‘দ্য গোট ইন্ডিয়া ট্যুর’র অংশ হিসেবে শনিবার (১৩ ডিসেম্বর) ভোরে কলকাতায় পৌঁছেছেন আর্জেন্টাইন ফুটবল মহাতারকা লিওনেল মেসি। ব্যক্তিগত গালফস্ট্রিম-ভি উড়োজাহাজে ভারতে অবতরণ করেন তিনি। কড়া নিরাপত্তার কারণে বিমানবন্দরে অপেক্ষায় থাকা শত শত সমর্থকের চোখ এড়িয়ে ভোর সাড়ে ৩টার দিকে তাকে দ্রুত হোটেলে নিয়ে যাওয়া হয়। কলকাতায় নামার পর বিমানবন্দরের পেছনের একটি গেট দিয়ে মেসিকে সরিয়ে নেয়া হয়। কালো স্যুটের ভেতরে সাদা টি-শার্ট পরা তাকে কয়েকজন ভাগ্যবান বিমানবন্দরকর্মীই অল্প সময়ের জন্য দেখতে পেরেছেন। এরপর মেসিকে সরাসরি রানওয়ে থেকেই গাড়িতে করে হোটেলের উদ্দেশে নিয়ে যাওয়া হয়। ভারতীয় সংবাদ মাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, মেসিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে হায়াত রিজেন্সি হোটেলে। সেখানে ৭৩০ নম্বর কক্ষে উঠেছেন বলে জানা গেছে। তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুরো সপ্তম তলা সিল করে দেয়া হয়েছে।

মেসি ঠিক কোন কক্ষে অবস্থান করছেন, তার নির্দিষ্ট ভাড়া জানা না গেলেও হোটেলের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট অনুযায়ী, ১৩ ডিসেম্বর প্রেসিডেনশিয়াল বুকিংয়ের জন্য পাওয়া যায়নি। ১৪ ডিসেম্বর ওই স্যুটের এক রাতের ভাড়া দেখানো হয়েছে ১ লাখ ৪২ হাজার ৫০০ রুপি। ডিপ্লোম্যাটিক স্যুটের ভাড়া প্রায় ১ লাখ ১২ হাজার ৫০০ রুপি, রিজেন্সি এক্সিকিউটিভ স্যুটের ভাড়া প্রায় ৫১ হাজার রুপি এবং রিজেন্সি স্যুট কিং-এর ভাড়া প্রায় ৩৮ হাজার রুপি। এসব তথ্য অনুযায়ী ধারণা করা হচ্ছে, মেসি এই বিলাসবহুল স্যুটগুলোর যেকোনো একটিতে অবস্থান করছেন। কড়া নিরাপত্তার মধ্যেও মেসির কাছাকাছি থাকার আশায় অনেক সমর্থক হোটেলেই কক্ষ বুক করেছেন। কলকাতা থেকে হায়দরাবাদে যাওয়ার কথা আছে মেসির। এরপর মুম্বাই হয়ে ১৫ ডিসেম্বর দিল্লি দিয়ে শেষ হবে এই ট্যুর।

