যেখানে আমাদের সম্মান নেই, সেই খেলা দেখানোরও দরকার নেই- খালেদ মাসুদ
আইপিএলের আসন্ন মৌসুমের আগে নিলামে কলকাতা নাইট রাইডার্স ৯ কোটি ২০ লাখ রুপিতে মুস্তাফিজকে দলে নেয়। তবে নিলামের কয়েক সপ্তাহ পরই পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। ভারতের কট্টর হিন্দুত্ববাদীদের আন্দোলনের মুখে বিসিসিআইয়ের নির্দেশে মুস্তাফিজকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার পর বাংলাদেশে ব্যাপক তোলপাড় চলছে।
আইপিএলের ইতিহাসে এর আগে কখনো কোনো চুক্তিবদ্ধ খেলোয়াড়কে মৌসুম শুরুর এত আগে, ফিটনেস বা শৃঙ্খলাজনিত কারণ ছাড়া বাদ দেওয়ার নজির নেই। ফলে বিষয়টি শুধু ক্রিকেটীয় নয়, কূটনৈতিক আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। মোস্তাফিজকে বাদ দেওয়ার দিনই বিসিবি জরুরি সভায় সিদ্ধান্ত নেয় টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতে গিয়ে খেলবেনা বাংলাদেশ।
মোস্তাফিজকে কলকাতা নাইট রাইডার্স দল থেকে বাদ দেয়ার ঘটনায় কঠোর অবস্থান নিয়েছে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের (আইপিএল) সব খেলা এবং অনুষ্ঠান প্রচার/সম্প্রচার বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশের অন্তর্র্বতীকালীন সরকার। সোমবার গতকাল তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের টিভি-২ শাখা থেকে এ সংক্রান্ত নির্দেশনা জারি করা হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়, ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড আগামী ২৬ মার্চ থেকে অনুষ্ঠেয় ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএল) ক্রিকেট খেলায় বাংলাদেশের তারকা খেলোয়াড় মোস্তাফিজুর রহমানকে কলকাতা নাইট রাইডার্স দল থেকে বাদ দেওয়ার নির্দেশ দৃষ্টিগোচর হয়েছে। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের এই সিদ্ধান্তের কোনো যৌক্তিক কারণ জানা নেই। এমন সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জনগণকে ব্যথিত, মর্মাহত ও ক্ষুব্ধ করেছে।
এ অবস্থায় পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত আইপিএলের সব খেলা এবং অনুষ্ঠান প্রচার বা সম্প্রচার বন্ধ রাখার জন্য অনুরোধ করা হলো। এমন একটি নির্দেশ আসতে পারে, তা ধারণাই করা হচ্ছিল। কারণ, ক্রিকেটার মোস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেওয়ার প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশে আইপিএল সম্প্রচার বন্ধের উদ্যোগ নিতে তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টাকে অনুরোধ করেছিলেন আইন ও ক্রীড়া উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল।
আগের দিন গত শনিবার আইপিএল সম্প্রচার বন্ধের এই অনুরোধের বিষয়ে গতকাল রোববার তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান সাংবাদিকদের বলেছিলেন, আইনি ভিত্তি পর্যালোচনা করছেন, এটা কোন মাধ্যমে, কীভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে, সেই বিষয়টা দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তিনি এটাও বলেছিলেন, এখানে একটি সিচুয়েশন তাঁর জন্য তৈরি করা হয়েছে। তাঁকে এ ব্যাপারে একটা ব্যবস্থা নিতে হবে। তাঁর চুপ করে বসে থাকার উপায় নেই। তথ্য উপদেষ্টার এই বক্তব্যের এক দিন পরেই সোমবার তথ্য মন্ত্রণালয় চিঠি দিয়ে আইপিএল সম্প্রচার বন্ধ রাখার জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিল।
