আসন্ন ঈদুল আযহা উপলক্ষে প্রিয়জনের সাথে ঈদ আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে রাজধানী ছাড়ছে লাখো মানুষ। গতকাল রোববার সরকারি চাকরিজীবীদের ছিল শেষ অফিস। টানা ৭দিনের ছুটি আজ থেকে শুরু হচ্ছে। গতকাল অনেকে কোনমতে অফিসে হাজিরা দিয়েই বেরিয়ে পড়েছেন গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার জন্য। পরিবার পরিজন নিয়ে ছুটছেন বাস, লঞ্চ কিংবা রেলস্টেশনের দিকে। ফলে টার্মিনালগুলোতে ঘরমুখো মানুষের ভিড় ছিল লক্ষণীয়। আজ সোমবার এ ভিড় আরো কয়েকগুণ বেড়ে যেতে পারে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

সূত্র জানায়, রাজধানী ছেড়ে প্রিয়জনের সাথে ঈদ উদযাপন করতে গ্রামের পথে ছুটতে শুরু করেছে ঘরমুখো মানুষ। ভোর থেকেই পরিবার-পরিজন নিয়ে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে আসেন যাত্রীরা। টিকিট সংকট আর কিছু ট্রেনের বিলম্ব থাকলেও, বড় ধরনের ভোগান্তি ছাড়াই স্বস্তির ঈদযাত্রার আশা ঘরমুখো মানুষের।

সকাল থেকে বিভিন্ন গন্তব্যে ট্রেন সময়মতো ছেড়ে যায়। তবে সিলেটগামী পারাবত এক্সপ্রেস, চিলাহাটিগামী নীলসাগর এক্সপ্রেস ও লালমনিরহাটগামী বুড়িমারী এক্সপ্রেস বিলম্বিত হয়। এর মধ্যে বুড়িমারী এক্সপ্রেস প্রায় তিন ঘণ্টা দেরিতে আসায় ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রীরা।

কমলাপুর রেলস্টেশনে ঈদযাত্রার সার্বিক পরিস্থিতি পরিদর্শনে এসে রেলপথমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, ট্রেন চলাচল মোটামুটি স্বাভাবিক রয়েছে। কয়েকটি ট্রেন বিলম্বিত হওয়ার কারণ হিসেবে তিনি জানান, লাইনের ওপর ধানের খড় শুকানোর জন্য ফেলে রাখার কারণে একটি ট্রেনের চাকা স্লিপ করে।

মন্ত্রী জানান, প্রতিদিন আন্তঃনগর ট্রেনে প্রায় ৩২ হাজার যাত্রী পরিবহন করা সম্ভব হলেও ঈদ উপলক্ষে অতিরিক্ত কোচ যুক্ত করে তা ৪০ হাজারের বেশি করা হয়েছে। এবারের ঈদযাত্রায় নতুন ৫১টি কোচ সংযুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া ৫ জোড়া বিশেষ ট্রেনও চালু করা হয়েছে।

এদিকে পবিত্র ঈদুল আযহা উপলক্ষে ঘরমুখো মানুষের যাত্রা সহজ করতে এবং ঢাকার প্রধান নৌ-টার্মিনাল সদরঘাটের ওপর অতিরিক্ত যাত্রীচাপ কমাতে গতকাল রোববার থেকে বসিলা ও শিমুলিয়া লঞ্চঘাট থেকে বিশেষ লঞ্চ সার্ভিস শুরু হয়েছে। শনিবার বিকেলে সদরঘাট ও বসিলা লঞ্চঘাট পরিদর্শন শেষে নৌপরিবহণ প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান এই নতুন রুটে যাত্রা শুরুর ঘোষণা দেন।

পরিদর্শনকালে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমান সরকার নৌপথের যাত্রীদের জন্য নিরাপদ, আধুনিক ও সাশ্রয়ী যাতায়াত নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর। এবার ঈদযাত্রায় সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়েও কম মূল্যে যাত্রীরা যাতায়াত করতে পারবেন। হকার বা বুকিং সহকারীদের মাধ্যমে যেন কেউ প্রতারিত না হয়, সেজন্য প্রতিটি লঞ্চে ডিজিটাল ভাড়া তালিকা প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।’

