• হাম ও উপসর্গ নিয়ে আরও ৭ জনের মৃত্যু
  • দেশের আট বিভাগেই রোগী শনাক্ত হয়েছে
  • হাসপাতালে যাওয়া রোগীদের বেশির ভাগই পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশু

বাংলাদেশে হাম পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। পরিস্থিতি জাতীয়ভাবে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ বলে মূল্যায়ন করেছে সংস্থাটি। বাংলাদেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮ জেলায় সংক্রমণ ছড়ানো, বিশালসংখ্যক শিশুর আক্রান্ত হওয়া, টিকাদানের অভাবে এ রোগ প্রতিরোধ সক্ষমতায় ঘাটতি এবং হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর ঘটনাবলির আলোকে সংস্থাটি বৃহস্পতিবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ মূল্যায়ন করা হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নতুন মূল্যায়নের পর সংস্থাটির সাবেক পরামর্শক ও জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন গতকাল শুক্রবার বলেন, সংক্রমণ পরিস্থিতি বাড়তে থাকায় আমরা বলেছিলাম, হামকে জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতি ঘোষণা করা হউক। এখন সরকারের উচিত জরুরি পরিস্থিতি ঘোষণা করা এবং টিকাদান এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৫ মার্চ থেকে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত দেশে মোট ১৯ হাজার ১৬১ সন্দেহভাজন হাম রোগীর তথ্য পাওয়া গেছে। একই সময়ে পরীক্ষা করে নিশ্চিত রোগী পাওয়া গেছে ২ হাজার ৮৯৭। তবে পরিস্থিতির বিস্তারিত বিবরণে পরীক্ষাগারে নিশ্চিত রোগীর সংখ্যা ২ হাজার ৯৭৩ উল্লেখ করা হয়েছে। এ সময় হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ১৬৬ জনের। মৃত্যুহার বা সিএফআর ০ দশমিক ৯ শতাংশ। পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হাম-সম্পর্কিত মৃত্যু হয়েছে ৩০ জনের। এ ক্ষেত্রে মৃত্যুহার ১ দশমিক ১ শতাংশ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, দেশের আট বিভাগেই রোগী শনাক্ত হয়েছে। ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮ জেলায়, অর্থাৎ ৯১ শতাংশ জেলায় রোগী পাওয়া গেছে। এটি দেখাচ্ছে, সংক্রমণ এখন জাতীয়ভাবে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। দেশের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) তথ্য বলছে, দেশের ৬১টি জেলায় হাম ছড়িয়েছে। আক্রান্ত শিশুদের ৮৩ শতাংশের বয়স ৫ বছরের নিচে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়, হাসপাতালে যাওয়া রোগীদের বেশির ভাগই পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশু। এই হার ৭৯ শতাংশ। এর মধ্যে দুই বছরের কম বয়সি শিশু ৬৬ শতাংশ এবং ৯ মাসের কম বয়সী শিশু ৩৩ শতাংশ। মোট ১৬৬ শিশুর সন্দেহভাজন মৃত্যুর তথ্য পাওয়ার কথা বলা হয় প্রতিবেদনে। তারা প্রধানত টিকা না পাওয়া দুই বছরের কম বয়সি শিশু।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, বর্তমান প্রাদুর্ভাবের একটি বড় উদ্বেগ হলো, অনেক শিশু হয় টিকা পায়নি, নয়তো হামপ্রতিরোধী টিকার মাত্র এক ডোজ পেয়েছে। আবার কিছু শিশু ৯ মাস বয়সে টিকার উপযুক্ত বয়সে পৌঁছানোর আগেই আক্রান্ত হয়েছে। অধিকাংশ রোগী, অর্থাৎ ৯১ শতাংশ, ১ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশু। এটি এই বয়সি শিশুদের মধ্যে বড় ধরনের রোগ প্রতিরোধঘাটতির ইঙ্গিত দেয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে যে এই প্রাদুর্ভাবের আগে বাংলাদেশ হাম নির্মূলের পথে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছিল। হামপ্রতিরোধী টিকার প্রথম ডোজের কভারেজ ২০০০ সালে ছিল ৮৯ শতাংশ। ২০১৬ সালে তা বেড়ে হয় ১১৮ শতাংশ। দ্বিতীয় ডোজ দেশব্যাপী চালুর পর ২০১২ সালে কভারেজ ছিল ২২ শতাংশ। ২০২৪ সালে তা বেড়ে হয় ১২১ শতাংশ। একই সময়ে পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হাম রোগীর হার দ্রুত কমে এসেছিল।

প্রাদুর্ভাব মোকাবিলার অন্যান্য ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে নিয়মিত টিকাদান জোরদার করা, হাসপাতালের প্রস্তুতি বাড়ানো, ভিটামিন এ সরবরাহ নিশ্চিত করা, রোগী আলাদা রাখার সক্ষমতা বাড়ানো এবং সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা শক্তিশালী করা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, সীমান্তবর্তী এলাকায় মানুষের চলাচলের কারণে সীমান্ত পেরিয়ে সংক্রমণ ছড়ানোর উল্লেখযোগ্য ঝুঁকি আছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও কক্সবাজারের মতো বড় নগরকেন্দ্র আন্তর্জাতিক যাতায়াত ও ট্রানজিটের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ফলে দেশের ভেতরে ও বাইরে সংক্রমণ ছড়ানোর আশঙ্কা বাড়ে, বিশেষ করে যারা টিকা নেয়নি বা পুরোপুরি টিকা পায়নি, এমন ভ্রমণকারীদের মাধ্যমে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলে হাম স্থানীয়ভাবে বিদ্যমান। আঞ্চলিক পর্যায়ে ঝুঁকিকে ‘উচ্চ’ হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছে।

