পাওয়ার হিটিংয়ে আলোচিত নাম এখন হাবিবুর রহমান সোহান। জাতীয় দলে এখনো অভিষেক না হলেও বিভিন্ন টুর্নামেন্টে ৩৩টি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলেছেন হাবিবুর। ত্রিশের ওপর গড় রেখে প্রায় ১৬০ স্ট্রাইকরেটে ব্যাট করে তিনি ১টি সেঞ্চুরির পাশাপাশি হাঁকিয়েছেন ৪টি ফিফটি। তবে তিনি নজর কেড়েছেন কিছুদিন আগে শেষ হওয়া রাইজিং স্টারস এশিয়া কাপে। বাংলাদেশকে ফাইনালে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন এই ওপেনার। গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচে হংকং জাতীয় দলের বিপক্ষে হাঁকিয়েছিলেন স্বীকৃত টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশিদের মধ্যে দ্রুততম সেঞ্চুরি। মাত্র ৩৫ বলে সেঞ্চুরি করে অপরাজিত থাকেন হাবিবুর। স্বীকৃত পর্যায়ের ক্রিকেটে এটি বাংলাদেশের হয়ে দ্রুততম সেঞ্চুরির রেকর্ড। বঙ্গবন্ধু টি-টোয়েন্টিতে পারভেজ হোসেন ইমনের ৪২ বলে সেঞ্চুরি ছিলো আগের দ্রুততম। স্বাভাবিকভাবেই বিপিএলের নিলামে সোহানকে নিয়ে বেশ কাড়াকাড়ি হওয়ার কথাই ছিল। কিন্তু নিলামে তার নাম ‘ডি’ ক্যাটাগরিতে থাকায় অবাক হয়েছিলেন অনেকেই। তবে নিলামে বেশ চমক দেখিয়েছেন এই হার্ডহিটার ওপেনার। নিলামে হাবিবুরের ভিত্তিমূল্য ছিল ১৮ লাখ টাকা। কিন্তু তাকে দলে ভেড়াতে ৫০ লাখ টাকা খরচ করতে হয়েছে বিপিএলের নবাগত দল নোয়াখালী এক্সপ্রেসকে। প্রথমবারের মতো বিপিএলে অংশ নিতে যাওয়া নোয়াখালী এক্সপ্রেস নিলাম থেকে ৫০ লাখ টাকা দিয়ে দলে টেনেছে 'এ' দলে খেলা সোহানকে। বড় অঙ্কের টাকায় এই হার্ডহিটার ওপেনারকে দলে নিয়ে কোনো ভুল করেনি বলে মনে করেন নোয়াখালী এক্সপ্রেসের কোচ খালেদ মাহমুদ সুজন। জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক ও অভিজ্ঞ কোচ সুজন জানান, নিলামের আগেই সোহানকে দলে নেয়ার লক্ষ্য ঠিক করেছিল ফ্র্যাঞ্চাইজিটি। কারন রাইজিং স্টারস এশিয়া কাপে সোহান সেঞ্চুরি হাঁকিয়েই বিপিএলে হটকেকে পরিণত হওয়াটা নিশ্চিত করেছিলেন। এরপর পুরো আসরেই তার ব্যাটে রান পেয়েছে। আর এই বিষয়টাই তাকে দলে নিতে আগ্রহী করেছে নোয়াখালী এক্সপ্রেসকে। এছাড়া কোচ খালেদ মাহমুদ সুজনেরও দাবি ছিলো সোহানকে নিয়েই। তাই তো শেষ পর্যন্ত তার দাম উঠলো আকাশে। ৫০ লাখে সোহান নোয়াখালীতে। সোহানকে নিয়ের কোচ সুজন বলেন, 'সোহানকে আমি ছোটবেলা থেকে চিনি, আম জানি ওর মধ্যে অ্যাবিলিটি আছে। ঢাকার (আগের বিপিএলে) একটা ম্যাচে ও সাত নম্বরে নেমে একটা অবিশ্বাস্য ম্যাচ জিতিয়েছিল। আমি জানি ওর যোগ্যতা আছে। অ্যাবিলিটি অনেক ছেলের মধ্যেই আছে, কিন্তু ও যেমন ভয়ডরহীন, ওর ক্রিকেট হলো ওয়ান ওয়ে, ও জানে শুধু মারতে। তো আমি এটাকে এনকারেজ করব। আমি আশা করি, ও ওইরকম কিছু ইনিংসই খেলবে যেন আমাদের অন্যান্য ব্যাটারের জন্য ব্যাট করাটা সহজ হয়ে যায়। ম্যাচ জেতাও সহজ হয়।'

