কামরুজ্জামান হিরু : ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর নকআউট পর্বের প্রথম রোমাঞ্চকর ম্যাচে ইতিহাস গড়ল টুর্নামেন্টের অন্যতম সহ-আয়োজক কানাডা। লস অ্যাঞ্জেলেস স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত শেষ বত্রিশের (রাউন্ড অব ৩২) এই টানটান উত্তেজনার ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকাকে ১-০ গোলে হারিয়ে ৯৬ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের শেষ ১৬-তে পা রাখল ‘লেস রুজেস’রা। ম্যাচের অতিরিক্ত সময়ের (৯২ মিনিট) মাথায় মিডফিল্ডার স্টিফেন ইউস্তাকিওর অবিশ্বাস্য এক দূরপাল্লার ভলিতে নিশ্চিত অতিরিক্ত সময়ে গড়াতে যাওয়া ম্যাচটির ভাগ্য নির্ধারণ হয়ে যায়।

দুই দলের জন্যই ম্যাচটি ছিল নতুন ইতিহাস লেখার লড়াই, কারণ এর আগে কোনো দেশই বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে জয়ী হতে পারেনি। মাঠের লড়াইয়ে ফেবারিট কানাডা শুরু থেকেই বলের নিয়ন্ত্রণে আধিপত্য দেখালেও আন্ডারডগ দক্ষিণ আফ্রিকার জমাট রক্ষণভাগ ভাঙতে তাদের বেশ বেগ পেতে হয়েছে।

প্রথমার্ধে কানাডার আক্রমণভাগের তাজোন বুকানন এবং তানি ওলুয়াসেয়ি বেশ কয়েকটি সুযোগ তৈরি করলেও গোল করতে ব্যর্থ হন। উল্টো ম্যাচের দুই অর্ধে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি বেশ কয়েকবার ম্যাচের গতি পরিবর্তন করে। ম্যাচের প্রথমার্ধে এবং দ্বিতীয়ার্ধে দুই দলের দুটি সিদ্ধান্ত ভিএআর পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যায়। দক্ষিণ আফ্রিকার গোলরক্ষক ও অধিনায়ক রনওয়েন উইলিয়ামস পুরো ম্যাচ জুড়েই দুর্দান্ত পারফর্ম করেন। কানাডার একের পর এক আক্রমণ নসাৎ করে মোট ৫টি চোখধাঁধানো সেভ করেন তিনি, যার ফলে ম্যাচের সিংহভাগ সময় স্কোরবোর্ড ০-০ সমতায় থমকে ছিল।

ম্যাচের ৭৫তম মিনিটে খেলার মোড় সম্পূর্ণ ঘুরে যায়, যখন হ্যামস্ট্রিং ইনজুরি কাটিয়ে কানাডার পোস্টার বয় ও সুপারস্টার আলফোনসো ডেভিস মাঠে নামেন। ডেভিস মাঠে আসার পর কানাডার আক্রমণের ধার বহুগুণ বেড়ে যায়। মাঠে নেমেই তিনি প্রমিজ ডেভিডের উদ্দেশে একটি চমৎকার পাস বাড়িয়েছিলেন, তবে সেটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। এর কিছুক্ষণ পর জোনাথন ডেভিডের শটও রুখে দেয় দক্ষিণ আফ্রিকান ডিফেন্স।

যখন মনে হচ্ছিল ম্যাচটি অতিরিক্ত ৩০ মিনিটে গড়াতে চলেছে, ঠিক তখনই আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ৯২ মিনিটে রাইট-ব্যাক অ্যালিস্টেয়ার জনস্টনের একটি ক্রস বক্সে ক্লিয়ার করার চেষ্টা করে দক্ষিণ আফ্রিকার রক্ষণভাগ। তবে পেনাল্টি বক্সের ঠিক বাইরে বল পেয়ে যান ফাঁকায় থাকা স্টিফেন ইউস্তাকিও। মাটিতে ড্রপ খাওয়ার আগেই চলন্ত বলে ডান পায়ের এক অবিশ্বাস্য ভলিতে বল জালের একদম কোণায় পাঠিয়ে দেন তিনি। পুরো স্টেডিয়াম তখন কানাডিয়ান সমর্থকদের উল্লাসে ফেটে পড়ে। শেষ বাঁশি বাজার পর আবেগঘন মুহূর্তে কানাডার প্রধান কোচ জেসি মার্শ ফুটবলারদের বুকে টেনে নিয়ে বলেন, “তোমরা আজ কানাডার বীর।”

উল্লেখ্য, ৯৬ বছরের ইতিহাসে এবারসহ মোট তিনবার বিশ্বকাপ খেলছে কানাডা। আগের দুবার গ্রুপ পর্বেই আটকা পড়েছিল তাদের স্বপ্ন। এবার গ্রুপ পর্ব পেরিয়ে শেষ বত্রিশের বাধাও পেরিয়ে গেছে উত্তর আমেরিকার দলটি। এখন শেষ ষোলোর লড়াইয়ে মুখোমুখি হবে নেদারল্যান্ডস ও মরক্কোর মধ্যকার ম্যাচের বিজয়ীর বিপক্ষে। ম্যাচটি আগামী ৪ জুলাই হিউস্টনে অনুষ্ঠিত হবে।

অন্যদিকে, দক্ষিণ আফ্রিকা এবারের বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্ব থেকে উঠে এসে চমক দেখালেও নকআউটের লড়াইয়ে কানাডার কাছে পরাজিত হয়ে বিদায় নিল। বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো নকআউট পর্বে খেলার দারুণ অভিজ্ঞতা নিয়ে মাঠ ছেড়েছে তারা। টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই দারুণ ফুটবল খেলা প্রোটিয়াদের এই বিদায় তাদের ভক্তদের জন্য ছিল অত্যন্ত বেদনাদায়ক।