নাজমুন নাহার নীলু
দীর্ঘদিন পর নির্বাচিত সরকার দেশ পরিচালনা করছে। যদিও জনগণ ভোট দিয়ে ক্ষমতায় দেখতে চেয়েছিল বিরোধী দলকে। কিন্ত নানাবিধ ষড়যন্ত্রের কারণে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সরকার গঠন করতে পারেনি। যাইহোক সরকার তার হানিমুন পিরিয়ড পার করেছেন সদ্য। এই সময়ে সরকারের সফলতা কি বা অর্জন কি? আলোচনা করলে দেখা যাবে অর্জনের চেয়ে সফলতা বেশি। বিরোধী দলের মতামত, জনগণের গণরায় কে উপেক্ষা করা সরকারের সবচেয়ে বড় সফলতা। কেননা ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর সকল দলের মতামতের ভিত্তিতে যে “জুলাই সনদ” স্বাক্ষরিত হয়েছিল। বর্তমান সরকার তা সম্পূর্ণভাবে পাশ কাটিয়ে তাদের নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ৭০ শতাংশ মানুষ গণভোট দিল সেই রায়কে মূল্যায়ন না করে নিজেদের মতো করে দেশ পরিচালনা করে যাচ্ছে সরকার। অপরদিকে সরকারের সফলতা সকল সিটি কর্পোরেশনে নির্বাচন না দিয়ে নিজের লোক বসিয়ে কাজ চালানো। উদ্দেশ্য নিজেদের বিজয় নিশ্চিত করে সিটি কর্পোরেশনে নির্বাচন দেয়া। স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও একই পদ্ধতি অবলম্বন করছে। দেশের জনগণ এ জন্য কি ফ্যাসিবাদীকে বিতাড়িত করেছে?
সরকারের অন্যতম অপর এক সফলতা সংসদীয় কমিটিগুলোতে বিরোধী দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত না করা। এমনকি এমপিদের সুযোগ সুবিধা সমভাবে বন্টন না করা। সামাজিক উন্নয়নে সংসদ সদস্য গণ যে বরাদ্দ পেয়ে থাকেন তা সুপরিকল্পিতভাবে বিরোধী দলকে না দেয়ার পাঁয়তারা।
আশা করব সরকার গণরায় কে আমলে নিয়ে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নিবেন। তা নাহলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে এর দায় সরকারকেই বহন করতে হবে।
নতুন সরকার কিছু ক্ষেত্রে দৃশ্যমান শিক্ষা, কৃষি, সামাজিক নিরাপত্তা, পরিবেশ, জ্বালানি, প্রশাসন ও রাজনৈতিক একাধিক পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও তা বিতর্কিত উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবুও বলব এসব পদক্ষেপ দেশের উন্নয়নের জন্য একটি ইতিবাচক দিক। তিন মাসে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের বাইরে যা দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আসা দরকার ছিল সাধারণ মানুষ হতাশ! কর্মসংস্থান সৃষ্টি না করে খাল খননে ব্যস্ত ছিল সরকার অথচ খালের মাটি নিয়ে গেছে এক শ্রেণির মানুষ।সাধারণ মানুষ অর্থনৈতিক চাপে আছে।
সামাজিক অস্থিরতা কমে তো নাই বরং বৃদ্ধি পেয়েছে। কিশোর গ্যাং, নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ, ধর্ষণ এগুলোর মাত্রা বেড়েছে বলা যায়। সামগ্রিকভাবে নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক সমাজ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত সফল বলা যাবে না। জনগণের প্রত্যাশা অনেক বেশি, দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সরকার গঠিত তাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো স্বচ্ছতা বজায় রেখে প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবে রূপ দেয়া। আসন্ন বাজেট স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতায় সরকার ও বিরোধীদল কতটুকু ভূমিকা পালন করবে তা বিবেচনার বিষয়। বাজেট নিয়ে সাধারণ ব্যক্তি হিসেবে আমার ভাবনার জায়গা অনেক। আমি একজন সাধারণ নাগরিক এবং দায়িত্বের জায়গা থেকে মনে হয়েছে সংসদের ভিতরে যেমন কথা বলার সুযোগ আছে তেমনি আমি কলমের মাধ্যমে একটু লেখি যাতে জনগণ তাদের মতামত শেয়ার করতে পারে।
