খুলনা ব্যুরো

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় একক ম্যানগ্রোভ বন, আমাদের গর্বের সুন্দরবন আজ এক গভীর সংকটের মুখোমুখি। বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা এই সুন্দরবনের অন্যতম প্রধান প্রাণ ও সৌন্দর্যের প্রতীক হলো মায়া হরিণ। বনের সবুজ গালিচায় সকাল-বিকেলে দলবেঁধে হরিণের ছুটে চলা যে কারও প্রাণ জুড়িয়ে দেয়। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, বন বিভাগ, কোস্টগার্ড এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়মিত টহল ও অভিযান সত্ত্বেও সুন্দরবনের এই নিরীহ প্রাণীটির নিধন থামছে না। বেপরোয়া চোরা শিকারিদের নিষ্ঠুর থাবায় প্রতিদিন বিপন্ন হচ্ছে বনের জীববৈচিত্র্য।

সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, গত তিন বছরে সুন্দরবনের পূর্ব ও পশ্চিম বিভাগ মিলে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কেজি হরিণের গোশত উদ্ধার করেছে। এত কড়াকড়ি ও নজরদারির পরও কেন থামছে না এই অপতৎপরতাÑতা আজ দেশের পরিবেশবাদী ও প্রকৃতিপ্রেমীদের কপালে গভীর চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বন বিভাগের কড়া নজরদারি এড়িয়েও সক্রিয় রয়েছে চোরা শিকারিরা। চলতি বছরের ২০ জুলাই সুন্দরবনের নলিয়ান এলাকা থেকে ৩০ কেজি হরিণের গোশতসহ মেহেদী হাসান (৩০) নামের এক গোশত ব্যবসায়ীকে আটক করে কোস্টগার্ড। খুলনা জেলার দাকোপ থানাধীন নলিয়ান ক্লোজারপাড়া-সংলগ্ন এলাকায় এই বিশেষ অভিযান পরিচালিত হয়। এটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি একটি বড় অপরাধ চক্রের চলমান চিত্রের ছোট্ট একটি প্রতিচ্ছবি মাত্র।

বন বিভাগের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সুন্দরবন দেখভালের দায়িত্বে থাকা দুটি বিভাগÑসুন্দরবন পূর্ব ও পশ্চিম বিভাগÑগত তিন অর্থবছরে হরিণ শিকার ও পাচার রোধে ব্যাপক অভিযান পরিচালনা করেছে।

সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৩৯৫ কেজি হরিণের গোশত এবং ৪ হাজার ৮৬০ ফুট ফাঁদ উদ্ধার করা হয় (মামলা ২৭টি, গ্রেফতার ৪৪ জন)। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে গোশত উদ্ধার বেড়ে দাঁড়ায় ৭৯৩ কেজি এবং ফাঁদ উদ্ধার হয় ২৪ হাজার ৬৪৮ ফুট (মামলা ৩৭টি, গ্রেফতার ৩৫ জন)। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২৪৯.৫ কেজি গোশত এবং রেকর্ড ১ লাখ ২০ হাজার ৮৮৩ ফুট ফাঁদ উদ্ধার করা হয়েছে (মামলা ৩৫টি, গ্রেফতার ৭৪ জন)।

সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের চিত্রটি কমবেশি একই রকম। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৫১৪ কেজি গোশের পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ ফাঁদ ও চামড়া উদ্ধার করা হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রেকর্ড ৯৩১.৭ কেজি হরিণের গোশত এবং বহু ফাঁদ উদ্ধারসহ ১১২ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও ৫৭১ কেজি গোশত এবং বিভিন্ন ধরনের ফাঁদ উদ্ধার অব্যাহত ছিল। হরিণের সংখ্যা কিছুটা বাড়লেও (আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘ (আইইউসিএন) এর ২০২৩ সালের জরিপ অনুযায়ী বর্তমানে সুন্দরবনে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৪টি হরিণ রয়েছে), এভাবে নির্বিচারে হরিণ নিধন চলতে থাকলে বনের স্বাভাবিক ভারসাম্য দ্রুত নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

শিকারিদের কৌশল ও রুট: কীভাবে চলে এই অবৈধ বাণিজ্য?

