বলাই যায় এবার আর বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলা হচ্ছে না। কারন আইসিসি আর বাংলাদেশ নিজ নিজ অবস্থানেই আছে। ভারতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ না খেলার সিদ্ধান্তে অনড় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এদিকে কয়েক দফা বৈঠক ও আলোচনা হলেও ম্যাচ ভেন্যু বদলের সুযোগ নেই বলে জানিয়ে দিয়েছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি)। বিশ্বকাপ শুরুর আর দুই সপ্তাহ বাকি থাকায় সূচিতে বড় পরিবর্তন এখন কার্যত সম্ভব নয় বলেই তাদের অবস্থান। তবে এই না খেলা নিয়ে দেশের মানুষের মধ্যে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। একপক্ষের মতে, ভারতের ‘দাদাগিরি’, একপেশে মানসিকতা এবং ধর্মের রং মেখে মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে নিষিদ্ধ করার প্রতিবাদ ও তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারার শঙ্কা থেকেই বাংলাদেশের ভারতে গিয়ে বিশ্বকাপ খেলা উচিত নয়। অন্য পক্ষের যুক্তি হলো, ভারতের আচরণ ও বিসিসিআইয়ের নেতিবাচক সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে সরাসরি ‘না’ না বলে আরও কৌশলিভাবে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করা যেত। দ্বিতীয়পক্ষের বড় যুক্তি হলো, ভারতের মাটিতে আইসিসির টি-টোয়েন্টি আসর না খেলার অর্থই হচ্ছে আইসিসিবিরোধী অবস্থান নেওয়া। এতে বাংলাদেশের ক্রিকেটে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে।

আইসিসির বৈশ্বিক ইভেন্টগুলো ক্রিকেট বোর্ড ও ক্রিকেটারদের আয়ের অন্যতম বড় উৎস। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে খেললে বিসিবি, ক্রিকেটার, কোচিং স্টাফ ও ম্যানেজমেন্টের জন্য অংশগ্রহণ বাবদ প্রায় চার কোটি টাকা পাওয়া যেত বলে সংশ্লিষ্টরা জানাচ্ছেন, যা ডলারের হিসাবে প্রায় ৩ লাখ মার্কিন ডলার। টুর্নামেন্টে ভালো করলে প্রাপ্য বাড়ে আরও। সেরা ১২ দলের মধ্যে থাকতে পারলে কোনো দলের আয় হতে পারে সাড়ে পাঁচ কোটিরও বেশি টাকা, ডলারে যা আনুমানিক ৪ লাখ ৫০ হাজার। বাংলাদেশ যদি আনুষ্ঠানিকভাবে টুর্নামেন্ট থেকে সরে দাঁড়ায়, তাহলে সবচেয়ে বেশি চাপ পড়তে পারে খেলোয়াড়দের ওপর। ম্যাচ ফি, পারফরম্যান্স বোনাস ও প্রাইজমানির সুযোগ থেকে তারা বঞ্চিত হবেন। এতে জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের ব্যক্তিগত আয়ে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশের অনেক ক্রিকেট অনুরাগীর ধারণা, জাতীয় দল মাঠে খেললে টিকিট বিক্রি হয়, প্রচুর বিজ্ঞাপন আসে, সম্প্রচার স্বত্ব ও স্পন্সরশিপ থেকে বিসিবি কোটি কোটি টাকা আয় করে। আর সেই অর্থ দিয়েই দেশের ক্রিকেট চলে। এই ধারণা পুরোপুরি মিথ্যা নয়, সত্য। তবে আংশিক। আসল সত্য হলো, বাংলাদেশের ক্রিকেটের মূল আয়ের উৎসই আইসিসি। বিসিবির বাৎসরিক আয়ের প্রায় ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ অর্থ আসে আইসিসির কাছ থেকে। আইসিসি বিভিন্ন সময় ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টির বৈশ্বিক আসর আয়োজন করে।

