দেশের ক্রীড়াঙ্গনে নতুন যুগের সূচনা হতে যাচ্ছে সোমবার। প্রথমবারের মতো সরকারি পর্যায়ে জাতীয় ক্রীড়াবিদদের বেতনের আওতায় আনা হচ্ছে। ১২৯ জন ক্রীড়াবিদকে ক্রীড়া কার্ড তুলে দেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে তাদের সম্মাননাও দেয়া হবে। মাসিক বেতনের পরিমাণ এখনো জানানো না হলেও তা প্রত্যাশার চেয়ে বেশি হবে বলে জানিয়েছেন ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক।
‘ক্রীড়া হলে পেশা, পরিবার পাবে ভরসা’ এই স্লোগান এবার বাস্তবে রূপ নিতে যাচ্ছে। বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী বিভিন্ন ডিসিপ্লিনের ক্রীড়াবিদরা বেতন কাঠামোর আওতায় আসছেন। তবে ক্রিকেট বোর্ড স্বনির্ভর হওয়ায় ক্রিকেটাররা এই তালিকার বাইরে থাকছেন।
ফুটবল, ক্রিকেটের বাইরে অন্য খেলার খেলোয়াড়দের আর্থিক অবস্থা খুবই নাজুক। আর্থিক নিশ্চয়তা না পাওয়ায় অন্য খেলার খেলোয়াড়রা খেলা ছেড়ে দেন। আবার যারা তারকা তারা বিদেশে স্থায়ী হওয়ার চেষ্টা করেন। আগামীতে এই প্রবণতা কমে আসবে এমনটা মনে করেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী। এই আর্থিক সম্মানী পেলে ক্রীড়াবিদরা দেশের জন্য আরো বেশি অনুপ্রাণিত হবে এবং তাদের পরিবারও বাচ্চাদের ক্রীড়াঙ্গনে রাখতে চাইবে।
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড ক্রিকেটারদের কেন্দ্রীয় চুক্তির আওতায় এনেছে। এতে ক্রিকেটাররা গ্রেড ভিত্তিক কয়েক লাখ টাকা করে বেতন পান। এরপর আবার ম্যাচ ও উইনিং ফি ও রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে আপাতত ক্রিকেটের বাইরে অন্য খেলার খেলোয়াড়দের আনা হচ্ছে, ‘৩০ মার্চ প্রথম ধাপে ১২৯ জনকে ক্রীড়া ভাতার আওতায় আনা হচ্ছে। সপ্তাহ খানেকের মধ্যে আরো অনেক খেলার খেলোয়াড় এতে আসবেন। প্রাথমিকভাবে ৫০০ জন খেলোয়াড় এই আওতায় থাকবে। ক্রিকেটাররা যেহেতু আর্থিকভাবে ভালো তাই ক্রিকেট বাদে ফুটবল থেকে শুরু করে অন্য খেলার খেলোয়াড়দের দেয়া হচ্ছে।’
জাতীয় সাঁতারু সামিউল ইসলাম রাফি থাইল্যান্ডে উচ্চ প্রশিক্ষণে ছিলেন। সেখান থেকে তিনি মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে আমন্ত্রণমূলক টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ করে স্বর্ণ ও রৌপ্য পদক জেতেন। যা বাংলাদেশের সাতারের বড় অর্জন কিন্তু জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ পদকপ্রাপ্ত তালিকায় রাফিকে রাখেনি। কারণ হিসেবে দেখিয়েছে তিনি জিও নিয়ে বিদেশ যাননি। অথচ তিনি মেধাবী সাঁতারু এজন্য বিশ্ব সাতারের বৃত্তি পেয়ে থাইল্যান্ড ছিলেন এবং বাংলাদেশ সাতার ফেডারেশনের অনুমোদনক্রমে ঐ দুই টুর্নামেন্টে অংশ নিয়েছিলেন। ২০২৫ সালে যুব হকি দল বিশ্বকাপে খেলেছে। আমিরুল ইসলাম যুব বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার পেয়েছেন। শুধু এই বিশ্বকাপেই নয়, যুব বিশ্বকাপের ইতিহাসে তার চেয়ে বেশি কেউ গোল করতে পারেনি। এরপরও হকি নেই এই তালিকায়। অনুপস্থিতির কারণ হিসেবে জানা গেছে, শুধুমাত্র সিনিয়র দল বা সিনিয়র প্রতিযোগিতা গণ্য করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী ক্রীড়াবিদদের কার্ড হস্তান্তর। আপাতত এটি শুধু ক্রীড়াবিদ হিসেবে পরিচয়পত্র হিসেবে কাজ করলেও আগামীতে সামাজিক সুবিধা প্রদানের পরিকল্পনা রয়েছে। স্টেডিয়ামে খেলা দেখা, ট্রেন, হাসপাতাল কিংবা সেবামূলক খাতে যেন খেলোয়াড়রা অগ্রাধিকার পান এই কার্ডের মাধ্যমে সেটা চেষ্টা করবে ক্রীড়া মন্ত্রণালয়।
যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক। ফুটবলার হলেও তিনি ক্রিকেট নিয়ে বেশি মন্তব্য করেছেন। এ নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে খানিকটা সমালোচনাও হয়েছে। এ নিয়ে আজ ক্রীড়া মন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের কাছে সকল খেলা সমান এবং সকল খেলার একই গুরুত্ব। ক্রিকেট যেমন আমাদের খেলা, ফুটবল, হকি, আরচ্যারিও আমাদের খেলা। সকল খেলার খেলোয়াড়দেরই আমরা সমান মর্যাদা দিচ্ছি। ক্রীড়া ভাতায় সকল খেলোয়াড় সমান অর্থ পাবেন।’
বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন ক্রীড়াবিদদেরও গুরুত্ব দিয়েছে বর্তমান সরকার। প্যারা গেমসে পদক পাওয়া ক্রীড়াবিদরাও ৩০ মার্চ পুরস্কার পাবেন। এ নিয়ে তিনি বলেন, ‘প্যারা গেমসে আমাদের অনেক অর্জন। তাদেরকেও আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি। তারাও ভাতার আওতায় আসবে।’ অনেক ফেডারেশন অনেক সময় ভুল তথ্য দেয়। বিশেষ করে আর্থিক বিষয়ে তালিকা প্রণয়নে অনেক অনিয়মের অভিযোগও শোনা যায়। খেলোয়াড় তালিকার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘কয়েক স্তর যাচাই বাছাই করে তালিকা করা হয়েছে। প্রতি চার মাস পর পর এটা মূল্যায়ন হবে।’
ক্রীড়া ভাতা ও কার্ডের পাশাপাশি সরকার তৃণমূলের কর্মকান্ডের জন্য নতুন কুড়ি স্পোর্টস চালু করছে। যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘এপ্রিলে শেষের দিকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নতুন কুড়ি স্পোর্টস এক যোগে ৬৪ জেলায় উদ্বোধন করবেন আশা রাখি। এরপর আমরা ইউনিয়ন পর্যায়ে যাব। নতুন কুড়ি স্পোর্টসের মাধ্যমে মেধাবীরাও আর্থিক ভাতার আওতায় আসবে। আমরা আঞ্চলিক বিকেএসপিগুলোকেও উন্নত করছি। যেন সেখানেও ভালো মানের সুযোগ-সুবিধা থাকে।’
ক্রীড়াঙ্গনের অন্যতম বড় সমস্যা আর্থিক সীমাবদ্ধতা। অনেক ফেডারেশন নিয়মিত জাতীয় প্রতিযোগিতা আয়োজন কিংবা দল বিদেশে পাঠাতে পারে না আর্থিক কারণে। সেই সমস্যা নিরসনে কাজ করছেন বলে জানান ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী, ‘যখন খেলোয়াড় ছিলাম তখন আপনাদের মাধ্যমেই নানা সমস্যার কথা বলেছি। এখন দায়িত্বশীল জায়গায় রয়েছি, চেষ্টা করছি অনকে সমস্যা সমাধানের। আমাদেরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ইতোমধ্যে আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলেছি। ফেডারেশনগুলোকে আর্থিক সহায়তা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি সুস্থ ক্রীড়া পরিবেশ গড়ে তুলতে মাঠ দখলমুক্তের কাজও চলছে।’