অনুসন্ধানে জানা যায়, সুন্দরবনসংলগ্ন গ্রামগুলোর কিছু বিপথগামী মানুষ এবং পেশাদার অপরাধী চক্র এই ব্যবসার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। বনের গহীনে হরিণ শিকারের জন্য তারা বিভিন্ন ধরনের প্রাণঘাতী ফাঁদ ব্যবহার করে। এর মধ্যে মালা ফাঁদ, ছিটকা ফাঁদ, হাঁটা ফাঁদ ও গলা ফাঁদ অন্যতম। শিকারিরা মূলত বনের যেসব এলাকায় হরিণের যাতায়াত বেশি এবং প্রিয় খাদ্য কেওড়া গাছ ও ঘাসবন রয়েছেÑযেমন কটকা, করমজল, দুবলারচর, হিরণ পয়েন্ট, কচিখালী, সুপতি, ঢাংমারী, কাঠকাটা, কাশিয়াদি, কালাবাগী, বানিয়াখালী, নীলকমল, জসিং এবং মহেশ্বরপুরÑসেখানে অত্যন্ত সুকৌশলে এসব ফাঁদ পেতে রাখে। চলাচলের সময় হরিণগুলো এসব ফাঁদে আটকে যায় এবং মর্মান্তিক মৃত্যুর শিকার হয়।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, হরিণের ফাঁদে শুধু হরিণই নয়, মাঝে মাঝে বনের রাজদরবারের রাজা বাঘও আটকে যায়। চলতি বছরের ৪ জানুয়ারি এমনি এক ফাঁদে আটকে পড়া একটি আহত বাঘকে উদ্ধার করতে বাধ্য হয়েছিল বন বিভাগ। এর আগে ২০১২ সালে ফাঁদে পড়ে একটি বাঘ পা হারিয়েছিল এবং ২০১৪ সালে ফাঁদ ছিঁড়ে বের হয়ে আসা আরেকটি বাঘ পরবর্তীতে মারা যায়। এটি প্রমাণ করে যে, শিকারিদের পাতা এই ফাঁদ পুরো সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্েযর জন্যই এক ভয়াবহ মরণফাঁদ।

সিন্ডিকেট ও লোভী ক্রেতাদের দৌরাত্ম্য

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সুন্দরবনের কোলঘেঁষা খুলনা জেলার দাকোপ, কয়রা ও পাইকগাছা, সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর, বাগেরহাট জেলার মোংলা ও শরণখোলা উপজেলাগুলো হরিণ শিকারিদের প্রধান অভয়ারণ্য। চোরাশিকারিরা এই এলাকাগুলোতে বসতি গড়ে তুলেছে এবং স্থানীয় এজেন্টদের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট পরিচালনা করছে।

শিকারিদের কাছ থেকে মাত্র ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা প্রতি কেজি দরে হরিণের গোশত কিনে পাচারকারীরা তা শহরে নিয়ে এক হাজার থেকে দুই হাজার টাকায় বিক্রি করে। শুধু স্থানীয় পর্যায় নয়, অভিযোগ রয়েছে যে দেশের এক শ্রেণির প্রভাবশালী ও ক্ষমতাশালী ব্যক্তি, বিত্তশালী পর্যটক এবং ভূরিভোজপ্রেমীদের অতিরিক্ত চাহিদার কারণে এই অবৈধ বাণিজ্যের বিস্তার ঘটছে। সুন্দরবনে ঘুরতে গিয়ে গোপন আস্তানায় হরিণের গোশত খাওয়ার প্রবণতা এই অপরাধকে আরও বেশি উসকে দিচ্ছে।

পাশাপাশি, কতিপয় অসাধু বন কর্মকর্তা-কর্মচারীর দায়িত্ব অবহেলা কিংবা প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ মদদের কারণেও শিকারিরা অনেক সময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। জেলে, মৌয়ালি ও বাওয়ালির পাস-পারমিটের আড়ালে কিছু অসাধু ব্যক্তি বনের ভেতরে ঢুকে এই অনৈতিক কর্মকা- চালিয়ে যাচ্ছে।

বাঘ বাঁচাতে হরিণ বাঁচানো কেন জরুরি?

