গাজীপুরের পাতারটেকে ‘জঙ্গীনাটক’ সাজিয়ে সাতজনকে হত্যার ঘটনায় হওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১০ আসামীর বিরুদ্ধে বিচার শুরুর আবেদন জানিয়ে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের বিষয়ে শুনানি শেষ করেছে প্রসিকিউশন।
গতকাল রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর সদস্য বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চে এ আবেদন করা হয়।
প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম। সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ, সহিদুল ইসলাম সরদার, আবদুস সাত্তার পালোয়ান, মামুনুর রশিদ ও মার্জিনা রায়হান।
শুনানিতে এ মামলায় আনা অভিযোগের বিবরণ দিয়ে তামিম বলেন, শেখ হাসিনার সরকারের আমলে দেশজুড়ে একই পদ্ধতিতে অপরাধ সংঘটিত হতো। ভিন্ন দলমত বা ইসলামী মতাদর্শকে নির্মূলে গুম-খুনের মতো বিচারবহির্ভূত হত্যার মতো এক ভীতিকর সংস্কৃতি গড়ে তোলে তারা। সেসময় এমপি-মন্ত্রীদের নিয়ে কোনো কিছু লেখা অসাধ্য ছিল। কারও বিরুদ্ধে কোনো কথা বললেই বিভিন্ন বাহিনীর গোপন বন্দীশালায় গুম করে রাখা হতো।
গুমের শিকার পরিবারের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, বহু পরিবারের সদস্যরা বাধ্য হয়ে বলতে হতো যে- ‘আমার ছেলেকে জেলে দিন, তবু ক্রসফায়ারে দেবেন না’। এরপরও বহু মানুষকে বন্দুকযুদ্ধের নাটক সাজিয়ে হত্যা করে মরদেহ নদীনালা কিংবা সড়কের পাশে ফেলে রাখা হতো। এছাড়া আওয়ামী লীগের মন্ত্রী-এমপিরা শুধু জঙ্গীজঙ্গীবলে বক্তব্য দিতেন। তারা বিশ্বকে জানান দিতে চাইতেন যে, এ দেশে জঙ্গীভরা। অথচ বিচারবহির্ভূত এসব হত্যাকাণ্ডকে মানবাধিকার লঙ্ঘন বলে বিভিন্ন সময়ে প্রতিবেদন দিয়েছে জাতিসংঘসহ বিদেশী অনেক সংস্থা।
পাতারটেকে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড নিয়ে তামিম বলেন, এ ঘটনায় দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে সাতজনকে তুলে নিয়ে বগুড়ায় পুলিশের একটি গোপন বন্দীশালায় আটকে রাখা হয়। ২০১৬ সালের ৮ অক্টোবর গাজীপুরের নোয়াগাঁও পাতারটেক এলাকায় সোলায়মান সরকারের বাড়িতে তাদের নেওয়া হয়। এরপর কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের (সিটিটিসি) নেতৃত্বে জঙ্গীনাটক সাজিয়ে সাতজনকেই গুলি করে হত্যা করেন সোয়াত সদস্যরা। এ অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছিল ‘অপারেশন শরতের তুফান’।
প্রসিকিউশন আরও জানায়, হত্যাযজ্ঞ শেষেই ক্ষান্ত হয়নি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সাতজনের মরদেহ নিতে এলে পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধেও তদন্ত করা হবে বলে স্পষ্ট ভাষায় হুঁশিয়ারি দেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। আর এ ভয়ে কেউই সাহস করেননি। এর মধ্যে চারজনের পরিচয় এখনও অজানা। বাকি তিনজন হলেন- মো. ইবরাহীম, ফরিদুল ইসলাম আকাশ ও সাইফুর রহমান। এর মধ্যে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দেন ইবরাহীমের বাবা।
মূলত আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকতে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বলপূর্বক গুম করে এ ধরনের হত্যাকাণ্ড চালিয়েছিল বলে অভিযোগ করেন প্রসিকিউটর তামিম। এ সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আবেদন করেন।
এদিকে, ডিসচার্জ চেয়ে শুনানির জন্য সময় চান আসামীপক্ষের আইনজীবীরা। এর মধ্যে আইনজীবী সিফাত মাহমুদ শুভ জানান, তারা প্রসিকিউশন থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেরিতে পেয়েছেন। এজন্য প্রস্তুতি নিতে সময় প্রার্থনা করেন। তবে প্রসিকিউশন থেকে কোনো আপত্তি না জানানোয় আগামী ১০ আগস্ট আসামীপক্ষের শুনানির জন্য দিন ধার্য করেন ট্রাইব্যুনাল।
অন্য আসামীরা হলেন- তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, তৎকালীন পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) একেএম শহীদুল হক, তৎকালীন এসবি প্রধান ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তৎকালীন কমিশনার আসাদুজ্জামান মিয়া, তৎকালীন কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম, বগুড়ার তৎকালীন পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান, গাজীপুরের তৎকালীন পুলিশ সুপার ও ডিবিপ্রধান মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ, বগুড়ার তৎকালীন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আরিফুর রহমান মণ্ডল এবং তৎকালীন সিটিটিসির সহকারী পুলিশ কমিশনার (টিম লিডার, সোয়াট) এসএম জাহাঙ্গীর হাছান।
