এএফ বক্সিং প্রোমোশন ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডকে দেওয়া জাতীয় স্টেডিয়ামের বরাদ্দ আপাতত স্থগিত করেছে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি)। ল্যাটিন-বাংলা সুপার কাপ আয়োজনে চূড়ান্ত অব্যবস্থাপনা, সাংবাদিকদের ওপর হামলা এবং টিকিট, স্পন্সরশিপ ও সম্প্রচার স্বত্ব থেকে আয়ের নির্ধারিত অংশ দিতে ব্যর্থ হওয়ার পর মঙ্গলবার এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। টুর্নামেন্টের তিনটি ম্যাচের জন্য কোম্পানিটিকে শর্তসাপেক্ষে স্টেডিয়াম বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল। ইতোমধ্যে ৫ ও ৮ ডিসেম্বর দুটি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছে। আগামী ১১ ডিসেম্বর আরেকটি ম্যাচ আয়োজনের সূচি রয়েছে। ল্যাটিন-বাংলা সুপার কাপে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের একটি করে ক্লাব এবং বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফ) একাডেমির খেলোয়াড়দের নিয়ে গঠিত একটি যুব দল অংশ নিয়েছে। গত ৫ ডিসেম্বর হওয়া প্রথম ম্যাচে দর্শকদের হাঙ্গামার ঘটনা দেখা যায়। তবে সোমবার দ্বিতীয় ম্যাচের সময় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। টুর্নামেন্টের আয়োজকদের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা স্টেডিয়ামের বাইরে বেশ কয়েকজন সাংবাদিকের ওপর হামলা করে, বৈধ টিকিট থাকা সত্ত্বেও অনেক দর্শককে ঢুকতে দেয়া হয়নি। সহকারী পরিচালক (ক্রীড়া) মো. রুহুল আমিন স্বাক্ষরিত একটি বিজ্ঞপ্তিতে এনএসসি জানিয়েছে, ‘ল্যাটিন-বাংলা সুপার কাপ ২০২৫ ফুটবল প্রতিযোগিতা আয়োজনের লক্ষ্যে ৫, ৮ ও ১১ ডিসেম্বর মোট তিন দিন এএফ বক্সিং প্রোমোশন ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের অনুকূলে শর্তসাপেক্ষে জাতীয় স্টেডিয়াম বরাদ্দ দেওয়া হয়। প্রদত্ত শর্তসমূহের মধ্যে টিকিট বিক্রির পূর্ণাঙ্গ হিসাব সহকারে মোট টিকিট বিক্রির ৫০% অর্থ প্রতিটি ম্যাচ শুরুর পূর্বে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের অনুকূলে জমা প্রদান এবং খেলার পর নিজ দায়িত্বে স্থাপনা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা, এ দুটি শর্ত ইতোমধ্যে লঙ্ঘিত হয়েছে।’
‘এছাড়া, স্পন্সরশিপ ও সম্প্রচার স্বত্বের পূর্ণাঙ্গ বিবরণীসহ মোট অর্থের ৫০% অর্থ ম্যাচ আয়োজনের পূর্বেই পরিশোধ করার বিষয়ে কোনো ইতিবাচক সাড়াও পাওয়া যাচ্ছে না। সর্বোপরি ম্যাচ আয়োজনের সার্বিক ব্যবস্থাপনা এতটাই নাজুক হয়ে পড়েছে যে, ৮ ডিসেম্বরের ম্যাচে আয়োজকদের কিছু উচ্ছৃঙ্খল ও উদ্ধত সদস্যদের দ্বারা কয়েকজন সাংবাদিক শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হয়েছেন, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।’