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এবং প্রখ্যাত বন্যপ্রাণী গবেষক ড. এম এ আজিজ সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্র নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে গন্যমাধ্যমকে বলেন, "সুন্দরবনে বাঘের প্রধান শিকার চিত্রা হরিণ। বাঘের মোট খাদ্যের প্রায় ৮০ শতাংশই আসে চিত্রা হরিণ থেকে। তাই সুন্দরবনে বাঘ রক্ষা করতে হলে সবার আগে এই চিত্রা হরিণ বাঁচাতে হবে। বনের খাদ্যশৃঙ্খল সচল রাখতে হরিণের ভূমিকা অপরিসীম।" খাদ্যশৃঙ্খলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ধ্বংস হলে পুরো ম্যানগ্রোভ বনের জীববৈচিত্র্য বিপর্যয়ের মুখে পড়বে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) খুলনার আহ্বায়ক এডভোকেট বাবুল হাওলাদার সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী সুরক্ষায় বেশ কিছু কার্যকরী ও সময়োপযোগী সুপারিশ তুলে ধরেছেন। হরিণ শিকার চিরতরে বন্ধ করতে নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা জরুরি:

১. লোকালয়ে টহল ও গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধি: সুন্দরবনসংলগ্ন লোকালয়গুলোতে নিরাপত্তা বাহিনীর টহল জোরদার করতে হবে। অপরাধ উদঘাটনে গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক বাড়িয়ে তথ্যদাতাদের পরিচয় গোপন রেখে তাদের পুরস্কৃত করার ব্যবস্থা করতে হবে।

২. অপরাধীদের তালিকা হালনাগাদ ও কঠোর শাস্তি: প্রতিটি বনস্টেশন ও টহল ফাঁড়িতে সক্রিয় হরিণ শিকারিদের নামের সুনির্দিষ্ট তালিকা প্রস্তুত করতে হবে। হরিণ শিকার ও মাংস ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে যাতে তারা সহজে জামিন পেয়ে পুনরায় অপরাধে জড়াতে না পারে।

৩. ক্রেতাদের উৎস চিহ্নিত করা: হরিণের মাংসের সম্ভাব্য ভোক্তা ও ক্রেতাদের উৎস চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। শহরের যেসব গোপন রেস্তোরাঁ বা সিন্ডিকেটে এই মাংস সরবরাহ করা হয়, সেখানে নিয়মিত অভিযান চালাতে হবে।

৪. অসাধু চক্রের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা: বন বিভাগের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী যদি এই চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত থাকে, তবে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত সাপেক্ষে তাৎক্ষণিক কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

৫. জনসচেতনতা তৈরি: স্থানীয় বাসিন্দা, জেলে, বাওয়ালি ও মৌয়ালীদের নিয়ে সচেতনতামূলক সভা করতে হবে। হরিণ শিকার যে একটি দ-নীয় অপরাধ এবং এটি যে আমাদের সুন্দরবনকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে, তা সাধারণ মানুষকে বোঝাতে হবে।

সুন্দরবন কেবল গাছপালার সমাহার নয়, এটি অসংখ্য বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আশ্রয়স্থল এবং উপকূলীয় অঞ্চলের কোটি মানুষের প্রাকৃতিক ঢাল। এই সুন্দরবনকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে এবং এর প্রাণ-প্রকৃতি টিকিয়ে রাখতে হলে হরিণ শিকারের মতো জঘন্য অপরাধের বিরুদ্ধে সর্বস্তরের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সোচ্চার হতে হবে। সময় ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই চোরা শিকারিদের শেকড় উপড়ে ফেলতে হবেÑএটাই আজকের সবচেয়ে বড় দাবি।