যাত্রীসেবায় নতুনত্ব আনার কথা উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী জানান, ঈদের আগে ও পরে মোট ১০ দিন (আগে ৫ দিন ও পরে ৫ দিন) যাত্রীরা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে কুলি ও ট্রলি সেবা পাবেন। প্রবীণ, অসুস্থ ও শারীরিক প্রতিবন্ধী যাত্রীদের জন্য থাকছে ক্যাডেটদের পরিচালিত ফ্রি হুইলচেয়ার সেবা।

নিরাপত্তার বিষয়ে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, মাঝনদীতে নৌকা বা ট্রলারের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণভাবে লঞ্চে ওঠানামা বন্ধে নৌপুলিশ ও কোস্টগার্ডের টহল জোরদার করা হয়েছে। এছাড়া পন্টুনে ওঠার সুবিধার জন্য বিশেষ ‘স্টেপ পন্টুন’ স্থাপন করা হয়েছে।

টার্মিনালের শৃঙ্খলা রক্ষায় আধুনিক ওয়াচ টাওয়ার ও কন্ট্রোল রুমের মাধ্যমে বোর্ডিং ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। প্রতিমন্ত্রী হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘যাত্রীসেবায় কোনো ধরনের অনিয়ম, অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বা অবহেলা ধরা পড়লে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমাদের লক্ষ্য একটি সুশৃঙ্খল ও নিরাপদ ঈদযাত্রা নিশ্চিত করা।’

এদিকে পরিবারের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে ঢাকা ছাড়ছে মানুষ। সায়েদাবাদ, গাবতলী, মহাখালী আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালসহ বিভিন্ন টার্মিনালে এরই মধ্যে ভিড় বেড়েছে। তবে তীব্র রোদ এবং গরমে অস্বস্তি প্রকাশ করছেন যাত্রীরা। বিশেষ করে টিকিট কাউন্টারের সামনে রোদে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন।

রোববার দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতেই টার্মিনালটিতে কয়েকগুণ বেশি চাপ বাড়তে থাকে। টার্মিনালে থাকা প্রতিটি বাস সব আসনে যাত্রী নিয়ে নির্দিষ্ট গন্তব্যের উদ্দেশ্যে টার্মিনাল ছেড়ে যাচ্ছে। তবে কোনো গন্তব্যে সরকার নির্ধারিত বাড়ার বেশি টাকা নিতে দেখা যায়নি।

পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা জানিয়েছেন, সড়কে যানজট না থাকায় ঈদযাত্রায় বাড়তি চাপে সমস্যা হচ্ছে না মহাখালী আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালে। অনেকটা স্বস্তিতেই বাড়ি ফিরছেন যাত্রীরা। রোববার সন্ধ্যায় ও সোমবার টার্মিনালে যাত্রীর চাপ আরও কয়েকগুন বাড়বে। ঘরমুখো মানুষের এ চাপ ঈদের পরদিন পর্যন্ত থাকবে।

মহাখালী আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল থেকে ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, জামালপুর, কিশোরগঞ্জ, সিলেট, সুনামগঞ্জ রুটে বাস যাত্রী পরিবহন করে। এসব রুটে যাতায়াতের আগাম টিকিট কিনতে হয় না। টার্মিনালে গেলেই টিকিট পাওয়া যায়। আবার কয়েকটি পরিবহনের টিকিটের জন্য খানিকটা সময় লাইনে দাঁড়াতে হলেও টিকিট পাওয়া যায়।

রোববার সরেজমিনে দেখা যায়, ঢাকার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে মহাখালী টার্মিনালে আসছেন ঘরমুখো মানুষ। তারা নিজ নিজ গন্তব্যের বাস কাউন্টারের সামনে গিয়ে নির্দিষ্ট মূল্যে টিকিট কাটছেন। কোনো কাউন্টারে সরকার নির্ধারিত ভাড়ার বেশি নিতে দেখা যায়নি। উল্টো অনেক বাস কাউন্টারের সামনে ছোট ব্যানার-ফেস্টুনে লেখা, ‘ঈদ উপলক্ষে বিআরটিএ নির্ধারিত ভাড়ার অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া হয় না’।

ঈদ মৌসুমে এই সড়কগুলোতে শুধু যাওয়ার যাত্রী পাওয়া যায়। ফেরার সময় যাত্রী পাওয়া যায় না। তাই ঈদযাত্রার এক-দুদিন আগে গন্তব্য অনুযায়ী ১০০ থেকে ১৫০ টাকা বেশি ভাড়া নেওয়া হয়। এ নিয়ে কারও তেমন আপত্তি থাকে না।

