মু. শফিকুল ইসলাম, গোমস্তাপুর (চাঁপাইনবাবগঞ্জ) : বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী জনপদ জয়পুরহাট জেলা- ইতিহাস, সংস্কৃতি ও প্রত্নসম্পদের এক অনন্য ভাণ্ডার। এই জেলার পাঁচবিবি উপজেলা-তে অবস্থিত প্রাচীন পাঁচবিবি মসজিদ নীরবে বহন করে চলেছে কয়েক শতকের ইতিহাস, ধর্মীয় চর্চা এবং স্থাপত্যশৈলীর সাক্ষ্য। এটি শুধু একটি মসজিদ নয়- বরং রাজশাহী বিভাগের মুসলিম ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।
নির্মাণকাল ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
পাঁচবিবি মসজিদের সুনির্দিষ্ট নির্মাণ সাল নিয়ে প্রামাণ্য শিলালিপি না থাকলেও গবেষকদের ধারণা, এটি ১৭শ’ থেকে ১৮শ’ শতকের মধ্যে, অর্থাৎ মুঘল শাসনামলের শেষ পর্যায়ে নির্মিত। ঐ সময়ে উত্তরাঞ্চলে ইসলামী স্থাপত্য ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার যে ধারা ছিল, এই মসজিদ তারই একটি অংশ।
স্থানীয় প্রবীণদের মতে, মসজিদটি কোনো প্রভাবশালী জমিদার বা ধর্মপ্রাণ দাতার উদ্যোগে নির্মিত হয়। ‘পাঁচবিবি’ নামটির উৎপত্তি নিয়ে বিভিন্ন মত রয়েছে- অনেকে মনে করেন, পাঁচজন ধর্মপ্রাণ নারী (বিবি) বা পীর পরিবারের সঙ্গে এই নামের সম্পর্ক থাকতে পারে। যদিও এ বিষয়ে সুস্পষ্ট ঐতিহাসিক দলিল সীমিত।
স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য : সরলতায় সৌন্দর্য
পাঁচবিবি মসজিদে মুঘল স্থাপত্যরীতির প্রভাব সুস্পষ্ট। এর গঠন ও নকশায় যে বৈশিষ্ট্যগুলো লক্ষণীয়Ñ
গম্বুজ কাঠামো : মসজিদটির ওপর এক বা একাধিক অর্ধগোলাকৃতির গম্বুজ ছিল/আছে, যা মুঘল আমলের ধর্মীয় স্থাপত্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
খিলানযুক্ত প্রবেশপথ : সামনের দিকে খিলান আকৃতির দরজা, যা সৌন্দর্য ও স্থায়িত্ব দুটোই নিশ্চিত করে।
পুরু দেয়াল ও ইটের নির্মাণ : লাল পোড়ামাটির ইট ব্যবহার করে নির্মিত মোটা দেয়াল তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক এবং স্থায়িত্ব বাড়ায়।
অলংকরণে সংযম: অন্যান্য বড় মুঘল স্থাপনার মতো জটিল কারুকাজ না থাকলেও সরল নকশা ও অনুপাতের ভারসাম্য মসজিদটিকে দিয়েছে নান্দনিক সৌন্দর্য।
স্থাপত্য বিশ্লেষণে বোঝা যায়, এটি গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে নির্মিত একটি মাঝারি আকারের মসজিদ, যা স্থানীয় মুসল্লিদের ধর্মীয় চাহিদা পূরণে ব্যবহৃত হতো।
ধর্মীয় ও সামাজিক গুরুত্ব
পাঁচবিবি মসজিদ দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় মুসলিম সমাজের ধর্মীয় কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এখানে-
প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামায আদায় করা হয়
জুমার নামাযে আশপাশের গ্রাম থেকে মুসল্লিদের সমাগম ঘটে
রমজান মাসে তারাবিহ, কুরআন তিলাওয়াত ও ইফতার মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়
এছাড়া এটি স্থানীয় সামাজিক যোগাযোগেরও একটি কেন্দ্রবিন্দু, যেখানে ধর্মীয় শিক্ষা ও নৈতিক মূল্যবোধের চর্চা হয়।
সংরক্ষণ অবস্থা ও চ্যালেঞ্জ
সময়ের বিবর্তনে মসজিদটির কিছু অংশ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং আধুনিক সংস্কারের অনিয়ন্ত্রিত প্রচেষ্টা এর মূল স্থাপত্যশৈলীর জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের ঐতিহাসিক স্থাপনাকে সংরক্ষণে প্রয়োজন-
প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ ও নথিভুক্তকরণ
বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সংস্কার
স্থানীয় জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি
যদি যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া না হয়, তবে ভবিষ্যতে এই ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাটি তার স্বকীয়তা হারাতে পারে।
পর্যটন সম্ভাবনা
উত্তরবঙ্গের ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় পর্যটনের ক্ষেত্রে পাঁচবিবি মসজিদ একটি সম্ভাবনাময় স্থান। পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার-এর মতো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের কাছাকাছি অবস্থান হওয়ায় এটি পর্যটন মানচিত্রে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
যথাযথ অবকাঠামো, তথ্যফলক, এবং প্রচারণা থাকলে দেশি-বিদেশি পর্যটক আকৃষ্ট হবে স্থানীয় অর্থনীতি চাঙা হবে ঐতিহ্য সংরক্ষণে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে
উপসংহার
পাঁচবিবি মসজিদ আমাদের ইতিহাসের একটি নীরব দলিল—যেখানে মিশে আছে ধর্মীয় বিশ্বাস, স্থাপত্যশৈলী এবং গ্রামীণ ঐতিহ্যের অনন্য সমন্বয়। এটি শুধু অতীতের স্মারক নয়, বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্যও এক গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ।
এই মসজিদকে ঘিরে আমাদের দায়িত্ব শুধু নামাজ আদায়ে সীমাবদ্ধ নয়—বরং এটিকে সংরক্ষণ, গবেষণা এবং জাতীয় ঐতিহ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। তাহলেই ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানতে পারবে—নিঃশব্দ এই স্থাপনাগুলোই আমাদের ইতিহাসের সবচেয়ে জীবন্ত সাক্ষী। লেখক : প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক