ভারতের অনুষ্ঠিত অনূর্ধ্ব-২১ বিশ্বকাপ হকিতে শিরোপা জিতেছে জার্মানি। বুধবার রাতে চেন্নাইয়ে শিরোপা নির্ধারণী ফাইনালে স্পেনকে টাইব্রেকারে ২-১ গোলে হারিয়ে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছে জার্মান। এছাড়া আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে ব্রোঞ্জ জিতেছে স্বাগতিক ভারত। এদিকে যুব বিশ্বকাপ হকিতে প্রথমবার অংশ নিয়েই ১৭তম হয়েছে বাংলাদেশ।

অস্ট্রিয়াকে ৫-৪ গোলে হারিয়ে চ্যালেঞ্জার্স ট্রফিও জিতেছে। বাংলাদেশের ডিফেন্ডার আমিরুল ইসলাম ছয় ম্যাচে সর্বোচ্চ ১৮ গোল করেন। এর মধ্যে পাঁচটি হ্যাটট্রিক ও চার ম্যাচে সেরা হয়েছেন। তাই বাংলাদেশের জন্য শুধু ফাইনাল দর্শন হলেও আমিরুলের জন্য ছিল বিশেষ স্বীকৃতি। চ্যাম্পিয়ন, রানার্স আপ দলের ট্রফির পাশাপাশি টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতাকে পুরস্কার দিয়েছে এফআইএইচ। আমিরুল সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার হিসেবে ২ হাজার ডলার আর্থিক পুরস্কার পেয়েছেন। বিশ্বকাপে গ্রুপপর্বের প্রথম দুই ম্যাচে অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে দুই ম্যাচে দুই হ্যাটট্রিক করেন আমিরুল। তৃতীয় ম্যাচে ফ্রান্সের বিপক্ষে একটি গোল করেছিলেন তিনি। ওমানের বিপক্ষে তৃতীয় হ্যাটট্রিকটি করেন তিনি। সেদিন হ্যাটট্রিকসহ ৫ গোল করেছিলেন উঠতি তারকা। এরপর স্থান নির্ধারণীর সেমিফাইনালে দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে আবার হ্যাটট্রিক করেছিলেন আমিরুল। আর অস্ট্রিয়াকে হারিয়ে চ্যালেঞ্জার ট্রফি জেতা ম্যাচে আমিরুল নিজের পঞ্চম হ্যাটট্রিকের দেখা পান। আমিরুলের পঞ্চম হ্যাটট্রিকের তিনটি গোলই এসেছিল পেনাল্টি কর্নার থেকে। আমিরুলের সর্বোচ্চ গোলদাতার স্বীকৃতি হকি তো বটেই, বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে বিশেষ এক স্বীকৃতি। ২০১৯ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপে বল ও ব্যাট হাতে অসাধারণ পারফরম্যান্স করেছিলেন সাকিব আল হাসান। টুর্নামেন্ট সেরা হওয়ার অন্যতম দাবিদার হলেও শেষ পর্যন্ত তিনি এই পুরস্কার পাননি। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বাংলাদেশ দলটি ভারত দেশে ফিরেছে। এসময় হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দলের সদস্যদের ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানায় বাংলাদেশ হকি ফেডারেশনের কর্মকর্তারা।

এই সাফল্য দলের সকলের চেষ্টায়Ñ আমিরুল

প্রথমবার বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার জয়কে জীবনের সেরা প্রাপ্তিহিসেবেই দেখছেন হকির হামজা খ্যাত আমিরুল ইসলাম। তিনি এখানেই থেমে থাকতে চাননা। তিনি পরবর্তী লক্ষ্য প্রসঙ্গে বলেন জুনিয়র দলের হয়ে বিশ্বকাপ তো খেললাম। স্বপ্ন দেখি, একদিন সিনিয়র দলের হয়েও বিশ্বকাপে খেলব। সে জন্য নিজেকে আরও ভালোভাবে তৈরি করতে হবে, সামনে সেই চেষ্টাই করে যাব। বিশ্বকাপে চমক দেখানো মেহরাব-আমিরুলরা খেলার মধ্যেই থাকতে চান। এজন্য ঘরোয়া সূচী নিয়মিত আয়োজনের কথা ও বলেছেন। তারঁ এই সফল্য একার নয় জানিয়ে বলেন, এটার অবদান পুরো দলের। আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলাম, প্রথমবার খেলতে গেলেও কেউ যাতে খেলা দেখে না বলে এরা কিছু পারে না। আমাদের মধ্যে এমন একটা জেদ ছিল। বলতে পারেন, এটা পুরোপুরি দলগত অর্জন। কারও একার পক্ষে দলকে এত দূর আনা সম্ভব নয়। সবার মধ্যে দারুণ একটা চেষ্টা ছিল, সাহস ছিল। প্রতিপক্ষ কে, সেটা কেউ ভাবেনি। শুধু একটাই লক্ষ্য, লড়তে হবে।

