অনূর্ধ্ব-১৯ ওয়ানডে বিশ্বকাপ ক্রিকেট টুর্নামেন্টের পর্দা উঠছে আগামী বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি)। উদ্বোধনী দিনেই ভারত অনূর্ধ্ব ১৯ দল বনাম যুক্তরাষ্ট্র অনূর্ধ্ব-১৯ দলের ম্যাচ দিয়ে পর্দা উঠবে। ১৬ দলের এবারের আসর যৌথভাবে আয়োজন করেছে আফ্রিকার দুই দেশ জিম্বাবুয়ে ও নামিবিয়া। অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের এবারের আসরের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ নিঃসন্দেহে ভারতের ১৪ বছর বয়সী বিস্ময়বালক বৈভব সূর্যবংশী। বয়সভিত্তিক ক্রিকেটে একের পর এক রেকর্ড ভেঙ্গে দেয়া এই তারকা বিশ্বকাপের মঞ্চে কেমন করেন তা দেখতে মুখিয়ে আছে ক্রিকেটবিশ্ব। অনূর্ধ্ব ১৯ বিশ্বকাপে আলো ছড়ানো তারকাদের অনেকেই পরবর্তীতে ক্রিকেট বিশ্বে বড় তারকা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ২০০০ সালে প্রথমবার এই পুরস্কারজয়ী যুবরাজ সিং থেকে শুরু করে, পরবর্তী সময়ে এই তালিকায় যোগ হয়েছেন আইডেন মার্করাম, শুভমান গিলের মতো তারকারা, এমনকি নিউজিল্যান্ডের গ্রেট টিম সাউদির নামও আছে। এই মঞ্চে ভালো করা মানেই ভবিষ্যতের মহাতারকা হয়ে ওঠার শক্ত ইঙ্গিত।
২০২৬ সালের অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপও এর ব্যতিক্রম হবে না। বেশ কয়েকজন খেলোয়াড় এই টুর্নামেন্টে প্রতিভার ঝলক দেখাতে প্রস্তুত, যাদের মধ্যে কেউ কেউ ইতোমধ্যেই বিশ্ব ক্রিকেটে নিজেদের নাম তুলে ধরতে শুরু করেছে। এমন কয়েকজন ক্রিকেটারদের দিকে নজর দেয়া যাক:
ফয়সাল শিনোজোদা (আফগানিস্তান) : সম্প্রতি অনূর্ধ্ব-১৯ এশিয়া কাপে নজর কেড়েছেন ফয়সাল শিনোজাদা। টুর্নামেন্টে তিন ইনিংসে ১৫৫ রান করে, যার মধ্যে বাংলাদেশের বিপক্ষে একটি দুর্দান্ত সেঞ্চুরি ছিল। বাংলাদেশের বিপক্ষে খেলতে তিনি যেন বিশেষভাবে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। ২০২৫ সালের শুরুতেও জুনিয়র টাইগারদের বিপক্ষে তিনি একটি সেঞ্চুরি করেছিলেন। এছাড়া নভেম্বরে ভারতে আফগানিস্তানের সফরে তিনি দুটি অর্ধশতক হাঁকান। ডানহাতি টপ-অর্ডার এই ব্যাটার ওপেনার কিংবা তিন নম্বর-দু’জায়গাতেই বড় ইনিংস খেলার সামর্থ্য দেখিয়েছেন।
অলিভার পিক (অস্ট্রেলিয়া) : অলিভার পিক এই টুর্নামেন্ট জিততে কী লাগে, তা ভালোভাবেই জানেন। দুই বছর আগে সতীর্থের ইনজুরিতে বদলি হিসেবে দলে ডাক পেয়ে তিনি অস্ট্রেলিয়ার শিরোপা জয়ে অবদান রেখেছিলেন। ২০২৪ এর সেই আসরের সেমিফাইনাল ও ফাইনালে তিনি গুরুত্বপূর্ণ রান করেন। এরপর তার ক্যারিয়ার আরও এগিয়েছে- বিগ ব্যাশে প্রথম চুক্তি এবং ভিক্টোরিয়ার হয়ে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক হয়েছে তার। এছাড়া ফেব্রুয়ারিতে শ্রীলঙ্কায় অস্ট্রেলিয়ার টেস্ট সফরে তাকে অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য দলে রাখা হয়, যাতে উপমহাদেশীয় কন্ডিশনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারেন। এবারের অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে তিনি দলের অধিনায়ক হিসেবেই মাঠে নামবেন।
