আইপিএল খেলার সম্প্রচারও যেন বন্ধ করে দেওয়া হয় : আসিফ নজরুল

মোস্তাফিজকে বাদ দেয়ার সিদ্ধান্তে বাংলাদেশ শক্ত অবস্থান নেবে : সৈয়দা রিজওয়ানা

ভারতীয় উগ্রপন্থীদের তোপের মুখে বাংলাদেশী পেসার মোস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেয় কলকাতা নাইট রাইডার্স। ঘটনায় অস্থিরতা বেড়েছে বাংলাদেশ-ভারতের ভূরাজনৈতিক সম্পর্কে। এই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় এবার ভারতে আয়োজিত আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ। স্পষ্ট বিবৃতি দিয়ে বিষয়টি জানিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। রোববার দেয়া বিবৃতিতে বিসিবি আইসিসির কাছে আবেদন করেছে, বাংলাদেশের ম্যাচের ভেন্যু যেন ভারতের বাইরে সরিয়ে নেয়া হয়।

প্রেস বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে বিসিবি জানিয়েছে, ‘বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পরিচালনা পর্ষদের একটি জরুরি সভা গতকাল রোববার (৪ জানুয়ারি) বিকেলে অনুষ্ঠিত হয়। সভায় ভারত ও শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিতব্য আইসিসি টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ২০২৬ সংক্রান্ত সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করা হয়।’

‘পর্ষদ গত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন বিষয় বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করে এবং ভারতে অনুষ্ঠিতব্য ম্যাচগুলোতে বাংলাদেশের জাতীয় দলের অংশগ্রহণ ঘিরে সৃষ্ট সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে। বর্তমান পরিস্থিতির পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন, ভারতে বাংলাদেশ দলের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিয়ে বাড়তে থাকা উদ্বেগ এবং বাংলাদেশ সরকারের পরামর্শ বিবেচনায় নিয়ে পরিচালনা পর্ষদ সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, বর্তমান অবস্থায় বাংলাদেশ জাতীয় দল টুর্নামেন্টে অংশ নিতে ভারতে ভ্রমণ করবে না।’

‘এই সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে, টুর্নামেন্টের কর্তৃপক্ষ হিসেবে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলকে (আইসিসি) অনুরোধ জানিয়েছে, বাংলাদেশের সব ম্যাচ যেন ভারতের বাইরে কোনো ভেন্যুতে স্থানান্তর করার বিষয়টি বিবেচনা করা হয়।’

‘পর্ষদের বিশ্বাস, এই পদক্ষেপটি বাংলাদেশের খেলোয়াড়, দলীয় কর্মকর্তা, বোর্ড সদস্য এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সবার নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে এবং দলকে একটি নিরাপদ ও উপযুক্ত পরিবেশে টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে অত্যন্ত জরুরি। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড আশা করছে, আইসিসি পরিস্থিতিটি যথাযথভাবে অনুধাবন করবে এবং এ বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত জানাবে।’

প্রসঙ্গত, গত বছরের ডিসেম্বরে আবুধাবিতে অনুষ্ঠিত নিলামে বাঁহাতি পেসার মুস্তাফিজকে ৯ কোটি ২০ লক্ষ রুপি রেকর্ড মূল্যে দলে ভেড়ায় কেকেআর। তবে দেশটির কিছু উগ্রপন্থি ও রাজনৈতিক নেতাদের চাপের পর বিসিসিআইয়ের পরামর্শে মুস্তাফিজকে ছেড়ে দেয় কলকাতা। বিষয়টি নিয়ে চরম প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে বাংলাদেশে। মুস্তাফিজের পুরো ঘটনাই প্রভাব ফেলেছে ভারতে ৭ ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিয়ে। শনিবার রাত থেকেই বিষয়টি নিয়ে বৈঠক করছে বিসিবি। এরই মধ্যে বিশ্বকাপে ১৫ সদস্যের দলও ঘোষণা করেছে বিসিবি।

এদিকে এ বিষয়ে বিসিসিআইয়ের কেউ আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানাননি। তবে বোর্ডটির একটি সূত্র

রোববার ভারতীয় গণমাধ্যম এনডিটিভিকে বলেছে ‘কারও খামখেয়ালিপনার বশে হুট করে ম্যাচ বদলে দেওয়া যায় না। এটা একেবারেই লজিস্টিক দুঃস্বপ্ন। প্রতিপক্ষ দলগুলোর কথা ভাবুন—তাদের বিমান টিকিট, হোটেল সবই বুক করা।’

প্রতিটি ম্যাচের দুটি দলের পাশাপাশি সম্প্রচার দল ও সময়ের বিষয় জড়িত। সেটি মনে করিয়ে বিসিসিআই সূত্রটি আরও বলেন, ‘প্রতিদিনই তিনটি করে ম্যাচ রয়েছে, যার অর্থ একটি ম্যাচ হবে শ্রীলঙ্কায়। সেখানে সম্প্রচার টিমও রয়েছে। ফলে বিষয়টা বলা যত সহজ, করা ততটা নয়।’

আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি শুরু হবে দশম টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। প্রথম দিনই শ্রীলঙ্কার কলম্বোয় খেলবে পাকিস্তান-নেদারল্যান্ডস। একই দিনের দ্বিতীয় ম্যাচে কলকাতায় ওয়েস্ট ইন্ডিজের মুখোমুখি হওয়ার কথা রয়েছে বাংলাদেশের। গ্রুপ পর্বে বাংলাদেশের পরের তিনটি ম্যাচের দুটিও কলকাতায়, অন্যটি মুম্বাইয়ে। ‘সি’ গ্রুপে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ হিসেবে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সঙ্গে আছে ইংল্যান্ড, ইতালি ও নেপাল।