বিজ্ঞপ্তিতে আগামী ১১ ডিসেম্বরের ম্যাচটি স্থগিত ঘোষণা করে গত দুটি ম্যাচের টিকিট বিক্রি, স্পন্সরশিপ ও সম্প্রচার স্বত্বের পূর্ণাঙ্গ হিসাব ও সংশ্লিষ্ট ৫০% অর্থ জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের কাছে জমা দেওয়ার জন্য এএফ বক্সিং প্রোমোশন ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডকে নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হয়েছে।
আয়োজকদের পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী, আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের ক্লাব দুটির মধ্যে অনুষ্ঠেয় ম্যাচটিতে ব্রাজিল কিংবদন্তি কাফু ও আর্জেন্টিনা কিংবদন্তি ক্লদিও ক্যানিজিয়ার উপস্থিত থাকার কথা ছিল। তবে জানা গেছে, চুক্তির টাকা পরিশোধ না করায় এই দুই সাবেক তারকার কেউই বাংলাদেশে আসছেন না। সব মিলিয়ে লাতিন বাংলা সুপার কাপের ভবিষ্যৎ এখন আয়োজকদের শর্ত পূরণ ও মন্ত্রণালয়ের পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিকেই তাকিয়ে।
৩ লাল কার্ডের ম্যাচে বাংলাদেশকে হারাতে ব্যর্থ আর্জেন্টিনার ক্লাব : টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করা রেড গ্রিন ফিউচার স্টার ক্লাব দ্বিতীয় ও শেষ ম্যাচে আর্জেন্টিনার প্রতিনিধিত্ব করা আতলেতিকো চার্লোনের বিপক্ষে ১-১ গোলে ড্র করেছে। সোমবার ঢাকার জাতীয স্টেডিয়ামে অনুষ্টিত চরম উত্তেজনাকর ম্যাচে দুই দলের খেলোয়াড়েরা মারামরির মত ন্যাককারজনক ঘটনাও ঘটেছে। টুর্নামেন্টের প্রথম ম্যাচে ব্রাজিলের ক্লাব সাও বার্নার্দোর বিপক্ষে ৪-০ গোলে হেরেছিল স্বাগতিক দল।
সোমবার আর্জেন্টিনার ক্লাবটির বিপক্ষে দুর্দান্ত শুরু পায় বাংলাদেশ। ম্যাচের ৪র্থ মিনিটে দারুণ শটে দলকে এগিয়ে নেন মাসুদ। প্রতিপক্ষ দল অফসাইডের আবেদন করলেও তাতে সাড়া দেয়নি রেফারি। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে সামিয়েন্তোর দৃষ্টিনন্দন গোলে সমতায় ফিরে আর্জেন্টিনার দলটি। ডান দিক থেকে এই ফরোয়ার্ডের শট তার এক সতীর্থের পায়ের ফাঁক দিয়ে কাছের পোস্ট দিয়ে জালে জড়ায়। তার পেছনে থাকা রেড গ্রিনের ডিফেন্ডাররা হতবাক হয়ে যান।
ম্যাচের ৭৬ মিনিটে দুই পক্ষের ফুটবলাররা হাতাহাতিতে নানা অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি শান্ত করতে আর্জেন্টিনার দলটির দেভিদ বেভজিনি ও মাতিয়াস রোসালেস ও বাংলাদেশের ইশান হাবিব রেদোয়ানকে লাল কার্ড দেখান রেফারি। এরপর আর কোনো গোল না হওয়ায় ম্যাচ সমতায় শেষ হয়।
আর্জেন্টিনার ফুটবলারকে লাথি মারা সেই ফুটবলারের পরিচয় : দুই ক্লাবের খেলোয়াড়দের মধ্যে হাতাহাতির একপর্যায়ে আর্জেন্টিনার ক্লাবটির ফুটবলারকে লাথি মারতে দেখা যায় বাংলাদেশের ৩ নম্বর জার্সি পরিহিত ফুটবলার ইহসান হাবিব রেদোয়ানকে। শুধু লাথি মেরেই থামেননি তিনি পেছন থেকে মাথায় আঘাত করেন আরও এক আর্জেন্টাইন ফুটবলারকে। নেট দুনিয়ায় এই ভিডিও ভাইরাল হলে নিন্দার ঝড় উঠে সর্বত্র। জানা গেছে সাফ অনূর্ধ্ব-১৭ চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশ দলে খেলেছিলেন তিনি।
আর্জেন্টিনার জার্সিতে খেলছেন কারা?
