বিশ্বকাপে এবারও দেখা যাবেনা ইতালিকে। আগামী ১১ জুন থেকে ১৯ জুলাই বিশ্বকাপের ২৩তম আসর বসবে যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায়। কিন্তু ওই সময়ে দর্শক হয়েই থাকতে হবে জেনারো গাত্তুসোর দলকে। সাম্প্রতিক তিন আসরে খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে ব্যর্থ দেশটির অতীত ইতিহাস ম্লান হতে বসেছে। সাবেক চ্যাম্পিয়নদের মধ্যে ইতালিই প্রথম দল, যাদের টানা তিন বিশ্বকাপে দেখা যাবে না। ইতালির ধারাবাহিক এই ব্যর্থতার নেপথ্যে তারকা ফুটবলারের অভাব, ঘরোয়া ফুটবলের দুর্বলতাসহ কিছু বিষয় প্রভাব রেখেছে। ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপের অন্যতম সফল দল ইতালি। চারবারের শিরোপাজয়ী দেশটি ১৮টি বিশ্বকাপ আসরে অংশ নিয়েছিল। তার ছোঁয়ায় দুই আসর পর বিশ্বকাপে ফেরার আশা তৈরি হলেও ৬৬তম র্যাঙ্কিংধারী বসনিয়া-হার্জেগোভিনার কাছে টাইব্রেকারে হেরে বিদায় নিয়েছে ইতালি। ২০১৮ বিশ্বকাপের আগে সুইডেন এবং ২০২২ বিশ্বকাপের আগে নর্থ মেসিডোনিয়ার কাছে একই পর্যায়ে হেরে তারা ছিটকে গিয়েছিল। ইতালির কেন ব্যর্থ তার কিছু কারণ চিহ্নিত করেছে বার্তাসংস্থা এপি।
২০০৬ সালের বিশ্বকাপজয়ী দলে আলেসান্দ্রো দেল পিয়েরো, ফ্রান্সেসকো টট্টি ও আন্দ্রে পিরলোর মতো বিশ্বমানের ফুটবলাররা ছিলেন। কিন্তু অনেকদিন ধরেই বর্তমান দলে সেই মানের তারকা নেই। বর্তমান স্কোয়াডে সবচেয়ে দামি খেলোয়াড় মিডফিল্ডার সান্দ্রো টোনালি, যাকে ২০২৩ সালে নিউক্যাসল প্রায় ৮০ মিলিয়ন ইউরোতে দলে ভেড়ায়। এ ছাড়া দলের একমাত্র বিশ্বমানের খেলোয়াড় হিসেবে ধরা হয় গোলরক্ষক জিয়ানলুইজি দোন্নারুমাকে। আক্রমণভাগে আছেন আর্জেন্টিনায় জন্ম নেওয়া মাতেও রেতেগুই এবং ফিওরেন্টিনার মইসে কিন।
ইতালিয়ান লিগ সিরিÑআ বিশ্বের সেরা ক্লাব প্রতিযোগিতা ছিল ১৯৮০ ও ১৯৯০ দশকে। তখন দিয়েগো ম্যারাডোনা, মার্কো ভ্যান বাস্তেন ও রুড গুলিত নিজেদের ক্যারিয়ারের সেরা সময়ে সেখানে খেলেছেন। ২০০৭ সালে ব্রাজিলিয়ান মিডফিল্ডার কাকা এসি মিলানের হয়ে ব্যালন ডি’অর জিতেছিলেন, ইতালির ক্লাবে খেলে এটাই শেষ অর্জন। অথচ বর্তমানে ক্যারিয়ারের শেষদিকে থাকা খেলোয়াড়রা লিগটিতে খেলতে যান। লুকা মদ্রিচ ও জেমি ভার্ডি এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ। আন্তর্জাতিক মানের ফুটবলারের অভাবে মান কমছে লিগের, জাতীয় দলেও এর প্রভাব পড়ছে। ইতালিতে বর্তমানে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠছে টেনিস। প্রথম ইতালীয় হিসেবে ২০২৪-২৫ মৌসুমে বিশ্বের ১ নম্বর স্থান অর্জন করেন ইয়ানিক সিনার, শিরোপা জিতেছেন অস্ট্রেলিয়ান ওপেন ও ইউএস ওপেনে। ২০২৬ সালে কোনো সেট না হেরেই ‘সানশাইন ডাবল’ (ইন্ডিয়ান ওয়েলস ও মিয়ামি) জয়ী প্রথম পুরুষ খেলোয়াড়ও তিনি। সিনারের সাফল্যে ইতালিতে টেনিসের জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়ছে। অনেক তরুণ এখন ফুটবলের বদলে টেনিসে ঝুঁকছে। এক জরিপে দেখা গেছে, ২০২৫ সালে ২ কোটি ১৬ লাখ ইতালিয়ান ফুটবলভক্ত হলেও প্রায় ২ কোটি মানুষ টেনিস ও প্যাডেল দেখেন। এ ছাড়া ফর্মুলা ওয়ানেও কিমি অ্যান্তোনেলি’র মতো তরুণরা সাফল্য পাচ্ছেন। ফলে খেলাধুলায় আগ্রহের ক্ষেত্র বৈচিত্র্যময় হয়ে উঠছে।
ইতালির ক্লাব ফুটবলে ‘আল্ট্রাস’ নামে সংগঠিত সমর্থকগোষ্ঠী থাকলেও ইতালি জাতীয় দল সেভাবে ধারাবাহিক সমর্থন পায় না। দলটির কোচ জেনারো গাত্তুসো বলেছেন, বড় স্টেডিয়ামে খেললে দর্শকরা দ্রুতই অসন্তোষ প্রকাশ করেন, যা খেলোয়াড়দের ওপর চাপ তৈরি করে।
ইতালি এখনও নতুন ও আধুনিক স্টেডিয়াম নির্মাণে ইউরোপের অন্যান্য দেশের তুলনায় পিছিয়ে। জুভেন্তাস ছাড়া বড় ক্লাবগুলোর নিজস্ব আধুনিক স্টেডিয়াম নেই। মিলান ও ইন্টার নতুন স্টেডিয়াম নির্মাণের পরিকল্পনা করলেও তা এখনও বাস্তবায়ন হয়নি। একইভাবে রোমাও দীর্ঘদিন ধরে নিজস্ব স্টেডিয়াম নির্মাণের অনুমতির অপেক্ষায়। অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে ক্লাবগুলো পর্যাপ্ত আয় করতে পারে না, ফলে বিদেশি ধনী ক্লাবগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত জাতীয় দলের ওপরও পড়ছে।