জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, আগের ফ্যাসিস্ট যা করেছে হুবহু তাই করছে বর্তমান সরকার। আগের ফ্যাসিস্টের ফটোকপি দেখতে পাচ্ছি বর্তমান সরকারের মাঝে। ওরা যেমন বিরোধী দলমতকে দমন করার জন্য ষড়যন্ত্র, অপপ্রচার এবং বলপ্রয়োগের আশ্রয় নিয়েছিল, আপনারা সবগুলো ইতোমধ্যে নিয়ে ফেলেছেন। সংসদে আমরা পরিষ্কার বলেছি নির্বাচন দুটি হয়েছে। আমরা দুটি নির্বাচনের শপথ নিয়েছি কিন্তু আপনারা নিলেন না কেন? - সেই আপনারাই তো আমাদের মতো বলেছিলেন গণভোটে হ্যাঁ ভোট দিতে। ৭০ ভাগ মানুষ গণভোটে হ্যাঁ বলার পরে জনগণের এই অভিপ্রায়কে আপনারা অপমান করছেন।
গতকাল রোববার বিকেলে বাংলাদেশ লেবার পার্টির উদ্যোগে জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত ‘জান দেবো, জুলাই দেবো না’- শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
এসময় তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকার দল সাড়ে ১৭ বছর আমাদের মতোই মজলুম ছিল। আমি তাদেরকে একবার অনুরোধ করব, জাতির ওপর যেই জুলুমের পাহাড় নেমে এসেছিল, এই ক্ষেত্রটা কেন, কীভাবে প্রস্তুত হয়েছিল তারা যেন একবার চিন্তা করেন।
ডা. শফিকুর রহমান এমপি বলেন, একাত্তরে যুদ্ধ হয়েছিল বেসিক ২টা কারণে। একটা ছিল বৈষম্য আরেকটা ছিল জনগণের ভোটকে সম্মান না দেওয়া। এখন হুবহু তাই দেখা যাচ্ছে। জনগণের ভোটকে সম্মান করা হচ্ছে না। জনগণ রাষ্ট্র সংস্কারের পক্ষে গণভোটে হ্যাঁ ভোট দিয়েছে। কিন্তু জনগণের গণরায় উপেক্ষা করে সরকার সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন না করে সংবিধান সংশোধন কমিটি গঠন করেছে! এই যে জনগণের ভোটকে অস্বীকার করা হয়েছে জনগণ এর প্রতিবাদে রাজপথে নামলে তখন আর টিকে থাকতে পারবেন না।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, সচিব হতে এখন আর বিএসসি করা লাগে না, দলীয় একটা পদ আর আজগবি কিছু কথাবার্তা বলতে পারলেই সচিব হওয়া যায়। অ্যাসিটেন্ট কমিশনার, ডেপুটি কমিশনার, জয়েন্ট সেক্রেটারি, এডিশনাল সেক্রেটারি এরপর সেক্রেটারি। এতো কষ্ট করা লাগবে না। ধাপে-ধাপে সেক্রেটারি পদে যাওয়া লাগে না। মাস তিনেক বিরোধী দলের নেতাদের চরিত্রহরণ করে কথাবার্তা বলতে পারলেই ডাইরেক্ট সচিব পদমর্যাদায় নিয়োগ হয়! তিনি সরকারকে সতর্ক করে বলেন, এরা আসলে কারো নয়। এরা মতলবভাজ। এরা দেশ ও জাতির জন্য ক্ষতিকর। তাই এদের থেকে সাবধান ও সতর্ক থাকতে হবে।
