সাফ অনূর্ধ্ব-২০ এর ফাইনালে ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশের রোনান সুলিভান পানেনকা গোলে দেশকে চ্যাম্পিয়ন করেছেন। টাইব্রেকারে তার শেষ শটে ৪-৩ ব্যবধানে জিতে ট্রফি হাতে নিয়েছে বাংলাদেশ। পানেনকার ইতিহাস ৫০ বছরের পুরোনো। ১৯৭৬ সালে প্রথমবার এই বিস্ময়কর শটের উদ্ভাবন করেন আন্তোনিন পানেনকা। মাসখানেক আগেও ক্লাব বোহেমিয়ান্সের হয়ে স্থানীয় প্রতিদ্বন্দ্বী ডুকলা প্রাগের বিপক্ষে একইভাবে গোল করেছিলেন। কিন্তু ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে সারা বিশ্ব দেখে তার ওই শট। তখনকার ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে দুই গোলে পিছিয়ে থাকার পর চেকোস্লোভাকিয়া সমতা ফিরিয়ে ম্যাচ নেয় অতিরিক্ত সময়ে। পরে ম্যাচ গড়ায় পেনাল্টি শুটআউটে। প্রথম সাতটি কিকে গোল হয়। জার্মানদের হয়ে উলি হোয়েনেস গোল মিস করেন। পানেনকা সুযোগ পান নায়ক হওয়ার।

জার্মানি ও বায়ার্ন মিউনিখের লিজেন্ডারি গোলকিপার সেপ মায়ের সামনে। পানেনকা খেললেন বুদ্ধির খেলা। খুব সহজ একটা শট নিলেন। বল তুলে দিলেন গোলপোস্টের মাঝ বরাবর। মায়ের তার বাঁ দিকে ডাইভ দিয়েছিলেন। বল সহজেই জালে জড়াল। ফুটবল ইতিহাসে জন্ম নিলো নতুন এক শটের। ১২ গজ দূর থেকে নেওয়া ওই বৈপ্লবিক শটকে ব্রাজিলিয়ান লিজেন্ড লে বর্ণনা করেছিলেন, ‘হয় এটা জিনিয়াসের কাজ নয়তো একজন পাগলের’। অনেকের দাবি ছিল, পানেনকার ওই শট ছিল ‘শো অফ’। উয়েফা ডটকমকে তিনি বলেছিলেন, ‘আমার সন্দেহ হয়, মায়ের হয়তো আমার নাম শুনতে খুব একটা পছন্দ করে না। আমি কখনো তাকে হাসির পাত্র বানাতে চাইনি। আমি এই পেনাল্টি বেছে নিয়েছিলাম কারণ আমার মনে হয়েছিল এবং বুঝতে পারছিলাম যে গোল করার জন্য এটা সবচেয়ে সহজ ও সরল উপায়। এটা সরল উপায়।’

১৯৭৬ সালে এই কৌশল উদ্ভাবনের পর ফুটবলের রথি-মহারথিরা এভাবে গোল করেছেন বা চেষ্টা করে গেছেন, তাও আবার বড় বড় মুহূর্তে। সম্ভবত সবচেয়ে বিখ্যাত পানেনকার দেখা মিলেছিল ২০০৬ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে। জিনেদিন জিদান ইতালির বিপক্ষে ফ্রান্সকে ১-০ গোলে এগিয়ে দেন। জিয়ানলুইজি বুফন ডানদিকে ঝাঁপিয়েছিলেন। কিন্তু বল গোলপোস্টের মাঝ বরাবর ক্রসবারে লেগে গোললাইন অতিক্রম করে। তবে ম্যাচটি জিজুর জন্য ছিল হতাশাজনক। মেজাজ হারিয়ে মাতারাজ্জিকে ঢুঁশ দিয়ে লাল কার্ড দেখেন এবং শুটআউটে ফ্রান্স হেরে যায়। কিন্তু তার ওই গোলের মুহূর্তটি ফুটবলের রূপকথা হয়ে ছিল।

এই পেনাল্টিতে গোল করে স্মরণীয় হয়ে আছেন আন্দ্রে পিরলো। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ইউরো ২০১২ শুটআউটে পানেনকা গোল করেন ইতালি গ্রেট। তিনি এই গোলের ব্যাখ্যাও দিয়েছেন, ‘শেষ সেকেন্ডে আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, যখন দেখলাম জো হার্ট, ইংল্যান্ডের গোলকিপার, তার লাইনে দাঁড়িয়ে কসরত করছিল। আমি আমার রানআপ শুরু করলাম, তখনো সিদ্ধান্ত নেইনি কী করতে যাচ্ছি। যখন সে একটু নড়ল, আমার সিদ্ধান্ত নিলাম। এটা ছিল তড়িৎ সিদ্ধান্ত, পূর্বপরিকল্পিত নয়। শতভাগ স্কোর করার জন্য এটাই তখন একমাত্র সুযোগ ছিল।’

আধুনিক ফুটবলে আর্জেন্টাইন আইকন লিওনেল মেসি বহুবার এই কৌশল প্রয়োগ করেছেন। বার্সেলোনার জার্সিতে লা লিগা ও চ্যাম্পিয়ন্স লিগে তার এমন জাদুকরী গোল দেখা যেত প্রায় সময়। রিয়াল মাদ্রিদে খেলার সময় করিম বেনজেমার একটি সফল পানেনকাও ছিল দেখার মতো। এডারসনের সামনে দাঁড়িয়ে ঠাণ্ডা মাথায় তাকে বোকা বানান ফরাসি তারকা। এক ম্যাচে দুইবার পানেনকা থেকে গোল করার কীর্তি ছিল আব্রিউর। ২০১১ সালে ফ্লুমিনেন্সের মাঠে তার জোড়া পানেনকা গোলে ৩-২ এ ঘুরে দাঁড়ানো জয় পেয়েছিল বোটাফোগো।

পানেনকা শট নেওয়ার সময় এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক খেলা চলে। ঝুঁকিও থাকে। তবে শেষ পানেনকার গল্পটা সাফল্যের, যাতে রয়েছে বাংলাদেশের নাম। করেছেন রোনান সুলিভান। যাকে মনে করা হচ্ছে বাংলাদেশের নতুন তারকা।

আমেরিকান প্রবাসী এই ফুটবলার মালদ্বীপের মালেতে হাজারো দর্শক-সমর্থকদের সামনে চাপের মুহূর্তে মাথা ঠাণ্ডা রাখলেন, যখন তার সতীর্থ স্যামুয়েল আগের শট ক্রসবারে মেরেছিলেন। তার ডানপায়ের আলতো টোকায় বল ফাঁকা গোলপোস্টের মাঝখান দিয়ে জালে জড়াল। তার আগেই ডানদিকে ঝাঁপ দিয়েছিলেন সুরাজ সিং। ভারতীয় গোলকিপার যেন থ বনে গেলেন। কতটা আত্মবিশ্বাস আর জিনিয়াস হলে এমন কঠিন মুহূর্তে এত সরলভাবে গোল করা যায়!

পেলের সেই কথাই ঠিক, এমন চাপে থেকেও এভাবে সহজ-সরল গোলের উপায় বেছে নেওয়া হয় পাগলামি নয়তো কোনো জিনিয়াসের কাজ। সাফে গিয়ে রোনান বাংলাদেশকে যেভাবে ফাইনালে তুলেছেন, তাতেই তার প্রতিভার ঝলক দেখা গিয়েছিল। অভিষেকে জোড়া গোল, দ্বিতীয় ম্যাচে অ্যাসিস্ট। শেষটাও করলেন জিদান, পিরলোদের মতো জিনিয়াসদের মনে করিয়ে। সিনিয়র দলে ডাক পাবেন কি পাবেন না, তা সময়ের কাছে তোলা থাক। এই অল্প সময়ে যা করে দেখালেন রোনান, তা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।