ওয়ানডে ক্রিকেটে দীর্ঘ তিন বছর পর কোনো বাংলাদেশি পেসারের পাঁচ উইকেট শিকারের খরা কাটলো। নিজের করা টানা ৭ ওভারের স্পেলে মাত্র ২৪ রান খরচ করে পেসার নাহিদ রানা তুলে নিয়েছেন ৫টি উইকেট। এটা তার ক্যারিয়ারের প্রথম ফাইফার। আর এর মাধ্যমেই রহস্যময় উইকেটে গতির ঝড় তুলে পাকিস্তানের ব্যাটিং লাইনআপ একাই গুঁড়িয়ে দিলেন নাহিদ রানা। ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজে বাদ পড়ার ক্ষোভ যেন গতকাল বল হাতে ঝাড়লেন এই তরুণ পেসার। গতকাল মিরপুরে তিন ম্যাচ সিরিজের প্রথম ওয়ানডেতে টস হেরে ব্যাটিং করতে নামা পাকিস্তানের শুরুটা ভালোই ছিল। কিন্তু প্রথম পাওয়ারপ্লের শেষ ওভারে অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজের আস্থার প্রতিদান দিতে দেরি করেননি নাহিদ। নিজের প্রথম ওভারের শেষ বলেই সাহিবজাদা ফারহানকে ফিরিয়ে শিকার শুরু করেন তিনি। এরপর ১৪০ কিমি গতির শর্ট বলে বিভ্রান্ত করে একে একে সাজঘরে ফেরান শামিল হোসেন ও অভিষিক্ত ওপেনার মাজ সাদাকাতকে। তবে দিনের সবচেয়ে বড় শিকারটি ছিল অভিজ্ঞ মোহাম্মদ রিজওয়ানের। অফ স্টাম্পের বাইরের ফুল লেন্থ ডেলিভারিতে রিজওয়ানকে পরাস্ত করলে উইকেটের পেছনে ডানদিকে ঝাঁপিয়ে দারুণ ক্যাচ লুফে নেন লিটন দাস। এরপর সালমান আগাকে ফিরিয়ে ক্যারিয়ারের প্রথম ‘ফাইফার’ পূর্ণ করেন নাহিদ। নাহিদের এই কীর্তিতে বাংলাদেশের পেস বোলিংয়ের একটি দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটল। সর্বশেষ ২০২৩ সালের মার্চে সিলেটে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে পাঁচ উইকেট নিয়েছিলেন হাসান মাহমুদ। এরপর দীর্ঘ সময় কোনো টাইগার পেসার ওয়ানডেতে এই মাইলফলক স্পর্শ করতে পারেননি। নাহিদ রানা গতকাল সেই তালিকায় ১১তম বাংলাদেশি পেসার হিসেবে যুক্ত হলেন। মোস্তাফিজুর রহমান, তাসকিন আহমেদ ও মাশরাফি বিন মুর্তজাদের গড়া রাজকীয় ক্লাবে এখন থেকে উচ্চারিত হবে নাহিদের নাম। মিরপুরের পিচ রিড করতে গিয়ে বড় ধরনের বিপর্যয়ে পড়ে পাকিস্তান। এদিন তাদের চারজন ব্যাটারের অভিষেক হয়েছিল, যাদের কাছে নাহিদের গতির কোনো জবাব ছিল না। অনভিজ্ঞ ব্যাটিং লাইনের সুযোগ নিয়ে শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক বোলিং করে পাকিস্তানকে ম্যাচ থেকে ছিটকে দেন এই গতি তারকা। ৫ ওয়ানডেতে ৫ উইকেট নিয়ে গতকাল মাঠে নামা নাহিদ এক ম্যাচেই নিজের নামের পাশে আরও ৫ উইকেট যোগ করে মাঠ ছাড়েন। এই মাঠে পেসারদের মধ্যে সর্বশেষ ৫ উইকেট শিকারি ছিলেন