রিজান হোসেন (বাংলাদেশ) : বাংলাদেশের এই ফাস্ট বোলিং অলরাউন্ডার ব্যাট হাতেও বেশ কার্যকর। ইংল্যান্ডের জন্য বেন স্টোকস যেমন প্রভাব ফেলেছেন, তেমনই রিজান হোসেন বাংলাদেশ দলে বড় ভূমিকা রাখতে চান। যদিও অনূর্ধ্ব-১৯ এশিয়া কাপে তিনি তুলনামূলকভাবে কিছুটা ম্লান ছিলেন, তবে বছরের শুরুতে আফগানিস্তানের বিপক্ষে টানা দুটি অর্ধশতক করে নিজের সামর্থ্য দেখান। গ্রীষ্মকালীন সফরে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তিনি দুর্দান্ত এক্টি শতক হাঁকিয়েছিলেন। মিডল-অর্ডারে ব্যাটিং হোক কিংবা প্রথম পরিবর্তন হিসেবে বোলিং-বাংলাদেশের জন্য রিজানের ভূমিকা হবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ফারহান আহমেদ (ইংল্যান্ড) : ইংল্যান্ড জাতীয় দলের খেলোয়াড় রেহান আহমেদের ছোট ভাই ফারহান আহমেদ ইতোমধ্যেই ইংলিশ কাউন্টি ক্রিকেটে রেকর্ড বই নতুন করে লিখেছেন। ২০২৪ সালে মাত্র ১৬ বছর বয়সে নটিংহ্যামশায়ারের হয়ে সিনিয়র ক্রিকেটে অভিষেক হয় তার। কাউন্টি ক্লাবটির ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় তিনি। একই বছর তিনি প্রথম শ্রেণির এক ম্যাচে ১০ উইকেট নিয়ে ১৮৬৫ সাল থেকে ডব্লিউ.জি. গ্রেসের দখলে থাকা সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে ১০ উইকেট শিকারের রেকর্ড ভেঙ্গে দেন।এটি হবে তার দ্বিতীয় অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ। এবার তিনি ইংল্যান্ড দলের অধিনায়ক। দুই বছর আগে তিনি ছিলেন দলের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি।
বৈভব সূর্যবংশী (ভারত) : মাত্র ১৪ বছর বয়সেই বৈভব সূর্যবংশীকে ঘিরে তুমুল আগ্রহ। ক্রিকেট দুনিয়া হয়তো এত কম বয়সে এমন প্রতিভাবান খেলোয়াড় আগে খুব একটা দেখেনি। এই টুর্নামেন্টের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হতে যাচ্ছেন তিনি। মাত্র ১৩ বছর বয়সে ভারতের অনূর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে অভিষেকে সেঞ্চুরি করে নিজেকে ‘সুপারস্টার’ হিসেবে ঘোষণা দেন সূর্যবংশী। এরপর তিনি আইপিএলের ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ চুক্তিবদ্ধ খেলোয়াড় হন এবং মাত্র ৩৫ বলে সেঞ্চুরি হাঁকানÍযা আইপিএলের ইতিহাসে দ্বিতীয় দ্রুততম শতক।আক্রমণাত্মক ব্যাটার সূর্যবংশী সাম্প্রতিক অনূর্ধ্ব-১৯ এশিয়া কাপে ২৬২ রান করেন, যেখানে তার গড় ছিল ৫০-এর বেশি এবং স্ট্রাইক রেট ১৮২। সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিপক্ষে ৯৫ বলে ১৭১ রান করার পথে তিনি যুব ওয়ানডে ক্রিকেটে দ্রুততম সেঞ্চুরির রেকর্ডও ভেঙে দেন।
