এইচ এম আকতার নিউইয়র্ক থেকে : ফুটবলকে দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপ, লাতিন আমেরিকা কিংবা আফ্রিকার জনপ্রিয় খেলা হিসেবে দেখা হলেও ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ সেই ধারণায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের বড় অংশের ম্যাচ যুক্তরাষ্ট্রে হওয়ায় দেশটির সর্বত্র এখন ফুটবলের উন্মাদনা। নিউইয়র্ক-নিউ জার্সি, লস অ্যাঞ্জেলেস, সান ফ্রান্সিসকো, সিয়াটল, ডালাস, হিউস্টন, মিয়ামি, আটলান্টা, বোস্টন, ফিলাডেলফিয়া ও কানসাস সিটির মতো আয়োজক শহরগুলোতে প্রতিদিনই হাজার হাজার সমর্থকের উপস্থিতিতে তৈরি হয়েছে এক অনন্য উৎসবমুখর পরিবেশ।
স্টেডিয়ামের বাইরেও ফুটবলের আবহ স্পষ্ট। শহরের পার্ক, উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ, শপিং সেন্টার, রেস্তোরাঁ, কফিশপ ও নির্ধারিত ফ্যান জোনে বড় পর্দায় খেলা উপভোগ করছেন বিভিন্ন দেশের সমর্থকেরা। ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, মেক্সিকো, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, মরক্কো, জাপানসহ বিভিন্ন দেশের পতাকা হাতে সমর্থকদের উচ্ছ্বাস এখন যুক্তরাষ্ট্রের নগরজীবনের পরিচিত দৃশ্য। বহুজাতিক সমাজব্যবস্থার কারণে একই শহরে বিশ্বের নানা দেশের সমর্থকদের মিলনমেলা তৈরি হয়েছে, যা বিশ্বকাপকে কেবল ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়, বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিণত করেছে।
বিশ্বকাপ ঘিরে সবচেয়ে বেশি লাভবান হচ্ছে পর্যটন ও সেবাখাত। আন্তর্জাতিক ও দেশীয় পর্যটকের ভিড়ে অনেক শহরের হোটেল প্রায় পূর্ণ। রেস্তোরাঁ, পরিবহন, খুচরা ব্যবসা, বিনোদন কেন্দ্র ও স্থানীয় পর্যটন খাতে বেড়েছে আয়। অর্থনীতিবিদদের মতে, বিশ্বকাপকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে কয়েক দশক বিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সৃষ্টি হতে পারে। হোটেল, পর্যটন, খাদ্য ও খুচরা ব্যবসায় এর ইতিবাচক প্রভাব ইতোমধ্যে দৃশ্যমান।
তবে এই বিপুল আয়োজনের আর্থিক দিক নিয়ে বিতর্কও রয়েছে। বিভিন্ন বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বিশ্বকাপ থেকে ফিফার আয় উল্লেখযোগ্য হলেও আয়োজক শহরগুলোর নিরাপত্তা, অবকাঠামো ও জনসেবা খাতে ব্যয়ও অনেক বেড়েছে। ফলে অনেক নগর কর্তৃপক্ষকে অতিরিক্ত বাজেট বরাদ্দ করতে হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে পর্যটন, আন্তর্জাতিক পরিচিতি ও বিনিয়োগ বাড়লেও স্বল্পমেয়াদে ব্যয়ের চাপও কম নয়।
যুক্তরাষ্ট্রে ফুটবলের জনপ্রিয়তা গত তিন দশকে ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপ দেশটিতে পেশাদার ফুটবলের ভিত্তি গড়ে তুলেছিল। এরপর মেজর লিগ সকার (MLS)-এর সম্প্রসারণ, নারী ফুটবলের সাফল্য এবং লাতিন আমেরিকান অভিবাসীদের প্রভাবে খেলাটির গ্রহণযোগ্যতা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ সেই অগ্রযাত্রাকে আরও শক্তিশালী করবে এবং নতুন প্রজন্মের মধ্যে ফুটবলকে আরও জনপ্রিয় করে তুলবে।
ক্যালিফোর্নিয়া, টেক্সাস, ফ্লোরিডা ও নিউইয়র্কের মতো রাজ্যগুলোতে বিশ্বকাপকে ঘিরে উৎসাহ বিশেষভাবে লক্ষণীয়। অনেক এলাকায় ফ্যান ফেস্টে ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি মানুষ উপস্থিত হওয়ায় আয়োজকদের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করতে হয়েছে। পরিবার-পরিজন নিয়ে খেলা দেখতে আসা দর্শকদের উপস্থিতি বিশ্বকাপকে একটি সামাজিক মিলনমেলায় রূপ দিয়েছে।
বিশ্বকাপ উপলক্ষে নিরাপত্তা ব্যবস্থাও জোরদার করা হয়েছে। ফেডারেল ও অঙ্গরাজ্য প্রশাসনের পাশাপাশি স্থানীয় কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তা, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ এবং জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সমন্বিতভাবে কাজ করছে। একই সঙ্গে দর্শনার্থীদের সুবিধার্থে গণপরিবহন, তথ্যকেন্দ্র এবং স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রমও বাড়ানো হয়েছে।
তবে এবারের বিশ্বকাপে একটি বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে গ্রীষ্মের তীব্র তাপপ্রবাহ। কয়েকটি ম্যাচে অতিরিক্ত তাপমাত্রা খেলোয়াড়, কর্মকর্তা ও দর্শকদের জন্য ঝুঁকি তৈরি করেছে। এজন্য কিছু ম্যাচে অতিরিক্ত পানির বিরতি, চিকিৎসা সহায়তা এবং আবহাওয়া পর্যবেক্ষণের মতো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতাও বিশ্বকাপ আয়োজনের আলোচনায় নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই বিশ্বকাপ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য শুধু একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়; এটি দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি, পর্যটন, অর্থনীতি এবং বহুসাংস্কৃতিক সমাজের শক্তিকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। বিশ্বকাপকে ঘিরে বিশ্বের নানা দেশের মানুষের মিলন, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং সাংস্কৃতিক বিনিময় যুক্তরাষ্ট্রের বহুজাতিক পরিচয়কে আরও সুস্পষ্ট করেছে।
বাংলাদেশ থেকেও প্রবাসী বাংলাদেশিসহ বিপুলসংখ্যক ফুটবলপ্রেমী এই বিশ্বকাপের আমেজে শামিল হয়েছেন। নিউইয়র্ক, নিউ জার্সি, ফিলাডেলফিয়া ও অন্যান্য শহরে বসবাসরত বাংলাদেশিরা পরিবার-পরিজন নিয়ে খেলা উপভোগ করছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তাদের উচ্ছ্বাস চোখে পড়ছে। ফলে হাজার মাইল দূরে থেকেও বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীরা যুক্তরাষ্ট্রের এই বিশ্বকাপ উৎসবের সঙ্গে একাত্মতা অনুভব করছেন।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ যুক্তরাষ্ট্রকে সাময়িকভাবে ফুটবল বিশ্বের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছে। খেলার উত্তেজনা, পর্যটনের প্রসার, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং বৈশ্বিক সম্প্রীতির বার্তা—সবকিছু মিলিয়ে পুরো আমেরিকাজুড়ে এখন এক অন্যরকম উৎসবের আবহ। ফুটবলের এই মহাযজ্ঞ শেষ হলেও এর অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব বহু বছর ধরে অনুভূত হবে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।