এবারের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের বাংলাদেশ দল ঘোষণার আগে অন্যবারের তুলনায় বেশ স্বস্তিতে ছিলেন নির্বাচকরা। দল নিয়ে খুব বেশি বিতর্কেরও অবকাশ ছিল না। গত এক-দেড় বছর জাতীয় দলে নিয়মিত খেলা ক্রিকেটাররাই ডাক পেয়েছেন বিশ্বকাপের স্কোয়াডে। কিন্তু বিশ্বকাপ যত ঘনিয়ে আসছে শঙ্কা বাড়ছে ততই। ভারতের মাটিতে বিশ্বকাপ খেলতে যাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তার পাশাপাশি বিশ্বকাপ স্কোয়াডে থাকা ক্রিকেটারদের ফর্মও সমর্থকদের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ বাড়াচ্ছে। বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের ১২তম আসরের সিলেট পর্বে সবচেয়ে হতাশাজনক পারফরম্যান্স কার? তালিকা করলে একদম ওপরের দিকেই থাকবেন সাইফ হাসান, লিটন দাস আর তানজিদ তামিম। রান করতেই পারছেন না তারা। পারছেন না দলের প্রত্যাশার ছিটেফোঁটাও পূরণ করতে। অথচ আসন্ন বিশ্বকাপে বাংলাদেশের টপ অর্ডার সামলানোর গুরুভার এই তিনজনের ওপরেই। শঙ্কায় দুরুদুরু বুক না কেঁপে উপায় আছে!
গত বছর জাতীয় দলে ফেরার পর থেকেই দারুণ পারফরম্যান্স করেছেন সাইফ হাসান। যার পুরস্কারস্বরূপ টি-টোয়েন্টি দলের সহঅধিনায়কও হয়েছেন। এমন দারুণ ফর্মের সাইফকে দলে ভিড়িয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলছিল ঢাকা ক্যাপিটালস। কিন্তু বিপিএলে তিনি আছেন রান সংগ্রাহকের তালিকায় ৪৫ নম্বরে! সাইফ কতটা বাজে ফর্মে আছেন তার আন্দাজ পাওয়া যায় পরিসংখ্যানেই। ৬ ম্যাচে ৬৫টি বল মোকাবেলা করে করেছেন মোটে ৪৮ রান, গড় মাত্র ৮ আর স্ট্রাইকরেট ৭৪ এরও কম। সর্বোচ্চ রানের ইনিংসটা ২২ রানের।গত বছর আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক তানজিদ হাসান তামিমের অবস্থাও খারাপ। রাজশাহী ওয়ারিয়র্সের এই ওপেনার ৭ ম্যাচে মোটে ১২.৮৫ গড়ে করেছেন ৯০ রান, স্ট্রাইকরেট মাত্র ১০২.২৭! সর্বোচ্চ রানের ইনিংসটি ২৯ রানের। জাতীয় দলের তারকা না হলে সাইফ ও তানজিদ হয়ত নিজ নিজ দলের একাদশেও জায়গা হারাতেন এমন পারফরম্যান্সের জন্য। এবার অধিনায়ক লিটন দাসের দিকে নজর ফেরানো যাক। জাতীয় দলের হয়ে গত বছরটা ভালোই কাটিয়েছেন টাইগার দলপতি লিটন। কিন্তু রংপুর রাইডার্সের হয়ে বিপিএলে নিজেকে হারিয়ে খুঁজছেন তিনি। ৭ ইনিংসে ২০ গড়ে করেছেন ১৪০ রান, স্ট্রাইকরেট ১২৯.৬২। সর্বোচ্চ ইনিংস ৪৭।
বিশ্বকাপ স্কোয়াডে থাকা টপ অর্ডারের তিন অটো চয়েজের এমন পারফরম্যান্স নিশ্চিতভাবেই দুশ্চিন্তায়। বিশ্বকাপেও যদি তাদের এই অফফর্ম বজায় থাকে তবে বাংলাদেশ যে বিশ্বকাপে বড়সড় বিপদে পড়তে যাচ্ছে তা বলাই বাহুল্য। আর এখানেই প্রশ্ন উঠছে-বিপিএলের পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে কি বিশ্বকাপ দলে কোনো পরিবর্তন আসতে পারে?
