান পড়েছে চরম অস্তিত্ব সংকটে। ম্যাচ শেষে অধিনায়ক সালমান আলী আগা বলেন, ‘আমরা চার স্পিনার নিয়ে নেমেছিলাম। কিন্তু দিনটা আমাদের ছিল না। সঠিক জায়গায় বল ফেলতে পারিনি।’ লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরুতেই চাপে পড়ে পাকিস্তান। প্রথম ছয় ওভারে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট হারিয়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ হারায় তারা। আঠারো ওভারে একশ চৌদ্দ রানে অলআউট হয়ে যায় দল। অধিনায়ক অকপটে স্বীকার করেন,‘টি-টোয়েন্টিতে প্রথম ছয় ওভারের গুরুত্ব অপরিসীম। সেখানে যদি তিন-চারটি উইকেট হারান তাহলে ম্যাচে ফেরাটা কঠিন হয়ে যায়।’ তিনি আরও জানান, প্রথম ইনিংসে উইকেট ধীর ছিল এবং বল কিছুটা গ্রিপ করছিল। দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাটিং তুলনামূলক সহজ হওয়ার কথা থাকলেও দল পরিস্থিতি কাজে লাগাতে পারেনি। ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ মানেই বাড়তি চাপ। আগা বলেন, ‘এই ধরনের ম্যাচে আবেগ থাকবেই। কিন্তু আবেগের সঙ্গে সঙ্গে শৃঙ্খলা আর পরিকল্পনার বাস্তব প্রয়োগ জরুরি।’ পরাজয় সত্ত্বেও সামনে তাকাতে চাইছেন পাকিস্তান অধিনায়ক। গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে নামিবিয়ার বিপক্ষে জয় তুলে নিয়ে পরবর্তী পর্বে জায়গা নিশ্চিত করাই এখন লক্ষ্য। তার ভাষায়, ‘এই হার ভুলে যেতে হবে। সামনে ম্যাচ আছে। জয় পেলে নতুন করে শুরু করার সুযোগ থাকবে।’ ১৭৫ রান তাড়া করতে নেমে ১১৪ রানে থেমে যাওয়া পাকিস্তানের জন্য শুধু একটি হার নয়, রান ব্যবধানের দিক থেকেও এটি বড় ধাক্কা। নেট রান গড়ের হিসাবেও এর প্রভাব পড়তে পারে। এদিকে ভারতের কাছে ৬১ রানের শোচনীয় পরাজয়ের পর পাকিস্তান ক্রিকেট দলের তুমুল সমালোচনা চলছে। কেবল দেশের ভেতরেই নয়, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অঙ্গনেও বইছে সমালোচনার ঝড়। সাবেক ক্রিকেটার এবং বিশ্লেষকদের মতে, বাবর আজম, শাহিন আফ্রিদি এবং শাদাব খানদের মতো তারকাদের 'অতীতের গৌরব' নিয়ে দলে টিকে থাকার দিন শেষ হয়ে এসেছে। পাকিস্তানের কিংবদন্তি ব্যাটার মোহাম্মদ ইউসুফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) সরাসরি লিখেছেন, ‘শাহিন, বাবর এবং শাদাবদের সময় শেষ। পাকিস্তান টি-টোয়েন্টি দলের এখন নতুন পারফর্মার দরকার।
দুর্বল দলগুলোর বিপক্ষে গুরুত্বহীন জয় দিয়ে জাতিকে আর ভোলানো যাবে না।’ পিসিবির সাবেক চেয়ারম্যান রমিজ রাজা পাকিস্তানের ব্যাটিং বিপর্যয় নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে বলেন, ‘এটা স্রেফ বিপর্যয়! গত ২-৩ বছর ধরে ভারত একই বোলিং আক্রমণ নিয়ে খেলছে, অথচ আমাদের ব্যাটাররা প্রতিবারই তাদের সামনে সাধারণ মানের হয়ে ধরা দিচ্ছে। খেলোয়াড়দের কোনো উন্নতি নেই। সাবেক ওপেনার আহমেদ শেহজাদ বর্তমান দলটিকে ‘পুরানো মুখ, পুরনো ফলাফল’ বলে অভিহিত করেছেন। তার মতে, ফখর জামান, হাসিবুল্লাহ নাফে এবং সালমানদের মতো ক্রিকেটারদের এখনই নিয়মিত সুযোগ দেওয়া উচিত। অন্যদিকে টেস্ট ক্রিকেটার আবিদ আলী কঠোর ভাষায় বলেন, ‘নাম দিয়ে দল নির্বাচন বন্ধ হোক। দলে ইমপ্যাক্ট প্লেয়ার চাই, কোনো যাত্রী নয়। ইংল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক মাইকেল ভন মনে করেন, ভারত মানসিকভাবে পাকিস্তানকে কোণঠাসা করে ফেলেছে। তিনি বলেন, ‘মাঠে ভারত এখন পাকিস্তানকে ভয় দেখায়। খেলার সব বিভাগেই তারা অনেক এগিয়ে এবং বড় ম্যাচের চাপ সামলানোর মানসিকতা তাদের অনেক উন্নত।’
সংক্ষিপ্ত স্কোর
ভারত: ২০ ওভারে ১৭৫/৭ (কিষান ৭৭, আভিশেক ০, তিলাক ২৫, সুরিয়াকুমার ৩২, পান্ডিয়া ০, শিভাম ২৭, রিঙ্কু ১১*, আকসার ০; সালমান ২-০-১০-১, আফ্রিদি ২-০-৩১-১, সাইম ৪-০-২৫-৩, আবরার ৩-০-৩৮-০, শাদাব ১-০-১৭-০, নাওয়াজ ৪-০-২৮-০, তারিক ৪-০-২৪-১)
পাকিস্তান: ১৮ ওভারে ১১৪ (সাহিবজাদা ০, সাইম ৬, সালমান ৪, বাবর ৫, উসমান ৪৪, শাদাব ১৪, নাওয়াজ ৪, ফাহিম ১০, আফ্রিদি ২৩*, আবরার ০, তারিক ০; পান্ডিয়া ৩-১-১৬-২, বুমরাহ ২-০-১৭-২, আকসার ৪-০-২৯-২, ভারুন ৩-০-১৭-২, কুলদিপ ৩-০-১৪-১, তিলাক ২-০-১১-১, রিঙ্কু ১-০-৯-০)
ফল: ভারত ৬১ রানে জয়ী
ম্যান অব দা ম্যাচ: ইশান কিষান