খুন হওয়ার মাত্র দুই সপ্তাহ আগে রুমমেট হিশাম সালেহ আবুঘরবেহর বিরুদ্ধে ‘অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্স ম্যানেজমেন্টের’ কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করেছিলেন জামিল আহমেদ লিমন। সিএনএনকে এ কথা বলেছেন লিমনের ছোট ভাই জুবায়ের আহমেদ।
জুবায়ের সিএনএনকে বলেন, ‘আমার ভাই (লিমন) মাত্র দুই মাস আগে ওই অ্যাপার্টমেন্টে উঠেছিলেন। আমাদের সঙ্গে কথা বলার সময় ভাই প্রায়ই বলতেন, আবুঘরবেহ খুবই খারাপ, বিরক্তিকর এবং একজন অসামাজিক মানুষ।’ মিডল ইস্ট আই, এএফপি, সিএনএন, মিডল ইস্ট আই, রয়টার্স।
জুবায়ের আরও বলেন, তাঁর ভাই লিমন খুন হওয়ার মাত্র সপ্তাহ দুই আগে আবুঘরবেহর বিরুদ্ধে ‘অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্স ম্যানেজমেন্টের’ কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ করেছিলেন বলেও তিনি শুনেছেন। জুবায়েরের এ দাবি যাচাই করতে সিএনএন ওই আবাসিক কমপ্লেক্স কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। আবুঘরবেহর বিরুদ্ধে তদন্ত কর্মকর্তারা আদালতে যে নথিপত্র জমা দিয়েছেন, সেখানে আরও বলা হয়েছে, লিমন ও বৃষ্টি নিখোঁজ হওয়ার মাত্র তিন দিন আগে আবুঘরবেহ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) চ্যাটবট চ্যাটজিপিটিকে প্রশ্ন করেছিলেন, কোনো ব্যক্তিকে যদি একটি কালো রঙের আবর্জনার ব্যাগে ভরে ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া হয়, তাহলে কী ঘটতে পারে?
আদালতে জমা দেওয়া নথি অনুযায়ী, পরে মেডিক্যাল এক্সামিনারের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে লিমনের মৃত্যু হত্যাকা- হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, লিমনের পিঠের নিচের অংশে একটি গভীর ছুরিকাঘাতের আঘাত ছিল, যা তাঁর লিভার (যকৃৎ) ভেদ করে যায়। এ ছাড়া তাঁর শরীরে আরও আঘাতের চিহ্ন ছিল।
১৬ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডায় অধ্যয়নরত দুই বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমন (২৭) ও নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি (২৭) নিখোঁজ হন। পরদিন তাঁদের এক বন্ধু বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নজরে আনেন। এ হত্যাকা-ে জড়িত সন্দেহে গত শুক্রবার মার্কিন নাগরিক আবুঘরবেহকে তাঁর পারিবারিক বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। হিলসবরো কাউন্টি শেরিফের কার্যালয় থেকে বলা হয়, আবুঘরবেহকে জিজ্ঞাসাবাদের পর শুক্রবার ফ্লোরিডার হাওয়ার্ড ফ্রাঙ্কল্যান্ড ব্রিজ এলাকায় কয়েকটি কালো রঙের আবর্জনা ফেলার ব্যাগের মধ্যে লিমনের ক্ষতবিক্ষত মরদেহ খুঁজে পাওয়া যায়। আদালতের নথি অনুযায়ী, লিমনের মরদেহে কোনো কাপড় ছিল না এবং মরদেহে একাধিক ছুরিকাঘাতের চিহ্ন ছিল।
এ ঘটনায় আবুঘরবেহর বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ মাত্রার (ফার্স্ট ডিগ্রি) হত্যার দুটি অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। তাঁর কাছ থেকে একটি অস্ত্র উদ্ধারের কথাও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। নিহত আরেক শিক্ষার্থী বৃষ্টির মৃতদেহ এখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে যেখানে লিমনের মৃতদেহ পাওয়ার গেছে, সেখান থেকে কিছুটা দূরে একটি জলাশয়ে গত রোববার একটি মৃতদেহের খ-িত অংশ পাওয়া গেছে। সেটি বৃষ্টির কি না, তা পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। তদন্তকারী কর্মকর্তারা হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজ দিয়ে ১৭ এপ্রিল দিবাগত রাত ১টা থেকে ভোর ৫টার মধ্যে যাতায়াত করা যেকোনো প্রাইভেট কারের ড্যাশক্যাম ভিডিও খুঁজছেন।
হিলসবরো কাউন্টি শেরিফের কার্যালয় থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এক পোস্টে এ কথা বলা হয়েছে। ওই পোস্টে সেতুর কাছে একটি নৌকায় থাকা ডেপুটিদের একটি ভিডিও–ও রয়েছে; যা দেখে মনে হচ্ছে, তাঁরা অনুসন্ধান অভিযান চালাচ্ছিলেন। আদালতের নথি অনুযায়ী, ২৬ বছর বয়সী আবুঘরবেহকে আজ মঙ্গলবার শুনানির (স্ট্যাটাস হেয়ারিং) জন্য আদালতে হাজির করার কথা রয়েছে। এর আগে একটি ‘প্রিট্রায়াল ডিটেনশন’ শুনানিতে আবুঘরবেহকে উপস্থিত করার কথা ছিল, কিন্তু তা পরে স্থগিত হয়।
