* সড়ক রেল নৌপথে বাড়তি চাপ

* গাজীপুরের দুই মহাসড়কে যানবাহনে ধীরগতি

* কমলাপুরে মানুষের ঢল, স্বস্তিতে ট্রেনযাত্রীরা

পবিত্র ঈদুল আযহার বাকি মাত্র একদিন। ঈদকে সামনে রেখে নাড়ির টানে রাজধানী ছাড়ছেন ঘরমুখো মানুষ। গতকাল সোমবার বৈরি আবহাওয়া উপেক্ষা করেই সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল, বাস টার্মিনাল ও রেলস্টেশনগুলোতে দেখা গেছে যাত্রীদের উপচেপড়া ভিড়। যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে তৎপর রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সরকারি ছুটি শুরু হওয়ায় একদিন আগে গ্রামে ফিরতে শুরু করেন কর্মজীবী মানুষ। বাস, ট্রাক, ট্রেনসহ বিভিন্ন যানবাহনে চড়ে গাজীপুরসহ রাজধানী ছাড়ছেন তারা। এতে গাজীপুরের ঢাকা-ময়মনসিংহ ও ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যানবাহনের চাপ বেড়েছে। এছাড়া বৃষ্টির পানি জমে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ায় মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে থেমে থেমে যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। পুলিশ বলছে, পানিবদ্ধতার কারণে বেশ কয়েকটি গাড়ি বিকল হয়েছে। এছাড়া হাঁটু পানিতে স্বাভাবিক গতিতে গাড়ি চলতে পারছে না। তবে যানজট নিরসনে তারা তৎপর রয়েছেন।

সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল ঘুরে দেখা গেছে, সাইরেন বাজিয়ে ছেড়ে যাচ্ছে একের পর এক লঞ্চ। যাত্রাপথে তুলনামূলক কম ভোগান্তি হওয়ায় এখনও দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের কাছে নৌপথই সবচেয়ে পছন্দের। ফলে সদরঘাটে দেখা গেছে যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড়। জুয়েল নামে বরিশালগামী এক যাত্রী বলেন, বৃষ্টি থাকলেও পরিবারের সঙ্গে ঈদ করতে বাড়ি যাচ্ছি। লঞ্চে একটু ভিড় আছে, তারপরও নৌপথে যাওয়া আরামদায়ক। শুভ নামে আরেক যাত্রী বলেন, সারা বছর কাজের জন্য ঢাকায় থাকি। ঈদে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর আনন্দই আলাদা। মনির নামে এক যাত্রী বলেন, ‘রাস্তায় জ্যাম আছে, কিন্তু এবার আগের চেয়ে কিছুটা ভালো মনে হচ্ছে। আশা করছি রাতের মধ্যেই পৌঁছে যাব। সড়ক ও নৌপথের পাশাপাশি রেলস্টেশনগুলোতেও ছিল অতিরিক্ত যাত্রীর চাপ। ট্রেন স্টেশনে পৌঁছামাত্র হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন যাত্রীরা। অতিরিক্ত যাত্রীর চাপে অনেক ট্রেনের বগিতে তিল ধারণের জায়গা ছিল না। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অনেককে ট্রেনের ছাদেও উঠতে দেখা গেছে। উত্তরবঙ্গগামী অধিকাংশ ট্রেন নির্ধারিত সময়ের দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা দেরিতে ছাড়ায় ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রীরা। তবে ট্রেন চলাচল অব্যাহত থাকায় কিছুটা স্বস্তিও প্রকাশ করেন অনেকে। রুবেল নামে এক যাত্রী বলেন, ‘ট্রেন দেরি করছে, কিন্তু অন্তত টিকিট পেয়েছি। পরিবারের সঙ্গে ঈদ করতে পারলেই কষ্ট ভুলে যাব। আনোয়ার নামে এক যাত্রী বলেন, ভিড় অনেক বেশি। দাঁড়িয়ে যেতে হলেও বাড়ি যেতে পারছি, এটাই বড় কথা। ঈদযাত্রা নির্বিঘœ রাখতে সড়ক, রেলস্টেশন ও নৌপথে নজরদারি বাড়িয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। যাত্রাপথে ভোগান্তি থাকলেও প্রিয়জনের সঙ্গে ঈদ উদযাপনের আনন্দই এখন ঘরমুখো মানুষের প্রধান স্বস্তি।

