ভারত সফরে দুই রকম অভিজ্ঞতা হলো লিওনেল মেসির। কলকাতার বিশৃঙ্খল পরি¯ি’তির সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র দেখা গেল হায়দরাবাদে। শনিবার লিওনেল মেসির ‘গোট ইন্ডিয়া ট্যুর ২০২৫’-এর দ্বিতীয় পর্বে তেলেঙ্গানার রাজধানী এক উৎসবমুখর সন্ধ্যার সাক্ষী হলো। রাজীব গান্ধী আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামে হাজারো দর্শকের উল্লাস, সুশৃঙ্খল আয়োজন এবং বাঁধভাঙা আনন্দের মধ্য দিয়ে আর্জেন্টাইন কিংবদন্তির আগমন উদযাপিত হলো, যা কলকাতার তিক্ত অভিজ্ঞতা ভুলিয়ে দিয়েছে। শনিবার সন্ধ্যায় কড়া নিরাপত্তার মধ্যে হায়দরাবাদে পৌঁছান মেসি। রাত ৭টা ৫৫ মিনিট নাগাদ তিনি স্টেডিয়ামে প্রবেশ করতেই দর্শকরা উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ে। মাঠের ভেতর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় হাত নেড়ে ভক্তদের অভিবাদন জানান তিনি। পুরো অনুষ্ঠান জুড়ে স্টেডিয়ামে ছিল উৎসবের আমেজ। সন্ধ্যায় মূল আকর্ষণ ছিল একটি প্রদর্শনী ম্যাচ। তেলেঙ্গানার মুখ্যমন্ত্রী রেবন্ত রেড্ডির সঙ্গে মাঠে নামেন মেসি। দুজনের মধ্যে পাস আদান-প্রদানের পর মেসি সাবলীলভাবে বল জালে জড়ান, যা গ্যালারিতে উপস্থিত দর্শকদের আনন্দে ভাসিয়ে দেয়। মেসি ছাড়াও এই প্রদর্শনী ম্যাচে রদ্রিগো দি পল এবং লুইস সুয়ারেজ উপস্থিত ছিলেন। তারা মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বসে ‘আরআর ৯’ এবং ‘মেসি অল স্টারস’-এর মধ্যকার পেনাল্টি শুটআউট উপভোগ করেন। শেষ পর্যন্ত ‘দ্য গোট কাপ’ জয় করে ‘আরআর ৯’, এবং মেসি বিজয়ীদের হাতে ট্রফি তুলে দেন। অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে মেসি, দি পল, সুয়ারেজ এবং মুখ্যমন্ত্রী শিশুদের সঙ্গে ‘রন্ডো’ (বৃত্তাকার ফুটবল খেলা) খেলেন। সুয়ারেজ এবং দি পল ছোট ভক্তদের অটোগ্রাফ দেন। মেসি শিশুদের সঙ্গে ফুটবল খেলেন এবং দর্শকদের সঙ্গে খোলামেলাভাবে মেলামেশা করেন, যে দৃশ্য কলকাতার ভক্তরা দেখার অপেক্ষায় ছিলেন। এই সফরে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীও মেসির সঙ্গে দেখা করেন। রাজীব গান্ধী ইনডোর স্টেডিয়ামে তাদের মধ্যে সংক্ষিপ্ত আলাপচারিতা হয়। এ সময় ভারতীয় লোকসভার বিরোধী দলনেতাকে নিজের সই করা একটি জার্সি উপহার দেন আর্জেন্টাইন তারকা। রাহুল গান্ধীর পৌঁছানোর আগেই মুখ্যমন্ত্রী রেবন্ত রেড্ডি মেসির সঙ্গে মাঠে উপস্থিত ছিলেন। হায়দরাবাদের দর্শকদের উদ্দেশ্যে মেসি তার উষ্ণ অভ্যর্থনার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “আজ এবং সবসময় আমি যে ভালোবাসা পেয়েছি, তার জন্য সবাইকে ধন্যবাদ। এখানে আসার আগেও, বিশেষ করে গত বিশ্বকাপের সময়, আমি অনেক সমর্থন দেখেছি। ভারতে আসতে পারা এবং আপনাদের সঙ্গে এই মুহূর্তগুলো ভাগ করে নেওয়া আমাদের জন্য সম্মানের।” মেসির পর রদ্রিগো দি পল এবং লুইস সুয়ারেজও