ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে যারা পালিয়েছেন, তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এবং সেই টাকা উদ্ধারে সরকার পেশাদার রিকভারি ফার্ম নিয়োগ করেছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ঋণখেলাপিদের সঙ্গে কোনো ধরনের সমঝোতা করার সুযোগ নেই।
গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহর এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী এসব কথা বলেন। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন।
অধিবেশনে হাসনাত আব্দুল্লাহ তার প্রশ্নে বলেন, এস আলম গ্রুপ একাই ৮০ হাজার কোটি টাকা এবং জনতা ব্যাংক থেকে বেক্সিমকো গ্রুপ ২৫ হাজার কোটি টাকা ঋণখেলাপি। এই ঋণ পুনরুদ্ধারে এই অর্থবছরে বিশেষ কোনো পরিকল্পনা আছে কি না? এছাড়া এস আলম গ্রুপকে ঋণ পরিশোধ না করিয়ে পুনর্গঠনের চেষ্টা চলছে কি না বা তাদের সঙ্গে কোনো সমঝোতা হয়েছে কি না?
অর্থমন্ত্রী বলেন, বিএনপির রাজনীতি ও অর্থনৈতিক কার্যক্রমে কারও সঙ্গে কোনো সমঝোতা করার সুযোগ নেই।
বিগত দিনে বিএনপি যতবারই সরকারে এসেছে, ফিন্যান্সিয়াল ডিসিপ্লিন (আর্থিক শৃঙ্খলা) নিয়ে কোনো প্রশ্ন আসেনি। ম্যাক্রো স্ট্র্যাটেজি বা শেয়ারবাজার লুটপাট নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠেনি।
তাই আশ্বস্ত করছি, বিএনপির অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় কোনো সমঝোতার সুযোগ নেই।
ঋণখেলাপিদের বিষয়ে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, যারাই ব্যাংক থেকে টাকা নিয়েছে বা বিদেশে পালিয়ে গিয়েছে, সবার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এবং তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ (পারসু) করা হচ্ছে। এই টাকা রিকভারির জন্য আমরা দেশের বাইরে পেশাদার ফার্ম নিয়োগ করেছি।
তিনি আরও জানান, টাকা উদ্ধারে একদিকে যেমন জিটুজি (সরকার থেকে সরকার) আলোচনা চলছে, অন্যদিকে বেসরকারি রিকভারি ফার্মগুলোও কাজ করছে। ইনশাআল্লাহ আগামী দিনে আমরা এই টাকা রিকভার করতে পারব।
সংসদ সদস্য মো. আবুল হাসনাতের (হাসনাত আব্দুল্লাহ) এক তারকা চিহ্নিত প্রশ্নের লিখিত জবাবে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, এস আলম গ্রুপ ও বেক্সিমকো গ্রুপের অবৈধভাবে বিদেশে পাচারকৃত সম্পদ উদ্ধারের প্রচলিত আইনি ব্যবস্থায় সম্ভাব্য সব ধরনের প্রচেষ্টা চলমান রয়েছে। অর্থমন্ত্রী বলেন, অবৈধভাবে বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ উদ্ধারে ফৌজদারি কার্যক্রমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স ইন ক্রিমিনাল ম্যাটারস অ্যাক্ট, ২০১২-এর আওতায় সংশ্লিষ্ট দেশে অনুরোধ বা মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকুয়েস্ট (এমএলএআর) পাঠানো। এস আলম গ্রুপ ও বেক্সিমকো গ্রুপ কর্তৃক অবৈধভাবে বিদেশে পাচারকৃত সম্পদ উদ্ধারের অংশ হিসেবে যৌথ তদন্তকারী দল (দুদক, সিআইডি, সিআইসি, শুল্ক ও গোয়েন্দা) কর্তৃক বাংলাদেশের আদালতে মামলা দায়ের করা হয়েছে।
পাশাপাশি এস আলম গ্রুপের বিষয়ে ৪টি দেশে (ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ড, সাইপ্রাস, জার্সি ও সিঙ্গাপুর) এবং বেক্সিমকো গ্রুপের বিষয়ে ২টি দেশে (যুক্তরাজ্য ও সংযুক্ত আরব আমিরাত) এমএলএআর পাঠানো হয়েছে। এ দুটি গ্রুপের পাচারকৃত অর্থ পুনরুদ্ধারে ফৌজদারি কার্যক্রমের পাশাপাশি দেওয়ানি পদ্ধতিও অনুসরণ করা হচ্ছে। ৪টি স্বনামধন্য বিদেশি আইনি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিদেশে তাদের সম্পদ অনুসন্ধানের কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে।
আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, অবৈধভাবে বিদেশে পাচারকৃত অর্থ উদ্ধার একটি জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি আইনগত প্রক্রিয়া।
সংশ্লিষ্ট দেশ থেকে এমএলএআরের জবাব প্রাপ্তির পর পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ, অপরাধলব্ধ অর্থ-সম্পদ শনাক্তকরণ এবং দেশে বা বিদেশের আদালতে অর্থ পাচারের বিষয়টি প্রমাণিত হওয়া সাপেক্ষে অর্থ উদ্ধার করা সম্ভব। বাংলাদেশের মতো অন্য যেসব দেশ থেকে অবৈধভাবে সম্পদ পাচার হয়েছে তাদেরও একটি দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। আইনগত বা বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত চলতি বা আগামী অর্থ-বছরে এস আলম গ্রুপ ও বেক্সিমকো গ্রুপের কী পরিমাণ অর্থ সম্পদ উদ্ধার সম্ভব, তা যথাযথভাবে নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি। তবে প্রচলিত আইনি ব্যবস্থায় সম্ভাব্য সব ধরনের প্রচেষ্টা চলমান রয়েছে এবং এ জোর প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।
আইন সংশোধন এস আলমকে ফিরিয়ে আনার জন্য নয়
জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান এক প্রশ্নে বলেন, ব্যাংক আইন সংশোধন করে সেখানে ঋণ খেলাপীরা অল্প টাকা দিয়ে পুনরায় ব্যাংকে ফিরে আসার সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। এটি কি এস আলমকে ব্যাংকে ফিরিয়ে আনার জন্য করা হচ্ছে? ইসলামী ব্যাংকের সামনে এস আলমকে ফিরিয়ে আনার জন্য মিছিল হচ্ছে।
জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, এস আলমকে ফিরিয়ে আনার জন্য ব্যাংক আইন সংশোধন করা হয়নি। বরং সাধারণ সকল বিনিয়োগকারীদের জন্য এ সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে।
আম রপ্তানি ও শিল্পায়নে বরেন্দ্র অঞ্চলে বিশেষ অর্থনৈতিক পরিকল্পনা
চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমকে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৃষিপণ্য উল্লেখ করে এর রপ্তানি ও আমভিত্তিক শিল্পায়নে সরকার বিশেষ অর্থনৈতিক পরিকল্পনা গ্রহণ করতে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
তিনি জানান, শুধু আম নয়, পুরো বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষির সম্ভাবনা যাচাই করে হিমাগার ও অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য আগামী বাজেট এবং পরবর্তী পরিকল্পনায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. নূরুল ইসলামের এক লিখিত ও সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী এ তথ্য জানান।
তিনি বলেন, বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষির সার্বিক উন্নয়নে ‘বরেন্দ্র প্রকল্প’ পুনরায় চালু করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এছাড়া যথাযথভাবে আম সংরক্ষণের জন্য ‘বিশেষ হিমাগার’ স্থাপন, বিশেষায়িত কৃষিপণ্য রপ্তানি অঞ্চল গড়ে তোলা এবং কৃষিভিত্তিক শিল্পায়নের ওপর সরকার বিশেষ জোর দিচ্ছে। আম রপ্তানি বাড়াতে কেবল ‘হট ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট’ স্থাপনই যথেষ্ট নয় বলে উল্লেখ করেন মন্ত্রী।
তিনি বলেন, ‘এর সঙ্গে মান নিয়ন্ত্রণ, গ্রেডিং, পরীক্ষাগার ও সার্টিফিকেশন, নিরাপদ পরিবহন, বাজার সংযোগ, ব্র্যান্ডিং এবং আন্তর্জাতিক স্যানিটারি ও ফাইটোস্যানিটারি (এসপিএস) মানদ- পূরণের একটি সমন্বিত ব্যবস্থা প্রয়োজন।’
সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে কারিগরি ও অর্থনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য প্রস্তাব পাওয়া গেলে সরকার হট ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট ও রপ্তানি-সহায়ক অবকাঠামো তৈরির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে।