একটি দেশের উন্নয়ন ও অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি সে দেশের বাজেট পরিকল্পনা। পরিতাপের বিষয় আমাদের দেশে বার্ষিক বাজেট গতানুগতিক। ফলে বাজেটে কোন মৌলিক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায় না। অথচ মানুষের জীবনমান নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে বার্ষিক বাজেট পরিকল্পনা। স্বাধীনতার পর ১৯৭২সালের জুন মাসে দেশের প্রথম বাজেট পেশ করা হয়। যার পরিমাণ ছিল ৭৮৬ কোটি টাকা। রাজস্ব আয় বেশি না থাকার কারণে বাজেটের পরিমাণ ছিল খুবই ছোট। পরবর্তীতৈ বাজেটের আকার বৃদ্ধি পেলেও রাজস্ব আয়ের তুলনায় ব্যয় দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় ঘাটতির পরিমাণ বছরের পর বছর বেড়েই যাচ্ছে। বিশেষ ২০০০ সালের পর থেকে দ্রুত বৃদ্ধি লক্ষ্য করা যায়। ২০২২ সালের পর ঘাটতির পরিমাণগত ও শতাংশগত উভয় দিক থেকে কমে আসে, তবে তা এখন ২৫ শতাংশের উপরেই রয়ে গেছে।
বিগত সময়ে বাজেট হয়ে উঠেছিল সাধারণ মানুষের শোষণ করার অস্ত্র। লুটপাট আর অর্থ পাচারের মহাউৎসব! ফ্যাসিবাদী সরকার যে পরিমাণ অর্থ লুট করেছে তা কল্পনার অতীত!! পক্ষপাতদুষ্ট একশ্রেণির কাছে বাজেটের ব্যয় হয়ে ওঠেছিল বিলাসী বস্তু। এজন্য বাজেট হয়ে পড়ে জনমানুষের সম্পৃক্ততাহীন শুধু একটি সরকারি বাজেট।
অনেক রক্ত ঝরিয়ে ২৪-এর জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর আগামী অর্থবছরের (২০২৬-২০২৭) বাজেট পাশ হবে জাতীয় সংসদ অধিবেশনে। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রতিফলন দেখতে চাই এই বাজেটে। দুর্নীতি মুক্ত, শোষণমুক্ত মানবীয়, ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ গঠনে রাষ্ট্রীয় কাঠামোগুলোতে গুণগত পরিবর্তনসহ, শিক্ষা, সংস্কৃতি, শিল্প সাহিত্য, নাগরিকদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কাঠামোগত দুর্বলতা, ক্রমবর্ধমান ঋণ নির্ভরতার এবং রাজস্ব আদায়ের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে একটি টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি বিনির্মাণের বাজেট সময়ের দাবি।
জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে অর্থ বছরের জন্য একটি আধুনিক ও ভারসাম্যপূর্ণ বাজেটের রূপরেখা প্রণয়নই হবে বর্তমান সময়ে প্রধান লক্ষ্য যা মানবিক সমাজ গঠনে সহায়ক হতে পারে।
১. সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি জরুরি, বেকার যুবকদের হাতে কাজ দরকার। বেকারত্ব রোধে ভারী শিল্প তৈরির আগে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প কারখানা ব্যাপকভাবে করা। এর ফলে বিপুল জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান হবে অল্প সময়ের মধ্যে। অতঃপর ভারী শিল্পায়নে মনোযোগী হওয়া।
২. জনবান্ধব ট্যাক্স সিস্টেম দরকার যাতে সব শ্রেণির মানুষ ট্যাক্স দিতে উৎসাহিত হয়। প্রয়োজনে ট্যাক্স পেয়ারদের বিশেষ নাগরিক সুবিধার আওতায় আনা যেতে পারে। ট্যাক্সের বোঝা কমিয়ে ট্যাক্সের আওতা বাড়ানোর দরকার।
৩. স্থিতিশীল অর্থনীতি উন্নয়নে প্রয়োজন, জন কল্যাণমূলক বাজেট।
৪. দুর্নীতির কমানোর জন্য যাদের টাকা ও সম্পদ এ পর্যন্ত বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে অথবা হবে তাদের একটা তালিকা, বাজেয়াপ্ত অর্থের পরিমাণ এবং একটা আলাদা তহবিল গঠন করে উল্লেখ পূর্বক ওয়েব সাইটে প্রকাশ করা, উক্ত সম্পদ দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিতরণ এবং দৃশ্যমান উন্নয়ন প্রকল্পে বিনিয়োগ করা।
উক্ত প্রক্রিয়ায় তালিকায় নাম থাকার ভয়ে দুর্নীতিবাজরা সতর্ক বা সাবধান হতে বাধ্য হবে, দুর্নীতি করে অর্থ উপার্জন দুঃসাধ্য হয়ে যাবে।
৫. দেশের অন্যতম প্রধান আর্থিক খাত ব্যাঙ্ক ও বিমা সেক্টরের ব্যাপক দুর্নীতি ও অর্থপাচার রোধে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক নীতি গ্রহণ করা জরুরী। যাতে জনগণের টাকা কেউ আত্মসাৎ করতে না পারে। কেননা দুর্নীতিবাজদের কালো টাকা আয়ের প্রধান উৎস এই খাত। এক্ষেত্রে ব্যাংক ও বীমা র সাথে ন্যূনতম যোগসূত্র থাকা ব্যক্তিবর্গকে কালো টাকাকে সাদা করতে না দেয়া।