টুর্নামেন্টে অংশ নেয়া ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার দল নিয়ে মোটেও সন্তুষ্ট নয় দর্শকরা। দুটি দলের জার্সী গায়ে যারা খেলেছেন তারা কেউই পোশাদার ফুটবলার নয় বলে জানা গেছে। এলাকাভিত্তিক তৃতীয় স্তরের ক্লাব বলেই আয়োজকরা স্বীকার করেছেন। এর মধ্যে আর্জেন্টিনার অ্যাতলেটিকো শার্লনকে নিয়ে সন্দেহটা আরো প্রকাশ্য হয়েছে। সেটা আরো পরিস্কার হয়ে যায় মাঠে তাদের পারফরমেন্স দেখে। তাই আর্জেন্টিনা নামধারী ক্লাবটির সঙ্গে ড্র করেও সš‘ষ্টি নেই লাল-সবুজ দলের ফুটবলার ও কোচ।
রেড অ্যান্ড গ্রিন ফিউচার স্টারের কোচ এসএম ইমরুল হাসান বলেন, ‘আসলে সেটা মনে হয়নি (খেলোয়াড়দের মান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দেশের তৃতীয় স্তরের)। আসলে আমি তাদের সম্পর্কে বিস্তারিত জানি না। তো আমি জানার চেষ্টা করেছি বিভিন্নভাবে, যখন কোন দুটি দলের সঙ্গে আমাদের খেলা হবে সে সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য নেয়ার চেষ্টা করেছি। আমি ব্রাজিলের দল সম্পর্কে যতটা তথ্য পেয়েছি, আর্জেন্টিনা সম্পর্কে ততটা পাইনি।’
সব কিছু প্রকাশ্যে চলে আসায় বিষয়টি আড়াল করতে না পেরে এলমেলো জবাব সংশ্লিষ্টদের। টুর্নামেন্টের আয়োজক আসাদুজ্জামান বলেন, ‘প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ স্তর এভাবে যদি যেতে থাকেন, তাহলে দেখা যাবে এরা তৃতীয় স্তরের দল। তারপরও মনে হয় তৃতীয় স্তরের ওই মান হয়নি (আর্জেন্টিনা), আমরা যেটা ব্রাজিলের মধ্যে পেয়েছি। আমি একজন ব্যক্তি হিসেবে তো দল নির্বাচন করতে পারি না, তো আমি যখন একটা দললে তৃতীয় স্তর থেকে নিয়ে এসেছি, আমার মনে হয়েছিল তৃতীয় স্তরের টিম বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-২০ দলের জন্য যথেষ্ট।’
প্রতারণার অভিযোগ ও তদন্ত দাবি : কথা আর কাজের সঙ্গে কোন মিল নেই লাতিন বাংলা সুপার কাপ আয়োজকদের। টুর্নামেন্টের সস্তা প্রচারণার জন্য তারা নিয়েছেন মিথ্যার আশ্রয়। ব্রাজিলের বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক কাফু ও আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি ক্যানেজিয়ার আসার কথা বলা হলেও এখন সুর বদলেছেন আয়োজকরা। এছাড়াও প্রশ্ন উঠেছে ফুটবলার ও রেফারিদের পাওনা পরিশোধ নিয়েও। যদিও তা অস্বীকার করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
ব্রাজিলের কিংবদন্তি কাফু এবং আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি ক্যানিজিয়ার নাম ভাঙ্গিয়ে প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে লাতিন বাংলা কাপের আয়োজকদের বিরুদ্ধে।
ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা ফুটবলের প্রতি অন্যরকম আবেগ কাজ করে বাঙালির। আর এই আবেগ পুঁজি করেই ব্যবসা করতে তৎপর নামধারী কিছু সংগঠক। টুর্নামেন্ট শুরুর আগে কাফু-ক্যানেজিয়া আসবে বলে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে শোরগোল। লাতিন বাংলা সুপার কাপ শেষ হতে চললেও তাদের দেখা নেই।
শুধু কাফু-ক্যানেজিয়ার মতো কিংবদন্তি নয়। আয়োজকরা প্রচারণা চালায় নগরবাউল জেমসকে নিয়েও। বাংলাদেশ-আর্জেন্টিনা ম্যাচের আগে পারফর্ম করার কথা ছিলো এই রকস্টারের। জাতীয় স্টেডিয়াম গিয়ে তারও খোঁজ মেলেনি। মোট কথা টুর্নামেন্টের সস্তা প্রচারণার জন্য আয়োজকরা নেয় মিথ্যার আশ্রয়।
এ ব্যাপারে আয়োজক মো. আসাদুজ্জামান বলেন, পুরোপুরি ফিন্যান্সিয়াল সমস্যার কারনেই ঘটেছে। এখানে লুকোচুরির কিছু নেই। আমাদের কাছে স্পন্সর নেই। আমরা স্পন্সরের জন্য অপেক্ষা করছি, যদি স্পন্সর মিলে যায় আমরা এদের শতভাগ আনছি।’
চরম অব্যবস্থাপনার এই টুর্নামেন্টে গণমাধ্যমকর্মীদের সংবাদ সংগ্রহ করতে এসে হেনস্তার শিকার হতে হয়েছে। একটা আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে দেশের ভাবমূতি। যেনতেন কারো কাছে আয়োজক স্বত্ব দেয়ার আগে অবশ্যই ভাবা উচিৎ কর্তা ব্যক্তিদের। নিশ্চয়ই বিষয়টি তদন্ত সাপেক্ষে গুরুত্বের সঙ্গে দেখবে ফেডারেশন ও মন্ত্রনালয়। এমন প্রত্যাশা ফুটবল সংশ্লিষ্টদের।