সংসদ সদস্য নূরুল ইসলাম তার সম্পূরক প্রশ্নে বলেন, গত ৫৪ বছরে বাংলাদেশে আমভিত্তিক কোনো ইন্ডাস্ট্রি গড়ে ওঠেনি। এ বিষয়ে অর্থ বিভাগের কোনো বিশেষ পরিকল্পনা আছে কি না, তা জানতে চান তিনি।
জবাবে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘শুধু আম নয়, বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষির সফলতা ও সম্ভাবনা বিবেচনায় আমরা পুরো অঞ্চলের জন্য একটি সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিকল্পনা গ্রহণ করতে যাচ্ছি। যেখানে গ্রোথ সেন্টার থাকবে এবং যেখানে এগ্রিকালচার সেক্টর ভালো, সেখানে হিমাগার থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় সব অবকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধা রাখা হবে।’
তিনি আরও জানান, বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা বা বাজেট সহায়তার ক্ষেত্রে প্রকল্পের বাস্তবতা এবং কৃষকের ন্যায্যমূল্যের বিষয়টি গুরুত্ব পাবে। সরকার নীতিগতভাবে আম রপ্তানি ও এই খাতের উন্নয়নকে ইতিবাচকভাবে দেখছে।
এস আলমের ২৬৮০ ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ
এস আলম গ্রুপের বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ উদ্ধারের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে গ্রুপটির দেশে থাকা ৪ হাজার ২৬৪ কোটি টাকা মূল্যের স্থাবর সম্পদ ইতোমধ্যে জব্দ করা হয়েছে। পাশাপাশি গ্রুপটির ২ হাজার ৬৮০টি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এবং ১৭১টি কোম্পানির বিপুল পরিমাণ শেয়ার ফ্রিজ (লেনদেন স্থগিত) করা হয়েছে।
বাগেরহাট-২ আসনের সংসদ সদস্য শেখ মনজুরুল হক রাহাদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব তথ্য তুলে ধরেন।
অর্থমন্ত্রী জানান, তদন্তকারী দলের তথ্যানুযায়ী দেশে এস আলম গ্রুপের ৪ হাজার ২৬৪ কোটি টাকা মূল্যের জমি, ফ্ল্যাট ও বাড়িসহ বিভিন্ন স্থাবর সম্পদ জব্দ করা হয়েছে। এছাড়া আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে গ্রুপটির নিয়ন্ত্রণাধীন ২ হাজার ৬৮০টি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করা হয়েছে, যেখানে জমা আছে প্রায় ৬ হাজার ৬৯২ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। পাশাপাশি গ্রুপটির ১৭১টি কোম্পানির নামে থাকা ২৪ হাজার ৮১০ কোটি ৮৮ লাখ টাকা মূল্যের শেয়ারও ফ্রিজ করা হয়েছে।
বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ উদ্ধারে ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ড, সাইপ্রাস, জার্সি ও সিঙ্গাপুরÑ এই চারটি দেশে মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট (এমএলএআর) পাঠানো হয়েছে। ইতোমধ্যে বিদেশে থাকা গ্রুপের ১টি বাড়ি, ৬২টি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এবং ৩ হাজার ২২২ কোটি ৭০ লাখ টাকা মূল্যের ১৪টি কোম্পানি ও ৬টি ট্রাস্ট ফান্ডের সম্পদ জব্দের বিষয়ে দেশের আদালতের রায় পাওয়া গিয়েছে বলে মন্ত্রী সংসদকে জানান।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আরও জানান, পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে এনে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলোকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) অধীনে ‘স্টোলেন অ্যাসেট রিকভারি ডিভিশন’ গঠন করা হয়েছে। বর্তমানে স্বনামধন্য বিদেশি আইনি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদের অনুসন্ধান চালানো হচ্ছে।