জাওয়াদ আবরার (বাংলাদেশ) : বয়সভিত্তিক ক্রিকেট তো বটেই বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেটেই দাপট দেখাতে শুরু করেছেন জাওয়াদ আবরার। এই টপ অর্ডার ব্যাটার হতে পারেন দেশের ক্রিকেটের নতুন তারকা। গত বছর মে মাসে শ্রীলঙ্কার মাটিতে ৩ ম্যাচের যুব ওয়ানডে সিরিজেই হাঁকিয়েছিলেন ২টি সেঞ্চুরি। সম্প্রতি অনূর্ধ্ব-১৯ এশিয়া কাপেও আলো ছড়িয়েছেন আবরার। আফগানিস্তানের বিপক্ষে ৯৬ রানের ইনিংস দিয়ে শুরু। এরপর নেপালের বিপক্ষেও অপরাজিত ৭০ শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ৪৯ রান করেন। উইকেটের চারদিকে শট খেলার গুণ ও বড় শট খেলতে পারা আবরারকে বাকিদের চেয়ে আলাদা করে তুলেছে।
অ্যাডাম লেকি (আয়ারল্যান্ড) : ২০২৫ সালের শুরুতে আয়ারল্যান্ডের জিম্বাবুয়ে সফরে অ্যাডাম লেকি ধারাবাহিক দারুণ ব্যাটিং করে দলের ব্যাটিং লাইন-আপের মূল ভিত্তি হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেন। পাঁচ ইনিংসে চারটি অর্ধশতকসহ তিনি করেছিলেন ৩২৩ রান। আফ্রিকার দক্ষিণাঞ্চলে ফিরে এসে ওপেনার লেকি সেই ছন্দ ধরে রাখার চেষ্টা করবেন। ২০২৫-২৬ মৌসুমে ক্রিকেট আয়ারল্যান্ডের ওভারসিজ স্কলারশিপ পাওয়া লেকি, হ্যারি টেক্টর ও অ্যান্ড্রু বালবার্নির পথ অনুসরণ করে অস্ট্রেলিয়ায় র্যান্ডউইক পিটারশামের সঙ্গে সময় কাটিয়েছেন।
আরিয়ান মান (নিউজিল্যান্ড) : উইকেটকিপার-ব্যাটার আরিয়ান মান প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেকেই দারুণ নৈপুণ্য দেখান। নভেম্বরে প্রথম ম্যাচেই তিনি জোড়া অর্ধশতক হাঁকান। জিত রাভালের মতো অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের সঙ্গে নর্দার্ন ডিস্ট্রিক্টসের হয়ে খেলে মান প্রমাণ করেছেন যে সর্বোচ্চ পর্যায়েও নিজেকে মেলে ধরার সামর্থ্য তার আছে। এর আগেও অনূর্ধ্ব-১৯ পর্যায়ে নর্দার্ন ডিস্ট্রিক্টসের হয়ে তিনি দারুণ পারফরম্যান্স দেখিয়েছেন। এবার তিনি নিউজিল্যান্ডকে তাদের প্রথম শিরোপা জিততে সাহায্য করতে চান,এর আগে তাদের সেরা সাফল্য ছিল ১৯৯৮ সালের ফাইনালে ওঠা।
সামির মিনহাস (পাকিস্তান) : অনূর্ধ্ব-১৯ এশিয়া কাপের ফাইনালে বৈভব সূর্যবংশীকেও স্পটলাইটের বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন সামির মিনহাস। টুর্নামেন্ট ফাইনালে রেকর্ড গড়া সেঞ্চুরি করে দলকে দ্বিতীয়বারের মতো চ্যাম্পিয়ন করেছিলেন। ফাইনালে মিনহাস ঝড়ো ১৭২ রান করেন, যা অনূর্ধ্ব-১৯ টুর্নামেন্টের ফাইনালে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংস এবং পাকিস্তান অনূর্ধ্ব-১৯ দলের কোনো ব্যাটারের সর্বোচ্চ স্কোর। পাঁচ ইনিংসে দুইটি সেঞ্চুরি ও একটি অর্ধশতকসহ তিনি সংগ্রহ করেন ৪৭১ রান, যা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রানসংগ্রাহকের চেয়ে প্রায় ২০০ রান বেশি। দুর্দান্ত ফর্ম নিয়েই তিনি বিশ্বকাপে নামছেন।