সর্বত্র দলীয়করণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যেই লোক নিজের দলের জন্য জানপ্রাণ দিয়ে কাজ করেছে সেই লোককে আপনারা নির্বাচন কমিশনের মতো একটা নিরপেক্ষ জায়গায় বসিয়েছেন। আপনার উদ্দেশ্য কী সেটি জনগণ অনুমান করতে পারছে। শেখ হাসিনার হাতে ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচন জেনোসাইড হয়েছে। ২০১৪ সালের নির্বাচনে অবুঝ নিরীহ প্রাণীরা ভোট কেন্দ্রে শুয়ে ছিল সেখানে মানুষ ভোট দিতে যায়নি। ২০১৮ সালের নির্বাচনে ধৈর্য ধরতে পারেনি। নিজেদের কর্তৃত্বে, নিয়ন্ত্রণে সবকিছু থাকার পরেও নির্বাচনের আগের রাতেই সবকিছু করে ফেলছে। ২০২৪ সালে আমি-ডামি নির্বাচন। এই নির্বাচন গুলোকে জাতি ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছে। কিন্তু আবার সেই একই আয়োজন।
তিনি বলেন, মনে রাখবেন সূর্য কিন্তু একদিন পূর্ব দিকে উঠে পশ্চিম দিকে অস্ত যায় না। প্রতিদিন ওঠে এবং প্রতিদিন অস্ত যায়। সূর্য যখন ওঠে তখন শক্তিমত্তা নিয়ে ওঠে, দুপুর পর্যন্ত মারাত্মক বীরত্বপনা (বাহাদুরি) থাকে। কিন্তু দুপুরের পর থেকে তার পতন শুরু হয়। এবং শেষ পর্যন্ত গিয়ে সে ডুবতে বাধ্য হয়। সূর্য কারো মাথার ওপর দুপুরবেলার মতো করে সবসময় থাকবে না। কোনো সরকার যদি জনগণের অভিপ্রায় সম্মান করে চলে, তাহলে সেই সরকার মানুষের মনজগতে শক্ত আসন ভিত্তি করে নিতে পারে। আর মানুষের অভিপ্রায়কে যদি কোনো সরকার অসম্মান করে চলে, জনগণ তাদের অন্তর থেকে ওই সরকারকে প্রত্যাখ্যান করে। এমনভাবে প্রত্যাখ্যান করে শেষ পর্যন্ত এই সৎ সাহসটাও থাকে না যে নিজের দেশে আমি থাকি। দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়।
তিনি বলেন, জুলাই এসেছে মূলত বৈষম্যকে মুগুরের আঘাত দেওয়ার জন্য। বাংলাদেশে বৈষম্য আর চলবে না। এখন যারা ক্ষমতায় গিয়ে বৈষম্য করছেন মাশুল তাদেকেরই দিতে হবে।
সভায় প্রধান আলোচকের বক্তব্য এলডিপির চেয়ারম্যান, সাবেক মন্ত্রী কর্নেল (অব.) ড. অলি আহমেদ বীর বিক্রম বলেন, স্বৈরাচারী হাসিনাকে কিছু সাংবাদিক পাম-পট্রি দিয়ে কথা বলতো এবং প্রশ্ন করতো যাতে করে শেখ হাসিনা খুশি হয় এবং তার ক্ষমতা পাকাপোক্ত হয়। জনগণ বুঝলেও শেখ হাসিনা বুঝতো না যে ওই সাংবাদিকেরা তাকে পাম দিচ্ছে। এখন আবার কিছু লোক সৃষ্টি হয়েছে যাদেরকে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী কর্মকর্তা হিসেবে পদায়ন করেছেন। এবং আমাদের জনগণের ট্যাক্সের টাকা থেকে বেতন দেওয়া হচ্ছে। তাদের বাপের পরিচয় নেই, মায়ের পরিচয় নেই অথচ জাতীয় নেতাদের সম্বন্ধে বক্তব্য রাখছে!