৬. বিদ্যুৎ খাতে বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধির থেকেও কঠোরভাবে দুর্নীতিমুক্ত রাখা অত্যন্ত জরুরি। বিদ্যুৎ খাতের সাথে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলো দ্রত শেষ করার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
৭. শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি করার পাশাপাশি মেধা পাচার রোধে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করতে হবে। শিক্ষা বাজেট হওয়া উচিত শিক্ষার মান উন্নয়ন এবং শিক্ষকদের চাহিদার বহিঃপ্রকাশ। বাজেট ব্যয় জরুরি শিক্ষায়। অবকাঠামোগত ব্যয় হ্রাস, অপ্রয়োজনীয় লোক দেখানো প্রশিক্ষণ বন্ধ, বিভিন্ন প্রজেক্টের নামে অপচয় রোধ, শিক্ষকদের বেতন কাঠামো এবং জীবন মান উন্নয়নসহ স্থায়ী ও টেকসই এবং সময়োপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করতে হবে। যুক্তিনির্ভর এবং বিজ্ঞানমনস্ক শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করতে হবে। বিগত সময় দেখা গেছে এখাতে বরাদ্দ ১৪% এর মধ্যে। কখনও এর নিচে। ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে এর বরাদ্দ ছিল ১১.৮৮% যা জিডিপির ০.৬৯%। এই সেক্টরকে যুগ উপযোগী আধুনিক, দক্ষ যোগ্যতা সম্পন্ন মানুষ গড়ে তুলতে হলে শিক্ষার্থীদের নৈতিক মান বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। এ জন্য শিক্ষা কারিকুলামে অন্তর্ভুক্ত করার পাশাপাশি বাস্তবসম্মতভাবে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। তাহলে শিক্ষার্থী পরবর্তী জীবনে দুর্নীতি, ঘুষসহ বিভিন্ন অপরাধের জড়িয়ে পরবে না।
৮. ষাট এর দশকের উন্নয়ন প্রকল্পগুলি এখনো বাস্তববায়ান হয়নি, সেগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দ্রুত বাস্তবায়ন স্বাপেক্ষে আরো উন্নয়নমূলক টেকসই প্রকল্প প্রতিবছর হাতে নিতে হবে এবং সেগুলো তিন পাঁচ অথবা সর্বোচ্চ সাত বছরের মধ্যে বাস্তবায়িত করতে হবে এবং সেভাবে বাজেট বরাদ্দ রাখতে হবে। এভাবে উন্নয়ন জট কমিয়ে আনতে হবে।
৯. জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহত,আহত, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের চিকিৎসা, শিক্ষাসহ জীবন যাপনের মান উন্নয়নে বরাদ্দ রাখা। এখানে যাতে কেউ দুর্নীতি করতে না পারে তার জন্য কঠোর মনিটরিং ব্যবস্থা থাকা।
একটি দেশের উন্নয়নের তিনটি খাত খুবই গুরুত্বপূর্ণ তাহলো শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষি। অথচ খাতগুলোতে বরাদ্দ কম থাকে। কিন্তু উন্নয়ন ব্যয়ে বরাদ্দ বেশি। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির ব্যয় কমিয়ে আনা প্রয়োজন। উন্নয়ন ব্যয়ে দুর্নীতি ও অনিয়মের ফলে অন্যান্য দেশের তুলনায় আমাদের দেশে ব্যয় বেড়েছে। আমাদের দেশে মহাসড়ক নির্মাণে কিলোমিটার প্রতি ব্যয় ভারতের তুলনায় ৪.৪ গুণ এবং চীনের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের ওপর দাঁড়িয়ে আজকের বাংলাদেশ। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন যেমন গণ দাবি তেমনি একটি কার্যকর, স্বচ্ছ ও ভারসাম্যপূর্ণ বাজেট দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি জনআকাক্সক্ষা। দেশের রাজস্ব আয় শক্তিশালী না হওয়ায় দেশের অর্থনীতি অত্যাধিক ঋণ নির্ভর। ফলে অদক্ষতা, দুর্নীতি, অনিয়ম এবং বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা বাজেট কার্যক্রমে বড় বাঁধা। কর ব্যবস্থা সংস্কার, অপচয় ও দুর্নীতিরোধ, সুশাসন, জবাবদিহিতা, জনকল্যাণমূলক কাজে স্বচ্ছতা নিশ্চিত না করতে পারলে গতানুগতিক বাজেট জনগণের জন্য কোন কল্যাণ বয়ে আনবে না।
টেকসই উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পথে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে দলমত নির্বিশেষে সকলকেই একটি ভারসাম্যপূর্ণ, যুগউপযোগি বাজেট প্রণয়নে ভূমিকা রাখা জরুরি।