চরম বিশৃঙ্খলায় নির্ধারিত সময়ের আগেই মাঠ ছেড়েছেন মেসি : লিওনেল মেসিকে এক ঝলক দেখার উন্মাদনায় কলকাতার সল্টলেকের যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে সৃষ্টি হয় চরম বিশৃঙ্খলা। ভিড় সামলাতে ব্যর্থ হয় পুলিশ-প্রশাসন ও আয়োজকরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন আর্জেন্টাইন ফুটবল মহাতারকা লিওনেল মেসি। অনুষ্ঠান শুরুর কিছুক্ষণের মধ্যেই মাঠের ভেতরে মেসিকে ঘিরে অস্বাভাবিক ভিড় জমে যায়। এর ফলে গ্যালারিতে বসা বহু দর্শক প্রিয় তারকাকে ঠিকভাবে দেখতে পাননি। এই ক্ষোভ থেকেই দর্শকাসন থেকে মাঠের দিকে পানিভর্তি বোতল ছোড়া শুরু হয়। মাত্র ২০ মিনিটের মধ্যেই নিরাপত্তাজনিত কারণে মেসিকে মাঠ থেকে সরিয়ে নেয়া হয়। কনভয়ের মাধ্যমে তাকে দ্রুত স্টেডিয়ামের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। প্রত্যক্ষদর্শী ও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, অনুষ্ঠানের সময় স্থানীয় কিছু রাজনীতিবিদের মেসিকে ঘিরে থাকার ঘটনায় দর্শকদের মধ্যে প্রথম অসন্তোষ দেখা যায়। এরপর নির্ধারিত সময়ের আগেই মেসিকে মাঠ থেকে দ্রুত সরিয়ে নেয়া হলে ভক্তদের ক্ষোভ বাঁধ ভেঙ্গে যায়। ভিডিওতে দেখা যায়, উত্তেজিত জনতা ব্যারিকেড ভেঙ্গে ফেলছে এবং মাঠের ভেতরে বোতল ও চেয়ার ছুড়ছে। কিছু পুলিশ সদস্যকে ভাঙ্গা চেয়ার দিয়ে মাথা বাঁচানোর চেষ্টা করতে দেখা যায়। একপর্যায়ে হাজার হাজার মানুষ ফেন্সিং ভেঙ্গ মাঠে ঢুকে পড়ে। কয়েকজন দর্শক মাঠের ধারে রাখা তাঁবুতে আগুন দেয়ার চেষ্টা করেন। এছাড়া গোল পোস্টের জাল ছিঁড়ে ফেলা হয় এবং সাজঘরে যাওয়ার টানেলের ছাউনিও ভেঙ্গ দেয়া হয়। এমন পরিস্থিতিতে দুপুর ২টায় কলকাতা ছাড়ার কথা থাকলেও নিরাপত্তাজনিত কারণে মেসি শহর ছাড়েন দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে।

তদন্ত কমিটি গঠন : সল্টলেক স্টেডিয়ামে ফুটবল কিংবদন্তি লিওনেল মেসিকে এক ঝলক দেখার আশায় আসা হাজার হাজার ভক্ত হতাশ হয়ে ক্ষোভে ফেটে পড়েছিলেন। পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে স্টেডিয়াম এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং ঘটে নানা অপ্রীতিকর ঘটনা। এই দুঃখজনক ঘটনার জন্য পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি প্রকাশ্যে মেসির নিকট ক্ষমা চেয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ দেয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, সল্টলেক স্টেডিয়ামে যা ঘটেছে, তাতে তিনি গভীরভাবে মর্মাহত ও স্তম্ভিত। এই মুখ্যমন্ত্রী লেখেন, ‘সল্টলেক স্টেডিয়ামে আজ যে অব্যবস্থা দেখা গেল, তাতে আমি স্তম্ভিত, মর্মাহত। আমি স্টেডিয়ামে যাচ্ছিলাম, অজস্র ক্রীড়াপ্রেমীদের মতোই প্রিয় ফুটবলার মেসিকে দেখতে। এই দুঃখজনক ঘটনার পর আমি মেসির কাছে এবং সমস্ত ভক্তের কাছে ক্ষমা চাইছি।’ এই ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখা এবং দায় নির্ধারণের জন্য রাজ্য সরকার একটি উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অসীম কুমার রায়ের নেতৃত্বে গঠিত এই কমিটিতে মুখ্য সচিব এবং স্বরাষ্ট্র ও পার্বত্য বিষয়ক দফতরের অতিরিক্ত মুখ্য সচিবও অন্তর্ভুক্ত থাকবেন। কমিটি ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করবে, দায়ীদের চিহ্নিত করবে এবং ভবিষ্যতে যাতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট সুপারিশ দেবে।