উল্লেখ্য পেসার মোস্তাফিজুর রহমানের এবারের আইপিএলে কলকাতা নাইট রাইডার্সের (কেকেআর) হয়ে খেলার কথা ছিল। তবে ৩ জানুয়ারি ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড বিসিসিআইয়ের নির্দেশে মোস্তাফিজকে দল থেকে বাদ দিয়েছে কেকেআর। এমন সিদ্ধান্তে বাংলাদেশে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয়েছে। এই ঘটনার জেরে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে ভারতে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিসিবি।
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের পরিচালক সাবেক জাতীয় দলের অধিনায়ক খালেদ মাসুদ পাইলট এই প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘খেলার মধ্যে রাজনীতি আসা উচিত না। ক্রিকেটের জায়গায় ক্রিকেট থাকা উচিত। আমি মনে করি খেলাধুলা মানুষকে এক করে।’ তবে বাংলাদেশে আইপিএলের সম্প্রচার বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়ে খালেদ মাসুদ বলেন, ‘যে ইস্যু নিয়ে মোস্তাফিজকে (ফেরত) পাঠানো হয়েছে, সেটা কিন্তু বোধগম্য না। পারফরম্যান্সের কারণে হতে পারত। কিন্তু কোনো কিছুই না, তবু এটা করা হলো, যা আমাদের সবাইকে ছুঁয়ে গেছে। দিন শেষে আমাদের স্বার্থটা দেখতে হবে। যেখানে আমাদের খেলোয়াড়দের সম্মান নেই, সেই খেলা আমাদের দেখানোরও দরকার নেই। আমরা ক্রিকেট ভালোবাসি, সব রকম খেলা ভালোবাসি। কিন্তু যখন আমাদের এক নাগরিককে অসম্মান করবেন, আমার মনে হয় ওটা (আইপিএল) এড়িয়ে যাওয়াই উচিত। আর আমি আইপিএল এমনিতেও ওভাবে পছন্দ করি না।’টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে খেলতে বিসিবির ভারতে না যাওয়ার সিদ্ধান্তের বিষয়ে খালেদ মাসুদ বলেন, ‘মোস্তাফিজকে যখন নিরাপত্তা দিতে পারেনি, তখন বোর্ড নিরাপদ মনে করেনি।’ খালেদ মাসুদের আশা, ‘এই সমস্যার সমাধান হবে, তবে বাংলাদেশের নিজের পায়ে দাঁড়ানো উচিত। আমরা আমাদের মতো করে চলব। আইসিসি এটা ঠিক করার ব্যবস্থা করবে এবং আমার মনে হয় এটা খেলার মাধ্যমে সম্ভব।’
খালেদ মাসুদ মনে করেন, বাংলাদেশ-ভারত ক্রিকেট সম্পর্কে বর্তমানে যে সমস্যা চলছে সেটার সমাধানে, ‘রাজনৈতিকভাবে এই সমস্যা তৈরি হচ্ছে বলে আমার মনে হয়। আমি মনে করি রাজনীতিবিদদের এই জিনিসটা থেকে সরে আসা উচিত। বিশেষ করে যেটা মোস্তাফিজকে নিয়ে হয়েছে, সেটা ভালো কাজ হয়নি। খেলার মাঠে এসব না আসাই ভালো।’আইসিসির চেয়ারম্যান বিজেপির রাজনীতিবিদ অমিত শাহর ছেলে জয় শাহ। তিনি এর আগে বিসিসিআইয়ের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। খালেদ মাসুদ তাই বলেছেন, ‘আমরা বিশ্বকাপ খেলব কিন্তু আইসিসির অধীনে। চিঠিটা তাই দিতে হয় আইসিসিকে। আইসিসি কতটা ন্যায্য, কতটা অন্যায্য থাকবে, তা আমরা সবাই জানি। আইসিসির ওপর প্রভাব খাটায় কিন্তু ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড। তো অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে ন্যায্য বিচারটা হয় না-এটা আমার অনেক সময়ই মনে হয়েছে একজন খেলোয়াড় হিসেবে। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বাংলাদেশের স্থানে থাকা ভালো। প্রতিপক্ষ কী করছে, আইসিসি কী করছে-আমার মনে হয় এসবের চেয়ে আমরা কী পারব, কী পারব না, এ বিষয়ে সরাসরি মতামত থাকা ভালো।’