‘আমিরুল বিশ্বসেরাদের একজন হতে পারে’Ñ সিগফ্রিড আইকম্যান

প্রথমবারের মতো জুনিয়র হকি বিশ্বকাপে অংশ নিয়েই চমকে দিয়েছে বাংলাদেশ। ২৪ দলের মধ্যে ১৭তম হলেও জিতেছে চ্যালেঞ্জার ট্রফি। ভারতের মাদুরাইয়ে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ শেষে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় দেশে ফিরেছে লালÑসবুজের প্রতিনিধিরা। জুনিয়র হকিতে ইউরোপীয়ান কোচ সিগফ্রিড আইকম্যানের হাত ধরেই অসাধারণ পারফরমেন্স করেছে বাংলাদেশ দল। মাত্র তিন মাসের চুক্তিতে দলের সাথে কাজ করেছেন আইকম্যান। এই সল্প সময়ের অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি শিষ্যদের কাছে থেকে সেরা পারফরমেন্সটা আদায় করতে সক্ষম হয়েছেন। কোচের দৃষ্টিতে বাংলাদেশের এই অবস্থান শুধুই সম্ভাবনার প্রতিফলন নয়, এটি আরও বড় কিছু শুরু হওয়ার সূচনাও হতে পারে, যদি খেলোয়াড়দের সঠিকভাবে পরিচর্যা করা হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ছেলেরা যেন নিয়মিত প্রতিযোগিতা ও অনুশীলন চালিয়ে যেতে পারে। ঘরোয়া লিগ এবং ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে অংশগ্রহণ অপরিহার্য, যাতে তারা শীর্ষস্থানীয় বিদেশি খেলোয়াড়দের সঙ্গে খেলতে পারে এবং শেখার সুযোগ পায়। সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার জয়ী আমিরুল প্রসঙ্গে কোচের মূল্যায়ন, যুব বিশ্বকাপে আমিরুল ইসলামের পারফরম্যান্স ছিল অসাধারণ। ছয় ম্যাচে পাঁচটি হ্যাটট্রিক, চার ম্যাচে সেরা খেলোয়াড় এবং সর্বোচ্চ গোলদাতার দৌড়েও এগিয়ে। আমরা ওর ফ্লিকিং স্কিলের ওপর কাজ করেছি। প্রতিপক্ষের পেনাল্টি কর্নার আটকানোর ছক, রক্ষণ আর সামগ্রিক কৌশল সব বিশ্লেষণই ওর কাছে পৌঁছে দিয়েছি। সে জানত সুযোগগুলো কোথায়, শুধু সেগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে হয়েছিল। সে অসাধারণভাবে তা করেছে।

একজন ভালো খেলোয়াড়ের যে বৈশিষ্ট থাকা দরকার আমিরুলের মাঝে দেখছেন কোচ। তিনি বলেন, সে খুবই শান্ত স্বভাবের। তার ড্র্যাগ ফ্লিক শক্তিশালী, ফিনিশিংয়ের সময় সাবলীল থাকে। কব্জি দক্ষভাবে ব্যবহার করে বলের গতি প্রায় ৩০ শতাংশ বাড়ায়। পেনাল্টি কর্নার (পিসি) দারুণ নেয়, রক্ষণের মার্কিং ও ট্যাকলিংও ভালো। তবে তার সামনে উন্নতির আরও সুযোগ রয়েছে। শারীরিক সক্ষমতা বাড়ানো, ড্র্যাগ আরও দ্রুত নেয়া, কব্জির ব্যবহার আরও শক্তিশালী করতে হবে ওকে। সেক্ষেত্রে আমিরুল অবশ্যই এশিয়ার এবং বিশ্বের সেরা ড্র্যাগ ফ্লিকারদের একজন হতে পারবে। সে শৃঙ্খলাবদ্ধ, কঠোর পরিশ্রমী এবং অনুশীলনে অন্যদের আগে আসে। যদি নিয়মিত অনুশীলন এবং প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারে, তাহলে ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল। শুধু আমিরুল নয় কোচ এই দলের খেলোয়াড়দের উজ্জ্বল ভবিষ্যত দেখছেন।

বাংলাদেশ হকি ফেডারেশনের প্রতি তাঁর পরামর্শ এই খেলোয়াড়দের পেছনে নিয়মিত বিনিয়োগ চালিয়ে গেলে, ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল। রকি এবং আমিরুলের মতো খেলোয়াড় খুবই বিশেষ, আর মুন্না ও হুজাইফার মতো তরুণরাও উন্নতি করছে।