বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নারি আসনের সংসদ সদস্য নাজমুন নাহার নিলু এমপি বলেছেন, দীর্ঘ ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদী স্বৈরশাসন দেশের গণতন্ত্র, অর্থনীতি ও জনগণের অধিকারকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। গুম, খুন, আয়নাঘর ও নির্যাতনের মাধ্যমে দেশকে ধ্বংসের প্রান্তে নিয়ে গেছে। তবে জুলাই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার নতুন দুয়ার উন্মোচিত হয়েছে। নতুন সরকার ও নতুন বিরোধী দল গণতান্ত্রিক কর্মপরিবেশ তৈরিতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে— এমন প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু নতুন সরকারের কর্মকাণ্ডে জনগণ হতাশ হয়েছে।

শনিবার (১ আগস্ট) জাতীয় প্রেসক্লাবের আব্দুস সালাম হলে নারী শ্রমিক সমাবেশ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করেন।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নারীদের অবদান, গণভোটের রায়ের আলোকে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, নারী শ্রমিকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ, ন্যায্য মজুরি এবং কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করার দাবিতে বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের উদ্যোগে ‘নারী শ্রমিক সমাবেশ’ অনুষ্ঠিত হয়।

নাজমুন নাহার নিলু এমপি বলেন, একাত্তরে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে নানা সময়ে রাষ্ট্রে স্থিতিশীলতার অভাবের কারণে শ্রমিকদের অধিকার বারবার পিছিয়েছে। গণতান্ত্রিক আন্দোলনের জন্য শ্রমিক-জনতাকে জীবন দিতে হয়েছে। রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও দুর্বৃত্তায়নের কারণে দেশ বহুবার পিছিয়েছে দেশ।

তিনি বলেন, আজও নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি ও শিশু নির্যাতন বন্ধ হয়নি। প্রতিদিনই এসব ঘটনার সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে। এমন বাংলাদেশ আমরা চাই না। সরকার ও বিরোধী দলকে এ পরিস্থিতি থেকে জাতিকে উদ্ধার করতে হবে। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা ফিরে আসবে। তাই সরকারকে দ্রুত জুলাই সনদ বাস্তবায়নে এগিয়ে আসতে হবে।

তিনি আরও বলেন, স্বাধীনতা আমরা পেয়েছি ১৯৭১ সালে, কিন্তু রাজনৈতিক স্বাধিকার অর্জিত হয়েছে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে, ৩৬ জুলাই তথা ৫ আগস্টের ঘটনাপ্রবাহে দুইজন নারী শ্রমিকসহ দেড় হাজার শহীদের রক্তের ওপর আজকের রাষ্ট্র দাঁড়িয়ে আছে। তাদের অবদান জাতি চিরদিন স্মরণ করবে, সেই আত্মত্যাগ কোনোভাবেই ভুলে যাওয়া যাবে না।

নাজমুন নাহার নিলু এমপি বলেন, দেশের অধিকাংশ শ্রমিকই নারী। জুলাই আন্দোলনে মাছ বিক্রেতা শাহিনুর বেগম (৫৭) এবং গৃহকর্মী মোসাম্মাদ লিজা নিজ বাসার বারান্দায় গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন। এটি নারীদের প্রতি বর্বরতার নির্মম উদাহরণ। নারী-পুরুষ অসংখ্য শহীদ ও আহতের প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্ব রয়েছে। আমরা আশা করি সরকার তাদের প্রতি যথাযথ দায়িত্ব পালন করবে।

তিনি বলেন, একজন সাহসী নারী সানজিদা পুলিশের সামনে দাঁড়িয়ে স্বাধীনতার পক্ষে উচ্চারণ করেছিলেন। নারীরা যেমন দেশের জন্য জীবন দিতে পারে, তেমনি নিজেদের শ্রম অধিকারও আদায় করতে সক্ষম হবে। তিনি বলেন, ৭০ শতাংশ গণভোটের রায় মেনে নেওয়া, শ্রমিকদের সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ, নারী শ্রমিকদের জন্য মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা, কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি বন্ধ করা এবং এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি নারী শ্রমিকদেরও সচেতন হতে হবে, ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার নিশ্চিত করা, নারী শহীদ পরিবারের সম্মান রক্ষা করা, জুলাই বিপ্লবের আহতদের দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা।

নাজমুন নাহার নিলু বলেন, নিকট অতীতে ট্রেড ইউনিয়ন কার্যক্রমে নারী শ্রমিকদের অংশগ্রহণ তেমন দেখা যায়নি। আগামী দিনে ট্রেড ইউনিয়নকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। এত বছর পরও নারী শ্রমিকরা ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত। তাদের অধিকার আদায়ে সোচ্চার হতে হবে। মাতৃত্বকালীন সুবিধা, স্বাস্থ্যসেবা ও কর্মস্থলে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা, নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি বন্ধ করতে হবে। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের নারী শ্রমিকদের সমস্যার সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের অধিকার নিশ্চিত ও শক্তিশালী করতে হবে, যাতে নারী শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সহ-সাধারণ সম্পাদক রোজিনা আক্তার। বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন, জাতীয় নাগরিক পার্টি এনসিপি র সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট হুমায়রা নুর, সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি নাজমা আক্তার, কেন্দ্রীয় কার্যকরী পরিষদ সদস্য ও সাবেক কাউন্সিলর আমেনা বেগম, দৈনিক নয়া দিগন্তের নারীর পাতার সাবেক সম্পাদক কামরুন নেসা মাকসুদা, প্রগতিশীল গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সহ-সভাপতি শাহিদা সরকার, সাধারণ সম্পাদক কামরুল নাহার।

কেন্দ্রীয় কার্যকরি পরিষদ সদস্য জেসমিন নাহারের সঞ্চালনায় আরও বক্তব্য রাখেন আহত যোদ্ধার মা খাদীজা আক্তার, শ্রমিক কল্যাণ কেন্দ্রীয় কার্যকরি কমিটির সদস্য শাহীদা সরকার, শহীদ আক্তারুজ্জামান নাঈমের স্ত্রী সুমি আক্তার, গার্মেন্স শ্রমিক চন্দ্রনা, শহীদ তুহিনের মা সহ

বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের নারী নেত্রীবৃন্দ, বিভিন্ন সেক্টরের নারী শ্রমিক এবং সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।