শাহরুখ-মেসির সাক্ষাৎ : সব অপেক্ষায় অবসান ঘটিয়ে ১৪ বছর পর কলকাতায় ঝটিকা সফরে এসেছেন বিশ্বকাপজয়ী আর্জেন্টাইন অধিনায়ক লিওনেল মেসি। এই সফরে তার সঙ্গে ছিলেন দীর্ঘদিনের দুই বন্ধু লুইস সুয়ারেস ও রদ্রিগো দি পল। কলকাতায় বেশ কিছু কার্যক্রমে শনিবার হাজির হন মেসি। কলকাতাভিত্তিক গণমাধ্যম আনন্দবাজারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাতে অবতরণের পর ভোরে বলিউড বাদশাহ শাহরুখ খানের সঙ্গে দেখা হয় মেসির। ছেলে আব্রামকে সঙ্গে নিয়ে কলকাতায় এসেছিলেন শাহরুখ। হোটেলেই দেখা হয় তাদের। দেখা হওয়ার পর আব্রামকে কাছে টেনে নেন মেসি। তাদের আলাপ করিয়ে দেন মেসিকে ভারতে নেয়ার কারিগর শতদ্রু দত্ত। কুশল বিনিময়ের পর তোলা হয় ছবিও। দুই ঘরানার এই দুই তারকার মাঝে ছিলেন সুয়ারেস। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে মেসি সোজা চলে যান তার হোটেলে। সেখানে মেসিকে স্বাগত জানানোর জন্য তার অনেক ভক্ত উপস্থিত ছিলেন। হোটেলে কয়েক ঘণ্টা বিশ্রাম নিয়েই তৈরি হয়ে নিতে হয় তাকে। শনিবার সকাল সাড় ৯ টা থেকে সাড়ে ১০ টা পর্যন্ত মিট অ্যান্ড গ্রিট পর্ব। সকাল সাড়ে ১০ টা থেকে সোয়া ১১ টা পর্যন্ত ভার্চুয়ালি নিজের মূর্তি উন্মেচন করেন এলএম টেন। এরপর যুবভারতীতে একটি ম্যাচ খেলতে গেলে তৈরি হয় বিশৃঙ্খলা। এর কারণে আগে-ভাগেই মাঠ ছাড়তে হয় তাকে। এরপর চলে যান হায়দরাবাদে। সেখানে সন্ধ্যা ৭টার সময় ‘গোট কাপ’ নামের একটি ফুটবল প্রতিযোগিতার উদ্বোধন করেন মেসি। সেখানে থাকবেন তেলঙ্গানার মুখ্যমন্ত্রী রেবন্ত। রাজীব গান্ধী আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামে হবে অনুষ্ঠান। একটি ফুটবল ম্যাচেও খেলার কথা রয়েছে মেসির। এরপর মেসিকে সম্মান জানিয়ে একটি সঙ্গীতানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। রাত ৯টা নাগাদ মেসি যাবেন ফলকনামা প্যালেসে। সেখানে বাছাই করা ব্যক্তিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন তিনি। রাতে থাকবেন হায়দরাবাদেই।

আজ ১৪ ডিসেম্বর মুম্বাই যাবেন মেসি। সেখানে ক্রিকেট ক্লাব অফ ইন্ডিয়ায় ‘প্যাডেল কাপ’-এ অংশ নেবেন তিনি। এ সময় থাকতে পারেন শচীন টেন্ডুলকার। ৪ টার দিকে গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে একটি ফুটবল ম্যাচ আছে। থাকতে পারেন সুনীল ছেত্রী। যদিও অনিশ্চিত মেসির খেলা। বিকেল ৫টার দিকে ওয়াংখেড়েতে যাওয়ার কথা মেসির। সেখানে তাকে সংবর্ধনা দেয়া হবে। উপস্থিত থাকবেন জন আব্রাহাম, কারিনা কাপুর, জ্যাকি শ্রফসহ বলিউড তারকারা। রোহিত শর্মা-মহেন্দ্র সিং ধোনিদেরও দেখা যেতে পারে। ১৫ ডিসেম্বর দিল্লি যাবেন মেসি। দেখা করবেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে। কয়েকটি অনুষ্ঠানে যোগ দেয়ার পর ওইদিন বিকেলেই ভারত ছাড়ার কথা আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি ফুটবলার মেসির।