বর্তমানে এ মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন শহীদুল হক ও আসাদুজ্জামান মিয়া। তাদের আজ ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়েছে।
চলতি বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি এই ১০ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন। এরপর অভিযোগ আমলে নিয়ে পলাতকদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন ট্রাইব্যুনাল-১।
জাহাজবাড়িতে জঙ্গীনাটক সাজিয়ে ৯ হত্যা : ডিসচার্জ শুনানি পিছিয়ে ১০ আগস্ট
রাজধানীর কল্যাণপুরে জাহাজবাড়ি নামের ভবনে জঙ্গীনাটক সাজিয়ে ৯ তরুণকে হত্যার ঘটনায় হওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ আটজনের মামলায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন নিয়ে ডিসচার্জ (অব্যাহতি) শুনানি পিছিয়ে আগামী ১০ আগস্ট দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল।
গতকাল রোববার আসামীপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর সদস্য বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চ এ দিন ধার্য করেন।
ট্রাইব্যুনালে গতকাল প্রসিকিউশনের পক্ষে ছিলেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম, প্রসিকিউটর মামুনুর রশিদ, সহিদুল ইসলাম সরদারসহ অন্যরা। এর আগে, ২১ জুলাই আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের বিষয়ে প্রসিকিউশনের শুনানি শেষ হয়। শুনানিতে মামলার ঘটনাস্থলসহ বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে তরুণদের ধরে এনে জঙ্গীতকমা দিয়ে কল্যাণপুরের জাহাজবাড়িতে নিয়ে হত্যা করা হতো। ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের অনেকেই তদন্ত কর্মকর্তার কাছে জবানবন্দী দিয়েছেন। সাক্ষ্যগ্রহণ পর্বে তাদের সাক্ষী হিসেবে উপস্থাপন করা হবে। একইসঙ্গে প্রাইমা ফেসি গ্রাউন্ড বিবেচনায় আট আসামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের আবেদন জানান তিনি।
পরে আসামীপক্ষে আইনজীবী সুলতান মাহমুদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে শুনানির জন্য গতকালকের দিন ধার্য করেন ট্রাইব্যুনাল। তবে পুনরায় সময় চাইলে নতুন তারিখ নির্ধারণ করা হয়।
মামলায় বর্তমানে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন সাবেক আইজিপি একেএম শহিদুল হক ও ডিএমপির সাবেক কমিশনার মো. আসাদুজ্জামান মিয়া।
পলাতক অন্য আসামীরা হলেন- সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, ডিএমপির তৎকালীন অতিরিক্ত কমিশনার শেখ মুহম্মদ মারুফ হাসান, তৎকালীন সিটিটিসি প্রধান মনিরুল ইসলাম, ডিএমপির তৎকালীন যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম) কৃষ্ণ পদ রায় ও তৎকালীন যুগ্ম কমিশনার (ডিবি) আব্দুল বাতেন।
চলতি বছরের ২৯ জানুয়ারি প্রসিকিউশনের দেওয়া আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল-১। পরে গত ৮ মার্চ পলাতক ছয় আসামীর পক্ষে স্টেট ডিফেন্স নিয়োগ দেওয়া হয়।
প্রসিকিউশনের অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ২৫ জুলাই রাতে রাজধানীর কল্যাণপুরে জাহাজবাড়ি নামে পরিচিত একটি ভবনে কথিত জঙ্গীআস্তানায় অভিযান চালায় পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট। 'অপারেশন স্টর্ম-২৬' নামের ওই অভিযানে ৯ তরুণকে গুলি করে হত্যা করা হয়। মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, ঘটনাটি ছিল পরিকল্পিত মানবতাবিরোধী অপরাধ।
কাদেরসহ ৭ নেতার বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ, যুক্তিতর্ক ৪ আগস্ট
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ যুবলীগ-ছাত্রলীগের শীর্ষ সাত নেতার বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে। যুক্তিতর্কের জন্য আগামী ৪ আগস্ট দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল।
রোববার (২ আগস্ট) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ দিন ধার্য করেন। প্যানেলের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
এদিন ২৭ নম্বর সাক্ষী হিসেবে তদন্ত কর্মকর্তা আহমেদ নাসের উদ্দিন মোহাম্মদকে জেরা করেন স্টেট ডিফেন্স আইনজীবী লোকমান হাওলাদার ও ইশরাত জাহান। এরপর যুক্তিতর্কের জন্য তারিখ নির্ধারণ করেন আদালত।
ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ। সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর মঈনুল করিমসহ অন্যান্য প্রসিকিউটর।