জোরিচ ভ্যান শাল্কউইক (দক্ষিণ আফ্রিকা) : গ্রীষ্মের শুরুতেই জোরিচ ভ্যান শাল্কউইক দক্ষিণ আফ্রিকার অনূর্ধ্ব-১৯ দলে ২৫ বছরের পুরোনো একটি রেকর্ড ভেঙে দেন, এরপর মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে ভাঙেন বিশ্বরেকর্ড।জুলাইয়ে বাংলাদেশের বিপক্ষে অপরাজিত ১৬৪ রান করে তিনি ২০০০ সালে জ্যাক রুডলফের করা রেকর্ড ছাড়িয়ে যান। তিন দিন পর হারারেতে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ২১৫ রান করে তিনি পুরুষদের যুব ওয়ানডে ক্রিকেটের ইতিহাসে প্রথম ডাবল সেঞ্চুরিয়ান হন। এরপর তিনি প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক করেছেন এবং এখন লক্ষ্য-দেভাল্ড ব্রেভিস ও কিওয়েনা মাফাকার পর টানা তৃতীয় দক্ষিণ আফ্রিকান হিসেবে যুব বিশ্বকাপের প্লেয়ার অব দ্য টুর্নামেন্ট হওয়া।
সেথমিকা সেনেভিরাত্নে (শ্রীলঙ্কা) : অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে শ্রীলঙ্কাকে শেষবার দেখা গেছে ১০ বছর আগে। ২০১৬ সালের সেই শক্তিশালী দলের সাফল্য ছুঁতে বা ছাড়িয়ে যেতে হলে এবার সেথমিকা সেনেভিরাত্নের ভূমিকা হবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডানহাতি মিডিয়াম পেসার সেনেভিরাত্নে ব্যাট হাতেও কার্যকর, তবে বল হাতেই তিনি সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করেন প্রতিপক্ষের। সাম্প্রতিক অনূর্ধ্ব-১৯ এশিয়া কাপে তিনি ৮ উইকেট নেন, যেখানে তার গড় ছিল ১৫.৭৫ এবং ইকোনমি রেট ছিল চার-এর সামান্য বেশি। সেপ্টেম্বর মাসে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরেও তিনি ছিলেন বেশ সফল।
জোনাথন ভ্যান ল্যাঙ্গে (ওয়েস্ট ইন্ডিজ) : বহুমুখী ক্রীড়াবিদ জোনাথন ভ্যান ল্যাঙ্গে ওয়েস্ট ইন্ডিজ অনূর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে দারুণ পারফর্ম করছেন। ক্রিকেটের পাশাপাশি তিনি জাতীয় পর্যায়ের টেবিল টেনিস চ্যাম্পিয়নও। তবুও পরিবারের সেরা ক্রীড়াবিদ হিসেবে পরিচিতি পেতে তার আরও পথ পাড়ি দিতে হবে, কারণ তার বড় বোন লন্ডন ২০১২ অলিম্পিকে গায়ানার হয়ে নারী ১০০ মিটার ফ্রিস্টাইল সাঁতারে অংশ নিয়েছিলেন। অধিনায়ক জশুয়া ডর্নের সঙ্গে ভ্যান ল্যাঙ্গে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ব্যাটিং লাইন-আপের অন্যতম প্রধান ভরসা হবেন।
কিয়ান ব্লিগনট (জিম্বাবুয়ে) : জিম্বাবুয়ের ক্রিকেট মহলে অত্যন্ত পরিচিত যমজ ভাইদের একজন কিয়ান ব্লিগনট। বিখ্যাত জিম্বাবুইয়ান ক্রিকেটার অ্যান্ডি ব্লিগনটের ছেলে তিনি। তিনি ও তার ভাই মাইকেল বাবা অ্যান্ডির ছায়া থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করবেন। টপ-অর্ডার ব্যাটার কিয়ান লেগ স্পিনও করতে পারেন। গত এপ্রিলে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে জিম্বাবুয়ে ‘এ’ দলের হয়ে ৪৭ রান করে তিনি নজর কাড়েন। নভেম্বরে জিম্বাবুয়ে অনূর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে ঘরোয়া ফ্র্যাঞ্চাইজি রাইনোসের বিপক্ষে তিনি একটি দুর্দান্ত সেঞ্চুরি হাঁকান। দুই উইকেটের সেই জয়ে তিনি অপরাজিত থাকেন ১১০ রানে, যেখানে তার ভাইয়ের সঙ্গে গড়ে ওঠে একটি শতরানের জুটি।