তামিম ইকবালকে নিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পরিচালক এম নাজমুল ইসলামের বিতর্কিত মন্তব্য ঘিরে সৃষ্ট অচলাবস্থা আরও ঘনীভূত হয়েছে কোয়াবের দুপুরের সংবাদ সম্মেলনের পর। ক্রিকেটার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (কোয়াব) সভাপতি মোহাম্মদ মিঠুন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, দাবি পূরণ না হলে ক্রিকেটাররা মাঠে নামবেন না, এবং এই অবস্থান থেকে তারা একচুলও সরে আসছেন না। বৃহস্পতিবার দুপুরে বনানীর একটি হোটেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে মিঠুন বলেন, ক্রিকেটাররা খেলতে চায়, কিন্তু সম্মান ও ন্যূনতম সীমার প্রশ্নে কোনো আপস সম্ভব নয়। তার ভাষায়, তারা খেলার বিপক্ষে নন, তবে সবকিছুরই একটি সীমা রয়েছে, আর সেই সীমা বহু আগেই অতিক্রম করা হয়েছে।

এই ইস্যু কেবল একজন ক্রিকেটার বা একটি সংগঠনের নয়, বরং পুরো ক্রিকেট অঙ্গনের সম্মান ও মর্যাদার প্রশ্ন বলে জানান মিঠুন। তার মতে, বিসিবি পরিচালকের বক্তব্যে ক্রিকেটের প্রতিটি স্তরকেই অবমূল্যায়ন করা হয়েছে। এমনকি আইসিসি ট্রফি জয় থেকে শুরু করে বিশ্বকাপের গুরুত্বও কার্যত অস্বীকার করা হয়েছে বলেই মনে করছেন তিনি। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, সংশ্লিষ্ট পরিচালকের কথাবার্তায় ক্রিকেটের প্রতি বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধা তারা দেখতে পাননি। মিঠুন বলেন, ‘আমার এখনও ওই স্ট্যান্ডেই আছি। যেটা সোহান বলেছে আমরা খেলার বিপক্ষে না। সবকিছুর একটা লিমিট আছে। লিমিট ক্রস করে গেলে... এখানে এটা শুধু আমার না এখানে টোটাল ক্রিকেট অঙ্গনকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। সবাইকে অপমান করা হয়েছে। উনি আইসিসি ট্রফি জেতা থেকে শুরু করে প্রতিটি সেক্টরকে অস্বীকার করেছে।’ ‘উনার কাছে বিশ্বকাপও কোনো মানে রাখে না। উনার কোনো কথাতে ক্রিকেটের প্রতি শ্রদ্ধা বিন্দু মাত্র দেখিনি। আমার আগের অবস্থানেই অনড় আছি। আমার বিভিন্নভাবে বোর্ডের সঙ্গে আলোচনা করেছি। উনারা আমাদের খেলার জন্য এপ্রোচ করছেন, আমরা অবশ্যই খেলতে চাই, তবে আমাদের দাবিগুলো মানার পরে,’ যোগ করেন তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে কোয়াব সভাপতি জানান, বোর্ডের সঙ্গে তারা বারবার আলোচনার চেষ্টা করেছেন। বিসিবির পক্ষ থেকে খেলা চালু রাখার জন্য যোগাযোগ করা হলেও, ক্রিকেটাররা পরিষ্কার করে জানিয়ে দিয়েছেন, দাবিগুলো মানা না হলে মাঠে ফেরার প্রশ্নই ওঠে না। তিনি অভিযোগ করেন, অতীতের মতো এবারও বোর্ড সময় নেওয়ার কৌশল নিচ্ছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো কার্যকর সমাধান আসছে না। মিঠুনের ভাষায়, ‘উনারা দাবি না মেনে আগের ৮-১০টা টপিকসের মতো টাইম নিয়েছে, তারপর সেটার হদিস নাই। এখনও সেই কাজটাই করতে চাইছে। আপনারা আজকের স্ট্যান্ড দেখছেন। কিন্তু আমাদের এই স্ট্যান্ড আজকের না, এটা আসলে অনেক দিনের অবজারভেশন।’

