২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের ট্রফি আর ট্র্যাজেডির মাঝে দাঁড়িয়ে আর মাত্র একটি ম্যাচ। বিশ্ব ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট কার মাথায় উঠবে, তা নির্ধারণে প্রস্তুত নিউ ইয়র্কের মেটলাইফ স্টেডিয়াম। আগামী ২০ জুলাই বাংলাদেশ সময় রাত ঠিক ১টায় শিরোপা নির্ধারণী ফাইনালে মুখোমুখি হচ্ছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা এবং ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন স্পেন। একদিকে ট্রফি ধরে রেখে ইতিহাসের পাতায় অমর হওয়ার হাতছানি, অন্যদিকে ১৬ বছর পর স্প্যানিশ সাম্রাজ্য পুনরুত্থানের স্বপ্ন। আক্ষরিক অর্থেই এটি বিশ্বফুটবলে ইউরোপ আর লাতিন আমেরিকার ফুটবল দর্শনের এক চরম সংঘাত, যা দেখার জন্য বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমী প্রহর গুনছেন। এই মহাদ্বৈরথের মহারণের আগে মেটলাইফ স্টেডিয়ামে জমকালো এক সমাপনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে, যেখানে বিশ্বখ্যাত তারকাদের গান ও চোখ ধাঁধানো পারফরম্যান্সের মধ্য দিয়ে পর্দা নামবে উত্তর আমেরিকার এই ঐতিহাসিক বিশ্বযজ্ঞের।

এই ফাইনালকে ঘিরে ফুটবল বিশ্ব অবলোকন করছে এক অবিশ্বাস্য সমীকরণ, যার বীজ বপন হয়েছিল আজ থেকে প্রায় দেড় যুগ আগে। ২০০৭ সালের ডিসেম্বরে বার্সেলোনায় ইউনিসেফ ও স্থানীয় একটি সংবাদপত্রের যৌথ উদ্যোগে চ্যারিটি ক্যালেন্ডারের ফটোশুটে পাঁচ মাস বয়সী এক শিশুকে গোসল করিয়েছিলেন ২০ বছর বয়সী তরুণ লিওনেল মেসি। সময়ের চাকা ঘুরে সেই শিশুই আজ স্পেনের প্রধান আক্রমণের অস্ত্রÑলামিন ইয়ামাল। ৪ হাজার ৮০০ কোটিতে মাত্র এক ভাগ সম্ভাবনা থাকা এই কাকতালীয় ও বিরল ঘটনাটিই এখন বিশ্বকাপের মূল আলোচনা। ৩৯ বছর বয়সী মহাতারকা মেসির ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বমঞ্চের ফাইনাল এটি। তাঁর সামনে সুযোগ আর্জেন্টিনার জার্সিতে চতুর্থ তারকা যুক্ত করার। অপরদিকে, সদ্য ১৯ বছরে পা রাখা তরুণ বিস্ময় ইয়ামাল প্রস্তুত স্পেনের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ এনে দিতে। ফাইনালের আগে স্মৃতিকাতর মেসি জানিয়েছেন, ইয়ামাল এক বিশাল প্রতিভা, তবে সে যাতে এবার ইতিহাস গড়তে না পারে, তার জন্য তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন।

দুই দলের খেলার ধরন ও দর্শন প্রায় একই রকম। বল পায়ে রেখে মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণ করতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে স্পেন ও আর্জেন্টিনা। স্পেনের মাঝমাঠের মূল চালিকাশক্তি তথা ২০২৪ ব্যালন ডি'অর জয়ী তারকা রদ্রি আর্জেন্টিনার শারীরিক ও গতিময় ফুটবল নিয়ে বেশ সতর্ক। মাঠের সম্ভাব্য স্লেজিং বা উসকানি প্রসঙ্গে রদ্রি স্পষ্ট জানিয়েছেন, আর্জেন্টিনা অত্যন্ত শারীরিক ফুটবল খেলবে এবং সস্তা কোনো কৌশলের আশ্রয় না নিয়ে নিজেদের আসল খেলাটা খেলবে। অন্যদিকে মেসিকে আটকানোর প্রশ্নে স্পেন কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে দুই দশক আগের এক স্মৃতি মনে করে জানান, মেসিকে কোনো ম্যান-মার্কিং করা হবে না, তবে তাঁর প্রতি বিশেষ জোনাল মনোযোগ থাকবে। ফরাসিদের বিপক্ষে সেমিফাইনালে উরুতে আঘাত পাওয়া ইয়ামাল পুরোপুরি ফিট হয়েই মাঠে নামছেন বলে নিশ্চিত করেছেন স্প্যানিশ বস।

১৯৬২ সালে ব্রাজিলের পর আর কোনো দল পরপর দুবার বিশ্বকাপ জিততে পারেনি। স্পেনের বিপক্ষে ঐতিহাসিক ফাইনাল জিততে পারলে এই দুর্লভ রেকর্ডে ভাগ বসাবে আর্জেন্টিনাও। নকআউট পর্বে কেপ ভার্দে, মিশর ও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে পিছিয়ে পড়েও নাটকীয়ভাবে ঘুরে দাঁড়ানো আর্জেন্টিনার লড়াকু মানসিকতার পরিচয় দেয়। প্রতিপক্ষকে সমীহ করে আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনি বলেছেন, স্পেন যখন হোটেল থেকে বের হয়, তখন থেকেই তাঁর দুশ্চিন্তা শুরু হয়। তবে দলের গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজ ও কোচ স্কালোনির সবচেয়ে বড় শক্তি আর্জেন্টিনার পাগলাটে সমর্থকেরা, যাদের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য তারা মাঠে নিজেদের সর্বোচ্চ উজাড় করে দিতে প্রস্তুত।

ফাইনাল পরিচালনার ঐতিহাসিক দায়িত্ব পেয়েছেন স্লোভেনিয়ার ৪৬ বছর বয়সী অভিজ্ঞ রেফারি স্লাভকো ভিনচিচ। ভিনচিচের বিশ্বকাপ অভিষেক হয়েছিল ২০২২ সালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে সৌদির সেই ঐতিহাসিক হারের ম্যাচে। ফলে দুই দলেরই বিশেষ নজর থাকবে রেফারিংয়ের দিকে। এদিকে ফাইনালের মাঠের বাইরেও রয়েছে কিছু চমক। আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত কুসংস্কারের কারণে মাঠে উপস্থিত না থেকে নিজের বাসভবনে বসেই খেলা দেখবেন এবং সৌবাহিনীর প্রতীক হিসেবে একটি বিশেষ জ্যাকেট পরিধান করবেন। তবে গ্যালারিতে উপস্থিত থাকবেন স্পেনের রাজা ষষ্ঠ ফিলিপ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, যিনি ফাইনাল শেষে বিজয়ীদের হাতে সোনালি ট্রফি তুলে দেবেন। এছাড়া এবারই প্রথম বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলের খেলোয়াড়দের জন্য বিশেষ ৩০টি বিজয়ী আংটি উপহার দেওয়া হবে। ইউরোপীয় পাসিং ফুটবলের শৈল্পিক সৌন্দর্য বনাম লাতিন আমেরিকার রিদম আর শারীরিক ফুটবলের তীব্র লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত কে হাসবে হাসি, তার উত্তর মিলবে মেটলাইফের সবুজ গালিচায়।