এদিকে গতকাল সকাল থেকে ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে যানবাহনের চাপ বেড়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে ঘরমুখো মানুষের ঢল। এতে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের চান্দনা চৌরাস্তা, বোর্ড বাজার, গাজীপুরা, টঙ্গীসহ বেশ কয়েকটি স্থানে গাড়ির ধীরগতি দেখা গেছে। তবে দুপুরের পর ঘণ্টাখানিক বৃষ্টিপাতে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে হাঁটু পানি জমে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। এতে এসব পয়েন্ট দিয়ে স্বাভাবিক গতিতে গাড়ি চলতে পারছে না। এছাড়া বেশ কিছু গাড়ি বিকল হওয়ার কারণে গাজীপুরা থেকে চান্দনা চৌরাস্তা পর্যন্ত থেমে থেমে যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। ঈদযাত্রায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের চন্দ্রা ত্রিমোড়েও গাড়ির ধীরগতি রয়েছে। যাত্রী ও চালকরা বলছেন, বৃষ্টির পানি জমে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ায় মহাসড়কের কয়েকটি পয়েন্টে গাড়ির ধীরগতি রয়েছে। চান্দনা চৌরাস্তায় মহাসড়কের পাশে গাড়ি পার্কিং থাকায় লেন সরু হয়ে গেছে। এছাড়া যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা করায় গাড়ি ও মানুষের জটলা সৃষ্টি হচ্ছে এবং গাড়ি ধীরগতিতে চলছে। ফলে নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছাতে তাদের বেশি সময় লাগছে। বলাকা পরিবহনের চালক মিনহাজুল আবেদীন বলেন, ঢাকা থেকে চান্দনা চৌরাস্তায় আসতে সাড়ে ৪ ঘণ্টা সময় লেগেছে। মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে পানি জমা ছাড়াও গাড়িগুলো এলোমেলো পার্কিং করে যাত্রী ওঠানামা করায় গাড়ি স্বাভাবিক গতিতে চালাতে পারছি না।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গাজীপুরের ৫ হাজার ৬০০ কারখানার মধ্যে ৪৫ ভাগ কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে দুই হাজারের বেশি পোশাক কারখানা রয়েছে। বাকি কারখানায় আগামীকাল ছুটি দেওয়া হবে। সোমবার দুপুরে ছুটির পর দলবেঁধে শ্রমিকদের গ্রামের বাড়ি ফিরতে দেখা গেছে। অনেক শ্রমিক আগে থেকেই রিজার্ভ বাস নিয়ে পরিবার-পরিজনসহ গন্তব্যে যাচ্ছেন। এছাড়া নি¤œ আয়ের অনেক মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ট্রাকে চড়ে বাড়ি ফিরছেন। দুপুরের বৃষ্টিতে ভিজে তাদের নাকাল হতে হয়েছে। শ্রমিক গোলাম রসুল বলেন, ঈদে যেকোনো উপায়ে বাড়ি ফিরতে হবে। এজন্য ট্রাকে চড়েছি, ভাড়া একটু কম। রাজশাহীর বাসিন্দা সফিকুল ইসলাম বলেন, রোববার ডিউটি শেষে আমাদের কারখানা ছুটি হয়েছে। ঝক্কি-ঝামেলা এড়াতে সকালে রওনা হয়েছি। এখনো রাস্তায় তেমন যানজট পাইনি। তবে দুপুরের পর মানুষের ভিড় অনেক বেড়ে যাবে বলে মনে হচ্ছে। নাওজোড় হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সওগাতুল আলম বলেন, ঈদযাত্রা নির্বিঘœ রাখতে মাঠে কাজ করছে হাইওয়ে পুলিশ। সোমবার অনেক কারখানা ছুটি হয়েছে, দুপুরের পর থেকে যাত্রীদের চাপ বাড়বে। এই চাপ ঈদের আগের দিন পর্যন্ত থাকবে। গাজীপুর মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (ট্রাফিক) আশরাফুল ইসলাম বলেন, বৃষ্টির কারণে মহাসড়কে পানি জমায় চালকরা স্বাভাবিক গতিতে গাড়ি চালাতে পারছেন না। তবে পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঈদযাত্রা স্বস্তিদায়ক করতে তৎপর রয়েছেন। মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে বিপুলসংখ্যক সদস্য কাজ করছেন।