তাদের মতে, এই অবস্থান হঠাৎ করে নেওয়া হয়নি। এটি কোনো এক দিনের প্রতিক্রিয়াও নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে ক্রিকেটারদের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ থেকেই এই সিদ্ধান্ত এসেছে। শুরুতে তারা চেয়েছিলেন বিষয়টি নীরবে, সম্মানের সঙ্গে এবং ক্লোজ ডোর আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে। কারণ বিসিবিতে অনেক সাবেক ক্রিকেটার ও ক্রিকেট ব্যাকগ্রাউন্ডের মানুষ রয়েছেন, যাদের সম্মান অক্ষুণ্ন রাখাটাও তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।‘আমরাও চেয়েছিলাম বিসিবিতে যে পরিচালকগুলো আছেন, সবাইকে সম্মান দিয়ে কীভাবে ক্লোজ ডোরে কীভাবে আলোচনা করতে পারি। কারণ ঐখানে আমাদের ক্রিকেটিং ব্যাকগ্রাউন্ডের অনেক মানুষ। অনেক ক্রিকেট প্লেয়ার আছে। আমরা চাইনা ক্রিকেট প্লেয়ারগুলো অসম্মানিত হোক। উনাদের কথা চিন্তা করে আমরা চেয়েছিলাম, সবকিছু যেন সাইলেন্টলি, সুন্দরভাবে রান করে। কিন্তু আপনারাও দেখতে পাচ্ছেন এই ধরণের কিছুই হচ্ছে না। শেষ পর্যন্ত আমাদের আসলেই কোনো ওয়ে নাই। বিসিবি থেকে যদি সুষ্ঠু সমাধান হয়, তাহলে অবশ্যই আমরা মাঠে নামব,’ বলেন মিঠুন।

তবে পরিস্থিতি যেভাবে গড়িয়েছে, তাতে আর কোনো বিকল্প পথ খোলা নেই বলেই মন্তব্য করেন কোয়াব সভাপতি। তার মতে, ক্রিকেটাররা কখনোই চান না খেলোয়াড়দের অপমানিত হতে দেখা যাক, কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় প্রকাশ্যে কঠোর অবস্থান নেওয়া ছাড়া তাদের আর কোনো উপায় নেই। শেষ পর্যন্ত মিঠুন আবারও পরিষ্কার করে দেন, বল এখন বিসিবির কোর্টেই। বিসিবি যদি একটি সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও সম্মানজনক সমাধান দিতে পারে, তাহলে ক্রিকেটাররা অবশ্যই মাঠে নামবেন। কিন্তু তার আগে কোনো খেলা নয়, এই সিদ্ধান্তেই তারা অনড়।

এদিকে যার বিপক্ষে ক্রিকেটাররা সোচ্চার, তাকে বোর্ড পরিচালক পদ থেকে অব্যাহতি না দিলেও তার বিপক্ষে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছে বিসিবি। প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে শোকজ করা হয়েছে নাজমুল ইসলামকে। পাশাপাশি তাকে বিসিবির অর্থ কমিটি থেকেও অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। কিন্তু জানা গেছে এতেও সন্তুষ্ট নয় ক্রিকেটারদের সংগঠন কোয়াব। তাদের একটাই দাবি, নাজমুল ইসলামকে পদত্যাগ করতে হবে। অন্যথায় তাকে পদচ্যুত করতে হবে।কিন্তু বিসিবির গঠনতন্ত্রেই কিছু বিশেষ কারণ ছাড়া কোনো পরিচালককে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়ে পদ থেকে অব্যাহতি দেয়ার নিয়ম নেই। তাই বিসিবি আসলে শোকজ এবং অর্থ কমিটির প্রধান পদ থেকে সরিয়ে দেয়ার পাশাপাশি নাজমুলের সব কর্মকাণ্ড বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে।কিন্তু তাতেও পরিস্থিতির ইতিবাচক সমাধানের কোনই লক্ষণ নেই। ক্রিকেটারদের আন্দোলন-দাবির মুখে সবকিছু চরম অনিশ্চয়তায়। এরকম অবস্থায় বিসিবিই বাধ্য হয়েই বিপিএল এর খেলা স্থগিত করেছে বিসিবি।

এর মধ্যে বিসিবি ও বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিলের দায়িত্বশীল এক কর্তা জানিয়েছেন, ক্রিকেটাররা আরও একটি আল্টিমেটাম দিয়েছে। যদি নাজমুল ইস্যুতে বিপিএল সত্যিই বন্ধ করে দেয়া হয়, তাহলে ক্রিকেটার, কোচ, সাপোর্টিং স্টাফসহ সংশ্লিষ্ট সবার পেমেন্ট বিসিবিকে দিতে হবে। যার পরিমাণ প্রায় ৪০ কোটি টাকা।বিসিবির এক শীর্ষ কর্তা এমনও জানিয়েছেন যে, কোয়াব সভাপতি মোহাম্মদ মিঠুন তাকে বলেছেন, ‘আমরা হয়তো মাঠে ফিরে আসতাম। ৪৮ ঘণ্টা অপেক্ষা করতাম। কিন্তু সে অবস্থা তৈরি হয়নি। এখন যে ‘হযবরল’ অবস্থার উদ্রেক ঘটেছে, তাতে বিপিএল এই জায়গায় এসে বন্ধ হয়ে গেলে সে দায় বিসিবি ও বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিলকে বহন করতে হবে। সব পেমেন্ট বিসিবিকেই পরিশোধ করতে হবে।’