ফুটবলে হাওয়া দিতে হয় এটা আমাদের সবারই জানা, তবে চার্জ দিতে হয় এটা হয়তো কেও কখনো শোনেনি। কিন্তু এবারের ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে খেলার আগে ফুটবলে দিতে হবে চার্জ! শুনতে অদ্ভুত শোনালেও এবারের বিশ^কাপের অফিশিয়াল ম্যাচ বলের ক্ষেত্রে এটাই বাস্তব। বিশ্বকাপের অফিশিয়াল ম্যাচ বল ‘ত্রিওন্ডা’কে সচল রাখতে হলে নিয়মিতই তাতে চার্জ দিতে হবে। স্মার্টফোনের ব্যাটারি শেষ হলে যেমন আমরা পকেটে চার্জার খুঁজি, ঠিক তেমনি রেফারিদেরও ম্যাচ শুরুর আগে নিশ্চিত করতে হবে বলের ‘ফুল চার্জ’ আছে কি না! একবার পুরো চার্জ দিলে এই বল টানা ছয় ঘণ্টা সচল থাকতে পারে। দেড় ঘণ্টার একটি ফুটবল ম্যাচের জন্য যা যথেষ্ট।
ক্রীড়াসামগ্রী প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ‘অ্যাডিডাস’ এর বানানো এই বল শুধু চামড়া আর সুতার কোনো গোলক নয়, এটি আসলে আস্ত একটি কম্পিউটার! মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ মঞ্চে আয়োজিত এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি লুকিয়ে আছে এই বলের পেটের ভেতরেই। ‘অ্যাডিডাস’ বলের ভেতরে যুক্ত করেছে একটি বিশেষ মোশন সেন্সর চিপ। বলের ঠিক কেন্দ্রে বসানো ৫০০ হার্টজের এই সেন্সরটি প্রতি সেকেন্ডে ৫০০ বার তথ্য বা ডাটা রেকর্ড করতে পারে। এর মানে হলো, ফুটবলারের পায়ের সামান্যতম ছোঁয়া, বলের ঘূর্ণন, গতি এবং গতিপথের নিখুঁত হিসাব রিয়েল টাইমে চলে যাবে কন্ট্রোল রুমে।
বলের ভেতরে মাত্র ১৪ গ্রাম ওজনের এই চিপ এমনভাবে ভারসাম্য বজায় রেখে বসানো হয়েছে, যাতে খেলোয়াড়দের শট নিতে বা ড্রিবলিং করতে বিন্দুমাত্র বেগ পেতে না হয়। মাঠে ফুটবলাররা টেরই পাবেন না যে সাধারণ বলের চেয়ে আলাদা কিছু দিয়ে খেলছেন তাঁরা। এই বলের আসল শক্তি প্রকাশ পায় যখন এর ডেটা স্টেডিয়ামের ট্র্যাকিং সিস্টেমের সঙ্গে যুক্ত হয়। বিশ্বকাপের প্রতিটি ভেন্যুতে বসানো একাধিক ক্যামেরা সার্বক্ষণিকভাবে খেলোয়াড়দের নড়াচড়া ট্র্যাক করবে। ক্যামেরার এই ডেটা যখন বলের সেন্সরের তথ্যের সঙ্গে মিলবে, তখন পুরো ম্যাচের একটি ত্রিমাত্রিক মডেল তৈরি হবে। এটি মূলত ফুটবলের গোল-লাইন টেকনোলজি, টেনিসের হক-আই এবং অন্যান্য খেলার ট্র্যাকিং চিপের এক অপূর্ব সমন্বয়।
এই প্রযুক্তি থেকে পাওয়া সব তথ্য সরাসরি এবং রিয়েল টাইমে চলে যাবে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি বা ‘ভিএআর’ সিস্টেমে। এর ফলে অফসাইড, হ্যান্ডবল, ফাউল কিংবা বল লাইনের বাইরে যাওয়ার মতো কঠিন সিদ্ধান্তগুলো রেফারিরা চোখের পলকে এবং শতভাগ নির্ভুলভাবে নিতে পারবেন। বলটিতে ঠিক কোন মুহূর্তে স্পর্শ লেগেছে, তা একদম নিখুঁতভাবে জানা যাবে বলে অফসাইডের চুলচেরা বিশ্লেষণে আর কোনো ধোঁয়াশা থাকবে না। এর আগেও ফুটবলে কানেক্টেড বল টেকনোলজি ব্যবহার করা হয়েছে, তবে ২০২৬ বিশ্বকাপের এই সংস্করণটি আরও দ্রুত গতিসম্পন্ন, আরও নিখুঁত এবং ম্যাচ পরিচালনার সিস্টেমের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত। উত্তর আমেরিকা মহাদেশ জুড়ে আয়োজিত এই বিশ্বকাপে ‘ত্রিওন্ডা’ বলটি ফুটবলে প্রযুক্তির যেন এক অদ্ভুত বিস্ময়!