তিনি আরও বলেন, বিগত ৫৫ বছর জনগণ প্রতারিত হয়েছে। ন্যায় বিচার পায়নি, সুশাসন প্রতিষ্ঠা হয়নি। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে মানুষের ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি হয়েছে। তিনি প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে বলেন, সংস্কার করবেন বলে আপনি জনগণের সাথে যেই ওয়াদা করেছেন, সেই সংস্কার গুলো করেন। দেশ পরিচালনা করেন আমাদের কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু জনগণের সাথে ওয়াদা করে সেই ওয়াদা রক্ষা করবেন না, জনগণকে ধোঁকা দিবেন, জনগণ প্রতারিত হবে সেটি আমরা মেনে নিতে পারি না, পারবো না।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমীর মো. নূরুল ইসলাম বুলবুল এমপি বলেন, জুলাই মানে আধিপাত্যবাদের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড বিদ্রোহ, জুলাই মানে বৈষম্যহীন বাংলাদেশের জন্য জীবন দেওয়া, জুলাই মানে নতুন বাংলাদেশের আকাঙক্ষা। সেই আকাঙক্ষা বাস্তবায়নের জন্য হাজার-হাজার তরুণ ছাত্র, যুবক, শিশু-কিশোর এবং নারী জীবন দিয়েছিলেন। ৫০ হাজারের অধিক মানুষ আহত হয়েছিলেন। ৩০ হাজারের বেশি মানুষ হাত-পা ও চোখ হারিয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। আমরা তার বিনিময়ে ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে একটি নতুন বাংলাদেশ পেয়েছি। এই নতুন বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষা ছিল উই ওয়ান্ট জাস্টিস, আমরা ন্যায় বিচার চাই, আমরা ন্যায় ও ইনসাফের বাংলাদেশ চাই। আমরা বৈষমীহীন বাংলাদেশ চাই। গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ছিল আমরা সুখি-সমৃদ্ধশালী বসবাসযোগ্য মানবিক বাংলাদেশ চাই। কিন্তু দূর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী দল বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর জুলাইকে হারিয়ে দেওয়ার জন্য একের পর এক ভূমিকা তারা পালন করছে।
তিনি আরও বলেন, আমাদের বক্তব্য পরিষ্কার সংসদে জনগণের পক্ষে যদি কোনো সিদ্ধান্ত হয় আমরা সহযোগিতা করব। কিন্তু জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করলে সংসদের ভেতরে এবং বাইরে আমরা আন্দোলন গড়ে তুলবো। জনগণের স্বার্থের বাইরে কোনো কাজ করতে দেয়া হবে না। জনগণের গণরায় মেনে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সরকারকে বাধ্য করা হবে।
বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে আরও বক্তব্য রাখেন এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসিরুদ্দিন পাটোয়ারী, বিডিপির চেয়ারম্যান এডভোকেট আনোয়ারুল ইসলাম চান, নেজামে ইসলাম পার্টি মহাসচিব মাওলানা মুছা বিন ইজহার ও জাগপা সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ইকবাল হোসেন প্রধান। বাংলাদেশ লেবার পার্টির ভাইস চেয়ারম্যান এস এম ইউসুফ আলী, এডভোকেট জোহরা খাতুন জুঁই, মুখপাত্র মোঃ নাজমুল ইসলাম তালুকদার, যুগ্ম মহাসচিব আবদুর রহমান খোকন, হেলাল উদ্দিন চৌধুরী, সাংগঠনিক সম্পাদক মেজবাউল ইসলাম সজিব, মোঃ নজরুল ইসলাম চৌধুরী, দফতর সম্পাদক মোঃ মিরাজ খান, অর্থ সম্পাদক মো. জাহিদুল ইসলাম, মহিলা সম্পাদিকা নাসিমা নাজনীন সরকার, প্রচার সম্পাদক মোঃ মনির হোসেন খান, শ্রম সম্পাদক জিয়াউর রহমান হিরা, রংপুর মহানগর সমন্বয়কারী সামশুদ্দীন রাজা, ছাত্র মিশনের সভাপতি সৈয়দ মোঃ মিলন, লেবার পার্টির ঢাকা মহানগর যুগ্ম আহবায়ক মোঃ মাসুদ আলম পাটোয়ারী, মোঃ রাজু বেপারী মহানগর সদস্য এনামুল হক আকন্দ, শ্রমিক মোঃ মালেক ও মহানগর সদস্য সচিব মোঃ সিয়াম মোল্লা প্রমুখ।