বাংলাদেশে আইপিএলের সম্প্রচার বন্ধে বিসিসিআইয়ের সাবেক কর্মকর্তার প্রতিক্রিয়া
বাংলাদেশের এমন সিদ্ধান্ত বেশ গুরুত্ব সহকারে প্রচার করা হচ্ছে ভারতীয় গণমাধ্যমে। বাংলাদেশে আইপিএল সম্প্রচার বন্ধ করা প্রসঙ্গে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ভারতীয় ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ডের (বিসিসিআই) এক সাবেক কর্মকর্তা। দেশটির সংবাদ সংস্থা আইএএনএসকে তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়াকে স্বাভাবিক বলেই মনে করছেন তারা। বিসিসিআইয়ের সাবেক ওই কর্মকর্তা বলেন, “প্রত্যেক ক্রিয়ারই একটি প্রতিক্রিয়া থাকে। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড তাদের ক্ষমতার মধ্যেই যা করা সম্ভব, সেটাই করেছে। বিষয়টি তাদের ব্যথিত করেছে বলেই প্রতিক্রিয়া এসেছে। তবে এতে ভারত বা আইপিএলে তেমন বড় প্রভাব পড়বে বলে মনে করি না।”
উল্লেখ্য ভারতের কট্টর হিন্দুত্ববাদীদের আন্দোলনের মুখে মুস্তাফিজকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার পর বাংলাদেশে ব্যাপক তোলপাড় চলছে। এক জরুরি সভায় বসেছিল বিসিবি। সেই সভা শেষে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) সঙ্গে যোগাযোগ করে বিসিবি। ভারতের ভেন্যুতে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কথা জানিয়ে ২০২৬ টিÑটোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের ম্যাচগুলো অন্যত্র সরানোর অনুরোধ জানানো হয়।
ভারত ও শ্রীলঙ্কার যৌথ আয়োজনে আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়ার কথা রয়েছে আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। লিগ পর্বে বাংলাদেশের কলকাতার ইডেন গার্ডেন্সে তিনটি ও মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে একটি ম্যাচ নির্ধারিত ছিল। কিন্তু মুস্তাফিজকে আইপিএল থেকে বাদ দেয়ার ইস্যুতে তা শুধু মাঠের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ক্রীড়া ও কুটনৈতিক অঙ্গনেও এর প্রভাব পড়ছে।
এদিকে বাংলাদেশে আইপিএলের সম্প্রচার স্থগিতের সিদ্ধান্তে দুই দেশের ক্রিকেট সম্পর্ক নতুন করে আলোচনায় এসেছে। আইসিসি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি। তবে সামনের দিনগুলোতে বিশ্বকাপের সূচি ও ভেন্যু নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ভারতের সাবেক স্পিনার হরভজন সিংয়ের প্রতিক্রিয়া
মোস্তাফিজকে আইপিএল খেলতে না দেয়ার সিদ্ধান্তে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের অনেকেই ভারতের সমালোচনা করেছেন। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতের পরিবর্তে অন্য কোনো দেশে ম্যাচ আয়োজনের জন্য বাংলাদেশের অনুরোধ নিয়ে মুখ খুলেছেন ভারতের সাবেক স্পিনার হরভজন সিং।
হরভজনের মতে, ভারতে খেলতে আসবে কি না সে সিদ্ধান্ত বাংলাদেশেরই। তিনি বলেন, ‘গত কয়েক দিনে যা যা ঘটেছে, তারপর বাংলাদেশ ভারতে আসতে চায় না। বাংলাদেশে যা হয়েছে, তা ভুল। এখন আইসিসিকেই তাদের অনুরোধের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ভারত সবাইকে স্বাগত জানায়, কিন্তু তারা এখানে আসতে চায় কি না-সেটা তাদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত।’