সেই আসরগুলো থেকে অংশগ্রহণকারী সব দলই নিজেদের অবস্থানের ভিত্তিতে রাজস্ব পায়। প্রথমত, অংশগ্রহণ মানি। অর্থাৎ টুর্নামেন্টে খেললেই একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ দেয় আইসিসি। এরপর ধাপে ধাপে বিভিন্ন পর্যায়ের জন্য আলাদা করে রেভিনিউ দেওয়া হয়। গ্রুপ পর্ব থেকে শুরু করে প্রতিটি পরবর্তী ধাপের জন্য নির্ধারিত অর্থ পাওয়া যায়। বিশ্বকাপ না খেললে এই পুরো অর্থ থেকেই বঞ্চিত হবে বাংলাদেশ। এর পাশাপাশি, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ না খেলার প্রকৃত ও গ্রহণযোগ্য কারণ তুলে ধরতে ব্যর্থ হলে বিসিবিকে ২০ লাখ মার্কিন ডলার (প্রায় ২৪ কোটি টাকা) আর্থিক জরিমানা গুনতেও হতে পারে। এরপর আসে আরেকটি বড় ঝুঁকি। আইসিসি প্রতি অর্থবছরে যে নিয়মিত রাজস্ব বণ্টন করে, সেটিও বিসিবি নাও পেতে পারে। আইসিসি যদি মনে করে বিসিবি তাদের কোড অব কন্ডাক্ট ভঙ্গ করেছে, তাহলে অতিরিক্ত জরিমানার মুখেও পড়তে হতে পারে। এর বাইরে রয়েছে ক্রিকেটীয় ক্ষতি। ২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশ না নেওয়ার কারণে দুই বছর পর যখন আবার আইসিসি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হবে, তখন বাংলাদেশ সরাসরি খেলতে পারবে না। সেক্ষেত্রে বাছাই পর্ব পেরিয়ে মূল পর্বে জায়গা করে নিতে হবে। এছাড়া আগামী বছর বাংলাদেশে এশিয়া কাপ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। যেহেতু বাংলাদেশ ভারতে গিয়ে খেলতে অনীহা প্রকাশ করেছে, এক বছর পর ভারত বাংলাদেশে এসে খেলতে আগ্রহ দেখাবে কি নাÑ তা নিয়েও যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, ২০২৪ থেকে ২০২৭ সালের মধ্যে আইসিসির কাছ থেকে বিসিবির প্রায় ৩২৬ কোটি টাকা রাজস্ব পাওয়ার কথা।

খুব স্বাভাবিকভাবেই এবার আইসিসির ডাকে সাড়া না দিয়ে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ না খেললে পরবর্তী তিন বছরের অর্থাৎ ২০২৮ থেকে ২০৩১ সাইকেলে আইসিসির বরাদ্দ কমে যাওয়ার আশঙ্কা প্রবল। এর আগে ২০২৪ সালের আইসিসি পুরুষ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে প্রাইজমানির অঙ্ক ছিল আসরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। রানার্সআপ দল পেয়েছিল অন্তত ১২ লাখ ৮০ হাজার ডলার। সেমিফাইনালে বাদ পড়া দুই দল পেয়েছিল ৭ লাখ ৮৭ হাজার ৫০০ ডলার করে। দ্বিতীয় রাউন্ডে যেতে না পারা দলগুলো পেয়েছিল ৩ লাখ ৮২ হাজার ৫০০ ডলার। নবম থেকে দ্বাদশ স্থানে থাকা দলগুলো পেয়েছিল ২ লাখ ৪৭ হাজার ৫০০ ডলার করে, আর ত্রয়োদশ থেকে বিংশ অবস্থানে থাকা দলগুলো পেয়েছিল ২ লাখ ২৫ হাজার ডলার করে। এছাড়া সেমিফাইনাল ও ফাইনাল বাদে প্রতিটি ম্যাচ জয়ের জন্য দলগুলো অতিরিক্ত ৩১ হাজার ১৫৪ ডলার করে পেয়েছিল। বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হলে মাঠের বাইরের এই আর্থিক হিসাবও সামনে চলে আসবে।