মহাখালী আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল থেকে ময়মনসিংহ রুটে সবচেয়ে বেশি যাত্রী যাতায়াত করেন। এই রুটে সবচেয়ে বেশি যাত্রী পরিবহন করে ইউনাইটেড ট্রান্সপোর্ট। ৫ আগস্ট সরকার পতনের আগে এই রুটে এককভাবে যাত্রী পরিবহন করতো এনা ট্রান্সপোর্ট। এখন এনার সেই কাউন্টারেই টিকিট বিক্রি করছে ইউনাইটেড। এই পরিবহনের বাসে বাড়তি ভাড়া আদায়ের কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি।

তবে কাউন্টারের সামনে তীব্র রোদ এবং গরমে টিকিটের জন্য শতাধিক মানুষকে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। অনেকে ছাতা মাথায় দাঁড়িয়েছেন। আবার অনেকে কাগজ, ব্যাগ মাথায় নিয়ে দাঁড়িয়েছেন। এর মধ্যে নারী, শিশু ও বয়স্ক যাত্রীদের ভোগান্তি বেশি দেখা গেছে।

ময়মনসিংহ সদরে যাওয়ার জন্য ইউনাইটেড ট্রান্সপোর্টের টিকিট কাটেন যাত্রী ফারুক হোসেন। তিনি বলেন, স্বাভাবিক সময়ের মতোই কাউন্টারে গিয়ে টিকিট কেটেছি। তবে অন্য সময়ের চেয়ে এখন যাত্রীর চাপ কিছুটা বেশি। এখন গরমে অস্বস্তি লাগছে। ঈদযাত্রায় এটাই সমস্যা মনে হচ্ছে।

তবে ইউনাইটেড ট্রান্সপোর্টের এসি বাসের স্বল্পতার কারণে অনেক যাত্রীকে দীর্ঘ সময় কাউন্টারে অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। বিকেল ৩টার দিকে আলাউদ্দিন নামের এক যাত্রী জানান, ঘণ্টা খানেক আগে তিনি বাসের টিকেট কেটেছেন। তবে সে বাস এখনো কাউন্টারে আসেনি। বাসটি আসতে আরও আধা ঘণ্টা সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

ইউনাইটেড ট্রান্সপোর্টের টিকিট বিক্রয়কর্মী মাকসুদ হোসেন বলেন, রোববার সকাল থেকে কাউন্টারে টিকিট বিক্রি শুরু হয়েছে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যাত্রীও বেড়েছে। পর্যাপ্ত যাত্রী হলেই আমাদের বাস টার্মিনাল ছেড়ে যাচ্ছে। রাস্তায় যানজট না থাকায় যাত্রীরা স্বস্তিতে যাতায়াত করতে পারছেন। তবে এসি বাস কম থাকায় যাত্রীদের কিছুটা ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

মহাখালী-বগুড়া-নওগাঁ রুটে এসি ও ননএসি বাস পরিচালনা করে একতা ট্রান্সপোর্ট। দেখা যায়, টার্মিনাল ভবনের ভেতর এর কাউন্টার। কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে টিকিট কাটছেন যাত্রীরা। কাউন্টারের সামনে ছোট ফেস্টুনে লেখা ‘ঈদ উপলক্ষে বিআরটিএ নির্ধারিত ভাড়ার অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া হয় না’।

মহাখালী থেকে বগুড়া যাওয়ার জন্য টিকিট কাটেন যাত্রী নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ঈদের ছুটিতে গ্রামে যাচ্ছি। পরিবারের সবাই গ্রামে থাকে। আশা করি সবার সঙ্গে দেখা হবে। সবাই মিলে ঈদ উৎযাপন করবো। বাসের টিকিট পেতে সমস্যা হয়নি। সরকার নির্ধারিত ভাড়াই তারা নিয়েছেন। এখন সুষ্ঠুভাবে বাড়ি পৌঁছাতে পারলেই খুশি।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক কাজী জোবায়ের মাসুদ বলেন, নিরাপদ ঈদযাত্রা নিশ্চিত করতে সব ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে মালিক সমিতি। প্রতিটি টার্মিনালে শৃঙ্খলা রক্ষায় মালিক সমিতির পৃথক পৃথক টিম কাজ করছে। আর সব বাস মালিককে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যাতে বিআরটিএ নির্ধারিত হারের বেশি কেউ ভাড়া না নেয়। কেউ বেশি ভাড়া নিয়েছে এমন অভিযোগ পেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।