লিমনের লাশ উদ্ধারের পরদিন শনিবার হিলসবরো কাউন্টি শেরিফের কার্যালয় থেকে আদালতে মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। রোববার সেটি প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লিমনের মরদেহে ‘ধারালো অস্ত্রের একাধিক আঘাতের চিহ্ন’ দেখা গেছে।
আদালতে জমা দেওয়া নথি অনুযায়ী, পরে মেডিক্যাল পরীক্ষার প্রতিবেদনের ভিত্তিতে লিমনের মৃত্যু হত্যাকা- হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, লিমনের পিঠের নিচের অংশে একটি গভীর ছুরিকাঘাতের আঘাত ছিল, যা তাঁর লিভার (যকৃৎ) ভেদ করে যায়। এ ছাড়া তাঁর শরীরে আরও আঘাতের চিহ্ন ছিল।
তদন্ত কর্মকর্তারা আদালতের কাছে করা আবেদনে আরও বলেছেন, ‘অভিযুক্ত ব্যক্তির ভুক্তভোগীদের হত্যার এই নির্মম ও সহিংস প্রকৃতি প্রমাণ করে, তাঁকে ছেড়ে দিলে তা সমাজের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। কোনো ধরনের শর্ত সাপেক্ষে মুক্তিও ওই এলাকার লোকজনকে শারীরিক ক্ষতির ঝুঁকি থেকে যুক্তিসংগতভাবে রক্ষা করতে পারবে না।’
ফ্লোরিডায় দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থী হত্যার ঘটনায়
আবুঘরবেহর পাশাপাশি তদন্তের মুখে চ্যাটজিপিটি
টাম্পা বে ২৮
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় দুই বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থীকে হত্যার ঘটনায় তদন্তের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চ্যাটবট চ্যাটজিপিটি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ওপেনএআইকে। ফ্লোরিডার অ্যাটর্নি জেনারেল জেমস উথমায়ার গতকাল সোমবার সকালে ঘোষণা করেছেন, ওপেনএআইয়ের বিরুদ্ধে চলমান ফৌজদারি অপরাধের তদন্তে তিনি ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার (ইউএসএফ) ওই দুই শিক্ষার্থী হত্যার ঘটনাটি যুক্ত করতে যাচ্ছেন।
গতকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে উথমায়ার লেখেন, ‘আমরা ওপেনএআইয়ের বিরুদ্ধে আমাদের ফৌজদারি তদন্তের পরিধি বাড়িয়ে ইউএসএফ হত্যাকা-কেও অন্তর্ভুক্ত করছি। কারণ, আমরা জানতে পেরেছি, এ ঘটনার প্রধান সন্দেহভাজন হত্যাকা- ঘটাতে চ্যাটজিপিটির সহায়তা নিয়েছিলেন।’ এর মাত্র এক সপ্তাহ আগে উথমায়ার ওপেনএআইয়ের বিরুদ্ধে ফৌজদারি তদন্ত শুরুর ঘোষণা দিয়ে একটি সংবাদ সম্মেলন করেছিলেন।
গত বছর ফ্লোরিডা স্টেট ইউনিভার্সিটিতে ঘটে যাওয়া এক মর্মান্তিক গোলাগুলির ঘটনায় সম্প্রতি ওপেনএআইয়ের বিরুদ্ধে ফৌজদারি তদন্ত শুরু করে ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্য সরকার। অভিযোগ আছে, ওই হামলার আগে বন্দুকধারীকে অস্ত্র ও গুলিসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করেছে ওপেনএআইয়ের চ্যাটবট। ২১ এপ্রিল উথমায়ার বলেন, গত বছর ফ্লোরিডা স্টেট ইউনিভার্সিটিতে ওই হামলাকারী শুধু নিজের মাথায় আসা চিন্তাগুলোর উত্তর চ্যাটজিপিটির কাছে খোঁজেনি, বরং চ্যাটজিপিটি তাকে হাতে-কলমে ওই হামলার ছক তৈরি করতে সাহায্য করেছে।
বর্তমানে হিলসবরো কাউন্টি শেরিফের কার্যালয় ইউএসএফের বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমন ও নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি হত্যাকা-ের তদন্ত করছে।
এ ঘটনায় সন্দেহভাজন অপরাধী লিমনের রুমমেট ২৬ বছর বয়সী হিশাম আবুঘরবেহকে ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে দুটি সুপরিকল্পিত হত্যাকা-ের (ফার্স্ট ডিগ্রি মার্ডার) অভিযোগ আনা হয়েছে। এই দুই মেধাবী শিক্ষার্থীর মর্মান্তিক মৃত্যুতে ইউএসএফ কর্তৃপক্ষ গভীর শোক প্রকাশ করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়টি নিহত দুজনের স্মরণে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ, তাঁদের পরিবারের পাশে থাকা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করায় পূর্ণ সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।