২ উপদেষ্টার প্রতিক্রিয়া

প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড.আসিফ নজরুল ও তথ্য উপদেস্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। গতকাল রোববার পৃথক পৃথকভাবে এ প্রতিক্রিয়া জানান সরকারের এই দুই উপদেষ্টা।

বিসিসিআইয়ের এমন সিদ্ধান্তে ক্ষোভ প্রকাশ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দীর্ঘ এক স্ট্যাটাস দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের আইন ও ক্রীড়া উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল। শনিবার রাত ১১টার দিকে তিনি এই স্ট্যাটাস দেন।

স্ট্যাটাসে ড. আসিফ নজরুল লিখেছেন, ‘উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর কাছে নতি শিকার করে বাংলাদেশের ক্রিকেটার মোস্তাফিজুর রহমানকে দল থেকে বাদ দেওয়ার জন্য কলকাতা নাইট রাইডার্সকে নির্দেশ দিয়েছে ভারতের ক্রিকেট বোর্ড। আমি এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী হিসেবে আমি ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ডকে বলেছি তারা যেন আইসিসির কাছে পুরো বিষয়টি ব্যাখ্যা করে লিখে।’

তিনি আরও লিখেন, ‘বোর্ড যেন জানিয়ে দেয় যে যেখানে বাংলাদেশের একজন ক্রিকেটার চুক্তিবদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও ভারতে খেলতে পারেন না, সেখানে বাংলাদেশের গোটা ক্রিকেট টিম বিশ্বকাপ খেলতে যাওয়া নিরাপদ মনে করতে পারেনা। বোর্ড থেকে বাংলাদেশের বিশ্বকাপ খেলাগুলো শ্রীলংকায় অনুষ্ঠিত করার অনুরোধ জানানোর নির্দেশনাও আমি দিয়েছি। আমি তথ্য এবং সম্প্রচার মন্ত্রীকে অনুরোধ করেছি বাংলাদেশ আইপিএল খেলার সম্প্রচারও যেন বন্ধ করে দেওয়া হয়!

ক্রীড়া উপদেষ্টা লেখেন, আমরা কোনো অবস্থাতেই বাংলাদেশের ক্রিকেট, আমাদের ক্রিকেটার এবং বাংলাদেশকে অবমাননা মেনে নেব না। গোলামির দিন শেষ।

এদিকে রোববার সকালে সচিবালয়ে বাংলাদেশ সেক্রেটারিয়েট রিপোর্টার্স ফোরাম (বিএসআরএফ) আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেছেন, আইপিএল থেকে মুস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেয়ার সিদ্ধান্তের বিষয়ে বাংলাদেশ একটি শক্ত অবস্থান নেবে। তবে এখনই বাংলাদেশে আইপিএল সম্প্রচার বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। পরিস্থিতি বিবেচনা করে পরবর্তী সময় সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘আইপিএল থেকে বাংলাদেশের তারকা পেসার মুস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেওয়ার ঘটনায় সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো হবে। বাংলাদেশ একটি শক্ত অবস্থান নেবে। এই সিদ্ধান্তের পেছনে কী আইনি ভিত্তি রয়েছে।’

বাংলাদেশ কোন প্রক্রিয়ায় প্রতিক্রিয়া জানাবে সে বিষয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলেও জানান তথ্য উপদেষ্টা।

বাংলাদেশে আইপিএল সম্প্রচার বন্ধ করা হবে কি না-এমন প্রশ্নের জবাবে উপদেষ্টা বলেন, ‘সেরকম জায়গায় আমাদেরও একটা অবস্থান নিতে হবে। আমরা সেই অবস্থানের আইনগত ভিত্তি পর্যালোচনা এবং প্রক্রিয়া যাচাই-বাছাই করছি। এর পরে আমরা একটা পদক্ষেপ গ্রহণ করব। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ‘এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ওপর কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।’

রিজওয়ানা হাসান বলেন, কোন যুক্তিতে মুস্তাফিজকে মানা করা হচ্ছে। খেলারই কোন যুক্তিতে মানা করা হলে তো কোনো ব্যাপার ছিল না। যে যুক্তিতে মানা করা হচ্ছে সে যুক্তিটা তো আসলে আমরা কোনোভাবেই গ্রহণ করতে পারি না। ফলে সেখানে আমাদের একটা প্রতিক্রিয়া দেখাতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, আইপিএল নিয়ে আইন উপদেষ্টা যেটা বলেছেন, আমরা আইনি ভিত্তিটা পর্যালোচনা করছি। এটা কোন মাধ্যমে কীভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে সেই বিষয়টা দেখে আমরা আমাদের সিদ্ধান্তটা জানাবো।

এদিকে মোস্তাফিজকে নিয়ে যা হয়েছে সেটা ন্যক্কারজনক: সংস্কৃতি উপদেষ্টা। শনিবার রাতে এক ফেসবুক পোস্টে ফারুকী লেখেন, ‘আইপিএলে মোস্তাফিজকে নিয়ে যা হয়েছে, সেটা ন্যক্কারজনক। এর মধ্যে বাংলাদেশের নাগরিকরা ঘৃণার রাজনীতি দেখতে পেয়েছেন এবং ব্যথিত হয়েছেন।