কমলাপুরে মানুষের ঢল

রাজধানীর কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে ঘরমুখো মানুষের চাপ বাড়তে শুরু করেছে। ভোর থেকেই পরিবার-পরিজন নিয়ে স্টেশনে ভিড় করছেন যাত্রীরা। সুন্দরবন এক্সপ্রেসের যাত্রী জিয়ারুল ইসলাম বলেন, ঈদে বাড়ি ফিরছি, এজন্য খুব ভালো লাগছে। এখন পর্যন্ত যাত্রা স্বস্তিদায়ক মনে হচ্ছে। ট্রেনে ভ্রমণও বেশ আরামদায়ক। একই ট্রেনের যাত্রী আশরাফুল ইসলাম বলেন, আমি চুয়াডাঙ্গা যাচ্ছি। সড়কপথে অনেক সময় দীর্ঘ যানজটে পড়তে হয়, ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে হয়। সে তুলনায় ট্রেনযাত্রা অনেক আরামদায়ক ও নিরাপদ। এজন্য আগেই অনলাইনে টিকিট কেটেছিলাম। আজ গ্রামে যাচ্ছি, যাত্রীর চাপ বেশি হলেও সবার সঙ্গে একসঙ্গে বাড়ি ফিরতে ভালো লাগছে। বাংলাদেশ রেলওয়ের কমিউটার ট্রেনের টিকিট পেতে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানোর দৃশ্য এখন নিত্যদিনের চিত্র, বিশেষ করে উৎসব ও ছুটির সময়। অগ্রিম টিকিট বিক্রির ব্যবস্থা না থাকায় যাত্রার মাত্র দুই ঘণ্টা আগে থেকে টিকিট বিক্রি শুরু হয়। ফলে কাঙ্ক্ষিত টিকিট নিশ্চিত করতে ভোর থেকেই স্টেশনের কাউন্টারের সামনে লাইনে দাঁড়িয়ে পড়েন যাত্রীরা। অনলাইন বুকিংয়ের সীমিত সুযোগ, কাউন্টারে টিকিটের অতিরিক্ত চাপ এবং যাত্রীর তুলনায় আসনসংখ্যা কম হওয়ায় ভোগান্তি আরও বাড়ছে। রেলওয়ে সূত্র জানায়, প্রতি তিনটি টিকিটের বিপরীতে একটি আসন বরাদ্দ থাকে। বাকি দুটি টিকিট ‘স্ট্যান্ডিং’ হিসেবে গণ্য হয়। অর্থাৎ তিনজন যাত্রী টিকিট নিয়ে ভ্রমণ করতে পারলেও বসার সুযোগ পান মাত্র একজন, আর অন্য দুইজনকে দাঁড়িয়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে হয়। এ পরিস্থিতিতে প্রতিদিনই চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে কমিউটার ট্রেনের যাত্রীদের। এদিকে ঈদ উপলক্ষে ট্রেনের ফিরতি টিকিটও অনলাইনে বিক্রি করছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। শনিবার পাওয়া যাচ্ছে ৪ জুনের ফিরতি যাত্রার টিকিট। রেলওয়ের বিশেষ পরিকল্পনা অনুযায়ী, ৩১ মে যাত্রার টিকিট বিক্রি হয়েছে ২১ মে, ১ জুনের টিকিট বিক্রি হয়েছে ২২ মে। এছাড়া ৩ জুনের যাত্রার টিকিট বিক্রি করা হবে ২৪ মে এবং ৪ জুনের টিকিট বিক্রি হয়েছে ২৫ মে।