হাসান মাহমুদ। গতকাল পাকিস্তানের বিপক্ষে সর্বশেষ বাংলাদেশি ফাস্ট বোলার হিসেবে ৫ উইকেট শিকারি হলেন নাহিদ রানা। এ ম্যাচের আগে বাংলাদেশের হয়ে ৫টি ওয়ানডে খেলা নাহিদ রানার সেরা বোলিং ফিগার ছিল ৪০ রানে ২ উইকেট (২০২৪ সালের ১১ নভেম্বর শারজায় আফগানিস্তানের বিপক্ষে)। গতকাল ১১ মার্চ শেরে বাংলায় বল হাতে আগুন ঝরিয়ে প্রথম ৫ ওভারেই ৫ উইকেট ঝুলিতে পুরে নেন নাহিদ রানা। উইকেটে খুব একটা সহায়তা ছিল না। পিচে খুব বেশি সবুজ ঘাসের সমারোহও নেই। তবে গতি ও বাউন্স চিরচেনা শেরে বাংলার চেয়ে খানিকটা ভালো ছিল। পেসাররা গতি তুলতে পেরেছেন। মাঝে মাঝে সামান্য সুইংও করেছে। নাহিদ রানা এই পিচে কখনো কখনো ১৪৫ কিলোমিটার গতিতে বল করে পাকিস্তানি ব্যাটারদের বিব্রত করে তুলেছেন। তার দ্রুতগতির ডেলিভারির বিপক্ষে সাহিবজাদা ফারহান আর মা’জ সাদাকাতও মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেননি। তার থ্রি-কোয়ার্টার লেন্থে পিচে পড়া ১৪৫ কিলোমিটার গতির বল সামলাতে রীতিমতো হিমশিম খেয়েছেন পাকিস্তানি ব্যাটাররা। নাহিদ রানার পঞ্চম শিকার হন সালমান আগা। খানিকটা লাফিয়ে ওঠা বলকে পেছনের পায়ে গিয়ে নামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেও পারেননি তিনি। বল তার ব্যাটের নিয়ন্ত্রণের বাইরে লেগে ক্যাচ চলে যায় শর্ট লেগে দাঁড়ানো তানজিদ তামিমের হাতে। তামিম কয়েকবারের চেষ্টায় তা ধরে ফেলেন। তাতেই ওয়ানডে ক্রিকেটে প্রথম ৫ উইকেট পূর্ণ হয় নাহিদ রানার। তার এই সংহার মূর্তির সামনে পাকিস্তানি ব্যাটারদের রীতিমতো অসহায় মনে হয়েছে। একজনও প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেননি। নাহিদ রানার এই কার্যকর ও বিধ্বংসী বোলিং বাংলাদেশ টিম ম্যানেজমেন্টের তিন পেসার খেলানোর সিদ্ধান্তের যথার্থতার প্রমাণ। ২ পেসার খেলালে হয়তো তাসকিন আর মোস্তাফিজই খেলতেন। নাহিদ রানার জায়গা হতো কি না সন্দেহ।
দলে তিনি তৃতীয় সিমার হিসেবেই খেলেছেন এবং তাসকিন, মোস্তাফিজ ও মেহেদী মিরাজের পরে বোলিংয়ে এসেছেন। শেরে বাংলায় ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজের শেষ ম্যাচে ৬ উইকেট দখল করেছিলেন লেগস্পিনার রিশাদ হোসেন। সেই মাঠেই এবার পাকিস্তানের বিপক্ষে ফাস্ট বোলার নাহিদ রানা দুর্দান্ত বোলিং করে ৫ উইকেট শিকার করেছেন। গল্পটা সত্যিই নতুন। যে মাঠে গণ্ডায় গণ্ডায় সাকিব, মিরাজ, তাইজুলদের ৫ উইকেট আছে, সেখানে ১৬ মাস পর এক ফাস্ট বোলারের ৫ উইকেট পাওয়া নিঃসন্দেহে সাফল্যের নতুন গল্প।