অভিনব প্রতিবাদে আমেরিকান বোমা হামলায় প্রাণ হারানো শিশুদের স্মরণ করেছে ইরান ফুটবল দল। তুরস্কের আনতালিয়ায় নাইজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের আগে কালো আর্মব্যান্ড পরে এবং হাতে স্কুলব্যাগ নিয়ে মাঠে নামে ‘পারসিয়ান লায়ন্সরা’। চলতি মাসের শুরুতে মিনাবের এক স্কুলে মার্কিন বোমা হামলায় ১৬৫ শিশু প্রাণ হারায়। হাতে স্কুলব্যাগ, চোখে জল, দেশজুড়ে যখন যুদ্ধের দামামা, তখন হাজারো মাইল দূরে দেশের প্রতিনিধিত্ব করা ইরান ফুটবল দলের এই প্রতিবাদ যেন মার্কিনিদের কথিত বর্বরতার কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। চলতি যুদ্ধের প্রথম দিন, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ইরানের মিনাব শহরের শাজারেহ তায়েবেহ স্কুলে আমেরিকার বোমা হামলায় ১৬৫ শিশু প্রাণ হারায়। তুরস্কের আনতালিয়ায় নাইজেরিয়ার বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচের আগে ইরান দল এই অভিনব প্রতিবাদ জানায়। তুরস্কের বেলেকে নাইজেরিয়ার বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচ শুরুর আগে জাতীয় সংগীত চলাকালীন এই নীরব ও শক্তিশালী প্রতিবাদ জানান ইরানি ফুটবলাররা। ম্যাচ শুরুর আগে দেখা যায়, ইরানি ফুটবলারদের প্রত্যেকের হাতে ছিল গোলাপি ও বেগুনি রঙের স্কুলব্যাগ। মূলত নিহত ছাত্রীদের স্মরণে এবং তাদের প্রতি মমতা প্রকাশ করতেই বুক ঘেঁষে এই ব্যাগগুলো ধরে রেখেছিলেন তারা। এছাড়া বাহুতে পরা ছিল শোকের প্রতীক কালো আর্মব্যান্ড। ইরান দলের এক মুখপাত্র জানান, ১৬৫ জন নিহত ছাত্রীর স্মরণে এবং মার্কিন বাহিনীর নৃশংস হামলার বিরুদ্ধে এটি ছিল বিশ্ববাসীর কাছে তাদের প্রতিবাদের ভাষা। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের মিনাব শহরের 'শাজারে তাইয়েবা' বালিকা বিদ্যালয়ে ভয়াবহ বিমান হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্যমতে, এই হামলায় অন্তত ১৬৮ জন শিশু এবং ১৪ জন শিক্ষক ও কর্মচারী নিহত হয়েছেন। যদিও মার্কিন সামরিক তদন্তকারীরা এই হামলার দায় তাদের বাহিনীর হতে পারে বলে প্রাথমিক ধারণা দিচ্ছে, তবে চূড়ান্ত তদন্ত রিপোর্ট এখনও প্রকাশ করা হয়নি। ইরান ফুটবল ফেডারেশন নিরাপত্তা শঙ্কায় তাদের বিশ্বকাপের ম্যাচগুলো যুক্তরাষ্ট্র থেকে মেক্সিকোতে সরিয়ে নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছিল। তবে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রে ইরানি খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা নিয়ে এক ধরণের অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ রয়েই গেছে। নাইজেরিয়ার বিপক্ষে এই প্রীতি ম্যাচটিতে লড়াই করেও ২-১ ব্যবধানে হেরেছে ইরান। বিশ্বকাপের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে আগামী মঙ্গলবার তুরস্কের বিপক্ষে তাদের পরবর্তী প্রীতি ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ইরান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট মেহদি মোহাম্মাদ নবী বলেন, মিনাবে আমাদের শিশুদের ওপর নির্মমভাবে দু’বার বোমা হামলা করা হয়েছে। এটি শুধু আক্রান্ত পরিবারগুলোর জন্যই নয়, পুরো দেশ এবং জাতীয় দলের ফুটবলারদের জন্যও চরম কষ্টের। আজকের প্রতিবাদের মাধ্যমে আমরা মিনাবের শিশুদের স্মরণ করছি। একইসঙ্গে বিশ্বকে জানাতে চাই, নির্বিচারে শিশু হত্যা কেবল অন্যায়ই নয়, এটি গভীর মানবিক কষ্টের কারণ। পেশাদার হলেও খেলোয়াড়রা আবেগের বাইরে নন। দেশ ও দেশের মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ থেকেই এমন প্রতিবাদ, জানিয়েছে ইরান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন। তবে আবেগঘন ম্যাচে ইরান জিততে পারেনি; আফ্রিকান ঈগলসের কাছে ২-১ গোলে হেরে যায় তারা। ইরানের স্কুলে হামলার ঘটনায় বিশ্বজুড়ে সমালোচনার ঝড় উঠলেও শুরুতে তা অস্বীকার করে যুক্তরাষ্ট্র। পরে অবশ্য মার্কিন গণমাধ্যম জানায়, ভুলবশত রক্তক্ষয়ী ওই হামলা চালিয়েছিল ট্রাম্প প্রশাসন। বিষয়টি নিয়ে দ্রুত প্রতিবেদন প্রকাশের আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক। যুদ্ধের জেরে ইরানের বিশ্বকাপে অংশগ্রহণও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। যদিও প্রস্তুতির অংশ হিসেবে তুরস্কের আমন্ত্রণে চার জাতির টুর্নামেন্টে অংশ নিচ্ছে দেশটি। দ্বিতীয় ম্যাচে আগামী মঙ্গলবার তাদের প্রতিপক্ষ কোস্টারিকা।