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচ মাঠে গড়াবে আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি। তার আগে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত কোনো কারণ না দেখিয়েই স্কোয়াডে পরিবর্তন আনার সুযোগ আছে। আর বিপিএলের ফাইনাল মাঠে গড়াবে ২৩ জানুয়ারি। অর্থাৎ বিপিএল শেষেও বিসিবি চাইলে বিশ্বকাপ স্কোয়াডে পরিবর্তন আনতে পারবে। সেক্ষেত্রে টপ অর্ডারে শক্তি বাড়াতে সাবেক অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তর দিকে নজর দিতেও পারেন নির্বাচকরা। এবারের বিপিএলে ব্যাট হাতে দারুণ ছন্দে আছেন গত বিশ্বকাপে টাইগারদের নেতৃত্ব দেয়া শান্ত। রান সংগ্রাহকের তালিকায় সবার ওপরে তার নাম। এখন পর্যন্ত ৭ ম্যাচ খেলে রাজশাহী ওয়ারিয়র্সের এই অধিনায়ক ৪৭.৮৩ গড়ে করেছেন ২৮৭ রান, স্ট্রাইকরেট ১৪৮.৮৩। এখন পর্যন্ত আসরের একমাত্র সেঞ্চুরি করা শান্ত একটা অর্ধশতকও করেছেন। স্বাভাবিকভাবেই বাকিদের অফফর্ম বিবেচনায় বিশ্বকাপ দলে ফেরার শক্ত দাবিদার তিনি।
জাতীয় দলে বরাবর হতাশ করলেও ঘরোয়া ক্রিকেটের পরীক্ষিত মুখ মোহাম্মদ নাঈম শেখকে রেকর্ড মূল্যে এবারের বিপিএলে দলে ভিড়িয়েছে চট্টগ্রাম রয়্যালস। ব্যাট হাতে বেশ ভালো ফর্মে আছেন তিনিও। ৭ ম্যাচে ৩২.৮৩ গড়ে ১৯৭ রান করেছেন এই বাঁহাতি, স্ট্রাইকরেট ১৩৫.৮৬। নাঈমের নামের পাশে আছে দুটি অর্ধশতকও। কিন্তু জাতীয় দলে অতীত অভিজ্ঞতার কারনে তাকে ফেরানোর সম্ভাবনা কমই বলা যায়।বিপিএলের পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে বিশ্বকাপের স্কোয়াড নিয়ে নতুন করে চিন্তাভাবনার সুযোগ তৈরি হয়েছে বেশ কয়েকটি কারণে। রংপুর রাইডার্সের হয়ে নুরুল হাসান সোহানের বাজে ফর্ম এবং সিলেট টাইটান্সের জার্সিতে উইকেটকিপার ও মিডল অর্ডার ব্যাটারের ভূমিকায় পারভেজ হোসেন ইমনের পারফরম্যান্স যার অন্যতম। এছাড়া ফিনিশার হিসেবে ঢাকার হয়ে শামীম হোসেন পাটোয়ারি ও সাইফউদ্দিন খেলছেন দারুণ।
রংপুরের অধিনায়ক সোহান এবারের বিপিএলে এখন পর্যন্ত ৫ ইনিংসে ব্যাট করেছেন, যার তিনটিতে ছিলেন অপরাজিত। কিন্তু ২২ বল মোকাবেলা করে করেছেন ২১ রান। সর্বোচ্চ ইনিংস মাত্র ৭ রানের! বাউন্ডারিও মারতে পেরেছেন মাত্র একটা। বলাই যায় সোহান এখন পর্যন্ত পুরোপুরি ব্যর্থ। বিশ্বকাপ স্কোয়াডে থাকা শামীম-সাইফদের পারফরম্যান্স এবং বোলিং অপশন হিসেবে কার্যকর হওয়ায় একাদশে সুযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রে তারাই সোহানের চেয়ে বড় দাবিদার।
তবে সোহানের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছেন ইমন। চলমান বিপিএলে মিডল অর্ডারে ইমন রান পাওয়ায় টাইগারদের মিডল অর্ডার নিয়ে দুশ্চিন্তার সমাধান হয়ে উঠতে পারেন তিনি। ৮ ইনিংসে ৩৩.৭১ গড়ে ২৩৬ রান করে ইমন রান সংগ্রাহকের তালিকায় তিন নম্বরে আছেন। ১৩১.৭১ স্ট্রাইকরেটকে মন্দও বলা যায় না। সেই সঙ্গে উইকেট কিপারের ভূমিকায়ও দারুণ করছেন। ৯ ইনিংসে ৬টি ক্যাচ নেয়ার পাশাপাশি স্ট্যাম্পিং করেছেন একটি।
অর্থাৎ লিটনের ব্যাকআপ উইকেটকিপার হিসেবে বিবেচনা করা যায় তাকেও। যা স্কোয়াডে সোহানের গুরুত্ব আরও সীমিত করে তুলেছে। পরিস্থিতি বলছে টপ অর্ডারের ফর্মহীনতা যেমন বিশ্বকাপ স্কোয়াডে একজন অতিরিক্ত ব্যাটারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলছে, তেমনি ইমনের নতুন ভূমিকা আর শামীম-সাইফউদ্দিনের পারফরম্যান্স লোয়ার মিডল অর্ডারে ব্যাটিং গভীরতার কথাও জানান দিচ্ছে। সেই ক্ষেত্রে স্কোয়াডে পরিবর্তনের কথা ভাবতেই পারে টিম ম্যানেজমেন্ট।