ভক্তদের উদ্দেশ্যে কথা বলেন এবং শহরে আসতে পেরে নিজেদের আনন্দের কথা জানান। অনুষ্ঠান শেষে এই তিন তারকা আয়োজকদের সঙ্গে স্মারক বিনিময় করেন। মেসি একটি আর্জেন্টিনা জার্সি উপহার দিয়ে দিনের কর্মসূচির সমাপ্তি টানেন। হায়দরাবাদের এই শান্ত ও আনন্দঘন পরিবেশ ছিল কলকাতার সল্টলেক স্টেডিয়ামের ঘটনার সম্পূর্ণ বিপরীত। এর আগে কলকাতায় মেসির সংক্ষিপ্ত উপ¯ি’তি বিশৃঙ্খলার কারণে ম্লান হয়ে যায়। সেখানে প্রায় ৫০ হাজার দর্শক-যাদের অনেকে ৪ হাজার থেকে ১২ হাজার রুপি, এমনকি কালোবাজারে ৪০ হাজার রুপি পর্যন্ত খরচ করে টিকিট কেটেছিলেন তারা হতাশ হন। রাজনীতিবিদ, ভিভিআইপি এবং নিরাপত্তাকর্মীদের ভিড়ে মেসিকে ঠিকমতো দেখতে না পেয়ে ক্ষুব্ধ ভক্তরা বোতল ছুড়ে মারে এবং স্টেডিয়ামের চেয়ার ও ফাইবারগ্লাসের আসন ভেঙ্গে ফেলে। এখান থেকেই মেসি মুম্বাই যাবেন সেখানে সিসিআই এবং ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন। এরপর ১৫ ডিসেম্বর তিনি দিল্লির উদ্দেশ্যে রওনা হবেন।
মেসিকে আনা শতদ্রুকে মুখ ঢেকে তোলা হলো আদালতে
চরম অব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল লিওনেল মেসির তিন দিনের ভারত সফর। শনিবার (১৩ ডিসেম্বর) সফরের প্রথম দিনেই কলকাতার সল্টলেক স্টেডিয়ামে চরম অব্যবস্থাপনার শিকার হন গ্যালারি ভর্তি দর্শক।হাজার-হাজার টাকা খরচ করে মেসিকে দেখতে যুবভারতী স্টেডিয়ামে এসেছিলেন ফুটবলপ্রেমীরা। তবে মেসিকে ঘিরে জটলার কারণে গ্যালারি থেকে ঠিকভাবে দেখতেই পায়নি কেউ। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে স্টেডিয়ামে ভাঙচুর চালান দর্শকরা। শুধু তাই নয়, বেষ্টনী ভেঙ্গে মাঠে ঢুকেছেন এবং কার্পেট, চেয়ার, ফুলের টব থেকে শুরু করে বিভিন্ন জিনিস লুটও করেছেন। এমন বাজে পরি¯ি’তির জন্য মেসিকে ভারতে আনার মূল উদ্যোক্তা শতদ্রু দত্তকে আটকও করে পুলিশ। রোববার শতদ্রুকে বিধাননগর মহকুমা আদালতে তোলা হয়।
সাদা কাপড় দিয়ে মুখ ঢেকে কঠোর নিরাপত্তার সঙ্গে তালে আদালতে নিয়ে আসে পুলিশ। এ সময় কোর্ট চত্বরেই বিক্ষোভ দেখায় বিজেপি। শতদ্রুকে উদ্দেশ্য করে চোর চোর শ্লোগান দিতে থাকেন বিজেপির কর্মী-সমর্থকরা। পুলিশের তরফ থেকে শতদ্রুকে নিজেদের হেফাজতে নেওয়ার আবেদন জানানো হয়। এছাড়া শতদ্রুর জামিনের বিরোধিতা করেন সরকারি আইনজীবী। মেসিকে ভারতের আনার এই মূল উদ্যোক্তাকে ১৪ দিনের পুলিশি হেফাজতে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। শতদ্রুর আইনজীবী দ্যুতিময় ভট্টাচার্য বলেন, ‘মেসিকে কলকাতায় আনার নেপথ্যে আমার মক্কেলের মহৎ উদ্দেশ্য ছিল। ছোটরা যাতে ফুটবল নিয়ে উপযুক্ত জ্ঞান পায়, তা ছিল অন্যতম লক্ষ্য।’ যুবভারতীতে হওয়া বিশৃঙ্খলার দায় কার? এমন প্রশ্নে শতদ্রুর আইনজীবী বলেন, ‘এটা মানুষের ব্যর্থতা। পরি¯ি’তি বুঝে তাদের প্রতিক্রিয়া দেওয়া উচিত ছিল। এ ভাবে চেয়ার ছোড়া উচিত হয়নি।’