স্পোর্টস রিপোর্টার

প্রথমবারের মতো এএফসি এশিয়ান কাপের চূড়ান্ত পর্বে অংশ নিতে অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশ্যে বৃহস্পতিবার গভীর রাতে ঢাকা ছেড়েছে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল। দেশ ছাড়ার আগে এদিন দুপুরে বাফুফে ভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ দলের ইংলিশ কোচ পিটার বাটলার ক্ষোভের সুরে কথা বলেছেন। দল ঘোষণা করলে ও প্রস্তুতিতে মোটেও সন্তুষ্ট নন ইংলিশ কোচ। প্রস্তুতিতে ঘাটতি এবং বাফুফের অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনা নিয়ে নিজের জমানো ক্ষোভ সরাসরি তুলে ধরেছেন। স্পষ্ট ভাষায় বাফুফে কর্তাদের ফুটবলীয় জ্ঞান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। বাফুফের মতো সংগঠনের যে পেশাদারত্ব দরকার, সেটা বোঝাতে গিয়েই অমন মন্তব্য করেন বাটলার। তিনি বলেন, ‘হয়তো এই বাফুফেতে সবাই ফুটবলকে সেভাবে বোঝেন না। জীবনে যেমন হয়, ফুটবলও তেমন। অনেক সময় আপনি জয় আর ফলাফল দিয়ে ফাটলগুলো কাগজ দিয়ে ঢেকে রাখেন। কিন্তু বিষয়টা শুধু প্রথম ১০ মিনিটে ২ গোল করা, তার পরের ২০ মিনিটে আবার ২ গোল করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিষয়টা হলো, এমন পারফরম্যান্স গড়ে তোলা, যেখানে বিশ্বাসযোগ্য, মানসম্মত পারফরম্যান্সের ওপর দাঁড়িয়ে ভবিষ্যৎ নির্মাণ করা যায়।’ বাফুফের ওপর দায় চাপিয়ে বাটলার আরও যোগ করেন, ‘আমি লাইবেরিয়া, বতসোয়ানা, ইংল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় কাজ করেছি। আমি কারও হাতের পুতুল নই। যখন সবকিছু গোলমেলে হয়ে যায়, তখন সবাই বলে এটা “বাটলারের দোষ” বা “বাটলারের পরিকল্পনা”। আমি এই দলের জন্য দায়বদ্ধ হতে রাজি, কিন্তু তার আগে লোকেদের মিডিয়ার কাছে গিয়ে মিথ্যা বলা বন্ধ করতে হবে।’ ডিসেম্বরের পর আর প্রস্তুতি ম্যাচ না হওয়া প্রসঙ্গে বাটলার সরাসরি কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন বাফুফেকে। তাঁর মতে, জাতীয় দলের প্রস্তুতির চেয়ে ঘরোয়া লিগকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। বাটলার জানান, ১৯ ফেব্রুয়ারি ফিলিপাইনের বিপক্ষে খেলার কথা থাকলেও লিগের ম্যাচ পেছানোর ফলে ১০ ও ১৩ ফেব্রুয়ারি দুটি লিগ ম্যাচ খেলতে হয়েছে। ফলে মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলা অসম্ভব হয়ে পড়ে। একই সমস্যা হয়েছে মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডের বিপক্ষে প্রস্তাবিত ম্যাচের ক্ষেত্রেও। এ প্রসঙ্গে বাটলার বলেন, ‘আমি বাস্তব জগতে বাস করি, রূপকথার রাজ্যে নয়। প্রস্তুতির চেয়ে লিগ বেশি অগ্রাধিকার পেয়েছে, যা আদর্শ মানের হয়নি।’ তিনি বলেন, ‘আমি রিঅ্যাকটিভ হওয়ার চেয়ে প্রোঅ্যাকটিভ হওয়া পছন্দ করি।’ দলের তরুণ তুর্কি আলপি, প্রীতি ও উমেলাদের পারফরম্যান্সে কোচ বেশ সন্তুষ্ট। বিশেষ করে প্রীতি সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘সে এখন অদম্য শক্তিতে ফিরে এসেছে। তরুণেরা এখন সিনিয়রদের ঘাড়ের ওপর নিশ্বাস ফেলছে, যা দলের জন্য ইতিবাচক।’ তবে বড় দলগুলোর বিপক্ষে ভুলের মাশুল যে ভয়াবহ হতে পারে, সে বিষয়েও সতর্ক করেন তিনি। তাঁর মতে, উজবেকিস্তান, চীন বা উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে ভুল করলে বড় ব্যবধানে হারার ঝুঁকি থাকবে। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত বাফুফের নারী কমিটির প্রধান মাহফুজা আক্তার প্রস্তুতির ঘাটতির কথা স্বীকার করে নেন। তিনি বলেন, ‘প্রস্তুতিটা আরও ভালো হতে পারত। আমি হতাশ বলব না, তবে বাইরে পাঠিয়ে ট্রেনিং বা আরও প্র্যাকটিস ম্যাচ খেলাতে পারলে তুষ্টিটা আরেকটু বাড়ত।’ সঙ্গে যোগ করেন, ‘...কিন্তু আমি একা সিদ্ধান্ত নেই না, আমার ওপর শীর্ষ কর্তারা আছেন।’ বাফুফের সর্বশেষ সিদ্ধান্ত ছিল, থাইল্যান্ডে কয়েক দিন ক্যাম্প করে এবং সেখানে একটি প্রস্তুতি ম্যাচ খেলে দল যাবে সিডনি। কিন্তু থাইল্যান্ডে ক্যাম্প হচ্ছে না। থাইল্যান্ড বাতিল হওয়ার পর ফিলিপাইনে যাওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়, সেটাও হয়নি কোচ রাজি না হওয়ায়। সব মিলিয়ে প্রস্তুতির ঘাটতি নিয়েই অস্ট্রেলিয়া গেল বাংলাদেশ দল। এই সংবাদ সম্মেলনেই এএফসি নারী এশিয়ান কাপকে সামনে রেখে ২৬ সদস্যের চূড়ান্ত দল ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে)। দলে জায়গা পেয়েছেন সুইডেন প্রবাসী ফরোয়ার্ড আনিকা রানিয়া সিদ্দিকী, অনূর্ধ্ব–১৯ দলের আলপি আক্তার ও সৌরভী আকন্দ প্রীতি। ইংলিশ কোচ পিটার বাটলার এর আগে ২৯ সদস্যের প্রাথমিক দল ঘোষণা করেছিলেন। ২৮ জানুয়ারি থেকে ৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অস্ট্রেলীয় ট্রেনার ক্যামেরন লর্ডের অধীনে ১২ দিনের ফিটনেস ক্যাম্পে অংশ নেয় সেই দল। ওই সময় বাটলার ছিলেন সদ্য সমাপ্ত সাফ অনূর্ধ্ব-১৯ নারী চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশের অনূর্ধ্ব-১৯ দল নিয়ে ব্যস্ত। প্রাথমিক দলে থাকা ২৯ জনের মধ্যে সিনহা জাহান শিখা, তনিমা বিশ্বাস, রুমা আক্তার, উম্মে কুলসুম, ফেরদৌস সোনালি, আইরিন আক্তার ও সুরমা জান্নাতসহ সাতজন বাদ পড়েছেন। অন্যদিকে নতুন করে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন সৌরভী আফরিন, মুংকি আক্তার, আলপি আক্তার ও সৌরভী আকন্দ প্রীতি।

২৬ সদস্যের বাংলদেশ দলের সদস্যরা হলেন : রূপনা চাকমা, মিলি আক্তার, স্বর্ণা রানী ম-ল, আফঈদা খন্দকার, কোহাতি কিস্কু, নাবিরান খাতুন, শিউলি আজিম, শামসুন্নাহার সিনিয়র, হালিমা খাতুন, সুরভি আক্তার আফরিন, স্বপ্না রানী, মুংকি আক্তার, আইরিন খাতুন, শাহেদা আক্তার রিপা, উমেহলা মারমা, ঋতুপর্ণা চাকমা, মনিকা চাকমা, মারিয়া মান্দা, আনিকা রানিয়া সিদ্দিকী, উন্নতি খাতুন, আলপি আক্তার, সৌরভী আকন্দ প্রীতি, মোসাম্মত সুলতানা, তহুরা খাতুন, মোসাম্মত সাগরিকা ও শামসুন্নাহার জুনিয়র।