রাইজিং স্টারস এশিয়া কাপে প্রথম সুযোগ পেয়েই নিজেকে চেনালেন সোহান। রেকর্ডময় সেঞ্চুরিতে ভেঙেছেন দুই রেকর্ড। তার বিধ্বংসী রূপে রাইজিং স্টার এশিয়া কাপে হংকংকে উড়িয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ 'এ' দল। কাতারের দোহায় ১৬৮ রানের লক্ষ্য সোহান ঝড়ে মাত্র ১১ ওভারেই তুলে নিয়েছে বাংলাদেশ। জিতেছে ৮ উইকেটে। মাত্র ৩৫ বলে সেঞ্চুরি করে অপরাজিত থাকেন সোহান। এটি স্বীকৃত পর্যায়ের ক্রিকেটে এটি বাংলাদেশের হয়ে দ্রুততম সেঞ্চুরির রেকর্ড। বঙ্গবন্ধু টি-টোয়েন্টিতে পারভেজ হোসেন ইমনের ৪২ বলে সেঞ্চুরি ছিলো আগের দ্রুততম। এর আগে দ্রুততম ফিফটির রেকর্ডও গড়েন তিনি। এতে ভাঙেন শুভাগত হোমের ১৬ বলে ফিফটির রেকর্ড। শুভাগত ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ টি-টোয়েন্টিতে শাইনপুকুরের হয়ে ১৬ বলে ফিফটি করেছিলেন ২০১৯ সালে। মাত্র ১৩ বলে ৬ ছক্কায় অপরাজিত ৪১ রান করেন। হংকংয়ের দেয়া লক্ষ্য তাড়ায় জিসানকে এক পাশে রেখে চার-ছয়ের ঝড়ে উত্তাল হয়ে উঠে সোহানের ব্যাট। ওপেনিং জুটিতে ৬.৩ ওভারে চলে আসে ১১১ রান, যাতে কেবল ২০ অবদান ছিল জিসানের। ৮ চারের পাশাপাশি ডানহাতি ব্যাটার মারেন ১০ ছক্কা। এদিন ব্যাট করার জন্য ভীষণ ভালো উইকেটে আগে বোলিং বেছে দারুণ চাপ তৈরি করে আকবর আলির দল।

সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের প্রত্যন্ত গ্রামের ছেলে হাবিবুর রহমান সোহান। অবশ্য সম্মান পাওয়ার লোভ থেকেই ক্রিকেট খেলা শুরু করেছিলেন সোহান। এলাকায় টেপ টেনিস খেলে নাম হওয়ার সঙ্গে রোজগারেরও একটা পথ হয়ে গিয়েছিল তার। এরপর ঢাকায় এসে ক্রিকেট একাডেমিতে ভর্তি হয়েছিলেন। খেলেছেন করপোরেট ক্রিকেট লিগ। ২০২২ সালে ঢাকা প্রথম বিভাগ লিগে বাজিমাত করার পর বিপিএল, ঢাকা প্রিমিয়ার লিগেও অভিষেক হয় ২০২৩ সালে। সম্প্রতি এশিয়া কাপ রাইজিং স্টারস টি২০ টুর্নামেন্টে হংকংয়ের বিরুদ্ধে দেশের দ্রুততম সেঞ্চুরি করে পরিচিতি লাভ করেন। এবার এশিয়া কাপে ভালো খেলার পুরস্কার পেলেন বিপিএলে। ৫০ লাখ টাকায় তাঁকে দলে নেয় নোয়াখালী এক্সপ্রেস। সোহান বলেন, আমি লম্বা সময় টেপ টেনিস খেলতাম। অনেক জেলায় গিয়ে খেলেছি। সেখান থেকে ধানমন্ডি স্পোর্টস ক্লাবে প্র্যাকটিস করেছি। ওই সময় তিন বছর করপোরেট লিগে খেলেছি। ওখান থেকে আমার একটা বড় ভাই হুসনে আবেদ মেহেদী ঢাকার প্রথম বিভাগ লিগে দল খুঁজে দেন। সুযোগ পেয়ে টি২০ তে চার ম্যাচে আড়াইশ রান করি। ওয়ানডেতে করেছিলাম ৪৫৪ রান।

মেহেদী ভাই গাজী গ্রুপে ক্রিকেটার্সে প্রিমিয়ার লিগে খেলার সুযোগ করে দেন। ২০২৩ সালে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে খেলার পরই এখানে আসা। গত বছর খেলেছি ধানমন্ডি স্পোর্টিং ক্লাবে। প্রিমিয়ার লিগে খেলার আগেই আমার বিপিএলে অভিষেক হয়। খুলনা টাইটান্সে খেলেছি দুই বার। গত বিপিএলে খেলেছি ঢাকায়। এছাড়া সিরাজগঞ্জ, পাবনা, বগুড়াতে খেলেছি। যেখানে সুযোগ পেয়েছি সেখানেই খেলতে গেছি। খেলতে ভালো লাগত এবং টাকাও পেতাম।

সোহান বলেন, এশিয়া কাপ আমাকে পরিচিতি দিয়েছে। এখন অনেকেই চেনেন জানেন। আগে তো দেশের হয়ে খেলিনি, ওইরকম পারর্ফমও করিনি। প্রথমবার সুযোগ পেয়ে ভালো করতে পেরে খুশি। একটা সময়ে আমাদের খুব একটা সম্মান ছিল না। কারণ আমার বাবা ছিলেন রাজমিস্ত্রী। পাঁচ-সাত বছর আগে যখন ক্রিকেট খেলা শুরু করি তখন আমার বাবা মাকে ওইভাবে কেউ গুরুত্ব দিতেন না। এখন আল্লাহর রহমতে সবাই অনেক দাম দেন, সম্মান করেন।