ভারত উচ্চ টিকাদান কভারেজ অর্জন করলেও গত ছয় মাসে সেখানে হাম রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। যশোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের মতো বেশি সংক্রমণপ্রবণ শহর ভারতের সঙ্গে ব্যস্ত স্থলবন্দর ভাগ করে। এতে সীমান্তের ওপার থেকে সংক্রমণ প্রবেশের ঝুঁকি বাড়ে। বিশ্ব পর্যায়ে ঝুঁকি ‘মধ্যম’ হিসেবে মূল্যায়ন করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

এদিকে দেশজুড়ে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে হামে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা। সংক্রমণের এই ঊর্ধ্বগতির মধ্যেই গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে আরও ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৪ জন নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত ছিলেন এবং বাকি ৩ জন হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন।

গতকাল শুক্রবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোল রুম থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। মাঠ পর্যায়ের চিত্র বলছে, সংক্রমণের তীব্রতা বাড়ার অন্যতম কারণ হাসপাতালের ভেতরে ও বাইরে পর্যাপ্ত আইসোলেশন বা পৃথক রাখার ব্যবস্থার অভাব। আক্রান্ত শিশুদের মাধ্যমেই এই রোগ দ্রুত অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে হাসপাতালে শয্যা সংকটের কারণে আক্রান্ত শিশুদের সাধারণ রোগীদের কাছাকাছি থাকতে হচ্ছে, যা নতুন করে সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি করছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দ্রুত আইসোলেশন নিশ্চিত করা না গেলে পরিস্থিতি আরও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত ১৫ মার্চ থেকে ২৪ এপ্রিল সকাল ৮টা পর্যন্ত মোট সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৯ হাজার ৫৫৯ জনে। এর মধ্যে চার হাজার ২৩১ জনের হাম নিশ্চিত হয়েছে। এ পর্যন্ত সন্দেহভাজন ও নিশ্চিত মিলিয়ে ১৯ হাজার ৭০৫ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। আর ১৬ হাজার ৫২৭ জন চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। প্রাদুর্ভাব শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হয়ে ৪২ জন মারা গেছেন। আর হামের উপসর্গ নিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন ১৯৮ জন।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে নতুন করে এক হাজার ২১৫ জন সন্দেহভাজন হামরোগী শনাক্ত হয়েছে। আক্রান্তদের বড় একটি অংশই শিশু। হাসপাতালগুলোতে ক্রমাগত রোগীর চাপ বাড়তে থাকায় চিকিৎসাসেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ। সময়মতো টিকা না নেওয়া এবং আক্রান্তদের সংস্পর্শে আসায় এই প্রাদুর্ভাব দীর্ঘায়িত হচ্ছে। শিশুদের জ্বর ও শরীরে লালচে দানা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে এবং অন্যদের থেকে আলাদা রাখার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

খুলনা বিভাগে হামের প্রাদুর্ভাবে ১ জনের মৃত্যু : শনাক্ত-৮২

খুলনা ব্যুরো

খুলনা বিভাগের পরিচালক স্বাস্থ্য দপ্তরের সর্বশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, বিভাগজুড়ে হামের সংক্রমণ পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগজনক। গত ২৪ ঘণ্টায় মোট ৮২ জন সন্দেহজনক হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে এবং খুলনায় ১ জন রোগী মৃত্যু হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় কুষ্টিয়ায় সর্বোচ্চ ২৯ জন নতুন সন্দেহজনক রোগী শনাক্ত হয়েছে। এছাড়া যশোরে ১৪ জন, খুলনায় ৮ জন, বাগেরহাটে ৪ জন, ঝিনাইদহে ৬ জন, মাগুরায় ৯ জন, মেহেরপুরে ৫ জন, সাতক্ষীরায় ৩ জন এবং চুয়াডাঙ্গা ও নড়াইলে ২ জন করে নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে। এসময়ে খুলনায় একজন সন্দেহজনক হাম রোগীর মৃত্যু হয়েছে।

চলতি বছরের গত ১৫ মার্চ থেকে ২৩ এপ্রিল পর্যন্ত খুলনা বিভাগে মোট ২ হাজার ১৮৩ জন সন্দেহজনক হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৮১৭ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং ১৪৯৯ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। এ সময়ের মধ্যে নিশ্চিত হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৭০ জন এবং সন্দেহজনক হামে ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে।

জেলাভিত্তিক তথ্যে দেখা যায়, কুষ্টিয়ায় সর্বোচ্চ ৬৮৭ জন সন্দেহজনক রোগী শনাক্ত হয়েছে। এছাড়া যশোরে ৩৯৮ জন, খুলনায় ১৮৯ জন, মাগুরায় ৩০৩ জন, মেহেরপুরে ১৬২ জন, নড়াইলে ১০৮ জন, সাতক্ষীরায় ৯১ জন, বাগেরহাটে ৯৫ জন, ঝিনাইদহে ১০১ জন এবং চুয়াডাঙ্গায় ৪৯ জন সন্দেহজনক রোগী পাওয়া গেছে।

স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, হামের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা হয়েছে এবং জনগণকে সচেতন থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। বিশেষ করে শিশুদের সময়মতো টিকা নিশ্চিত করার জন্য অভিভাবকদের প্রতি জোর দেওয়া হয়েছে।