আরএসএস প্রধানের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার আহ্বান

সরদার আবদুর রহমান, রাজশাহী ব্যুরো : ভারতের রাজ্যগুলোতে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর উপর দমন-পীড়ন নীতি নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেছে যুক্তরাষ্ট্রের একটি সংস্থা। এর জেরে সর্বশেষ এ সপ্তাহে ভারতের রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ বা আরএসএসের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানায় যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা কমিশন (ইউএসসিআইআরএফ) নামের সংস্থাটি। তবে এই দাবির তীব্র সমালোচনা করেছে ভারত। নয়াদিল্লি সংস্থাটিকে ‘পক্ষপাতদুষ্ট সংগঠন’ বলে অভিহিত করেছে।

ইউএসসিআইআরএফ (USCIRF) হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল সরকারের একটি স্বাধীন ও দ্বি-দলীয় সংস্থা। এর পুরো নাম যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা কমিশন (United States Commission on International Religious Freedom) । ১৯৯৮ সালের আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা আইনের মাধ্যমে এটি গঠিত হয়। বিশ্বজুড়ে ধর্মীয় স্বাধীনতার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও কংগ্রেসকে নীতিগত সুপারিশ প্রদান করাই এর প্রধান কাজ। এর বৈশিষ্ট্য হলো, আন্তর্জাতিকভাবে ধর্মীয় বিশ্বাসের স্বাধীনতা লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করা। তারা বিভিন্ন দেশের ধর্মীয় স্বাধীনতার অবস্থা তুলে ধরে মার্কিন নীতিনির্ধারকদের কাছে সুপারিশ পেশ করে থাকে। তবে এই সুপারিশগুলো মানা মার্কিন সরকারের জন্য বাধ্যতামূলক নয়।

ভারতের ঘটনাবলিতে উদ্বেগ

সংস্থাটি ভারতের সংখ্যালঘু বিষয়ক ঘটনাবলিতে উদ্বেগ জানিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে এবছর ৬ ফেব্রুয়ারি। এর ওয়েবসাইট থেকে প্রাপ্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সংস্থাটি মার্কিন সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে যেন তারা ভারতীয় কর্মকর্তাদেরকে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার জন্য দায়ী ব্যক্তিদেরকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে চাপ দেয়। এতে বলা হয়, গত কয়েক মাসে হিন্দু জাতীয়তাবাদী জনতা কর্তৃক খ্রিষ্টানদের লক্ষ্য করে সহিংস হামলা বেড়েছে। এর চেয়ারম্যান ভিকি হার্টজলার বলেন, “শুধুমাত্র জানুয়ারি মাসেই খ্রিষ্টানদের উপর একের পর এক ভয়াবহ হামলা হয়েছে। আমরা বিশেষ করে উড়িশ্যায় একটি বাড়ির ভেতরে রোববারের প্রার্থনা পরিচালনা করার সময় যাজক বিপিন বিহারী নায়েককে একটি হিন্দু জনতার মারধরের ঘটনায় উদ্বিগ্ন। জনতা তাঁর বিরুদ্ধে জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণের অভিযোগ তোলে, তাঁকে বাইরে টেনে নিয়ে যায় এবং গোবর খেতে বাধ্য করে।”

এতে উল্লেখ করা হয়, খ্রিষ্টান যাজকদের উপর সাম্প্রতিক হামলা ও হয়রানি ভারতজুড়ে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের লক্ষ্য করে ক্রমবর্ধমান ধ্বংসযজ্ঞ, হয়রানি এবং ভাঙচুরের মাত্রাকে আরো বাড়িয়ে তুলেছে। যাজক নায়েকের উপর জানুয়ারির হামলা ছাড়াও মহারাষ্ট্রে একটি হিন্দু জাতীয়তাবাদী জনতা চারটি খ্রিষ্টান পরিবারের বাড়িঘর ভেঙে দেয়। কারণ তারা তাদের ধর্মবিশ্বাস ত্যাগ করতে অস্বীকার করেছিল। একই মাসে, অন্ধ্র প্রদেশে হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা ইভানজেলিক্যাল খ্রিষ্টানদের একটি মিনিবাসে হামলা চালায়, গাড়িটিতে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং যাত্রীদের ক্রিকেট ব্যাট ও পাথর দিয়ে মারধর করে। ফেব্রুয়ারিতে ছত্তিশগড়ে আরেকটি হিন্দু জনতা এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে হিন্দু মন্দির অপবিত্র করার অভিযোগ তুলে প্রায় ছয়টি মুসলিম বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়।

সংস্থার ভাইস চেয়ারম্যান আসিফ মাহমুদ বলেন, “স্বঘোষিত জনতা (মব) বারবার ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নির্বিচার আটক এবং ভয়াবহ হামলাকে ন্যায্যতা দিতে ‘জোরপূর্বক ধর্মান্তরের’ অভিযোগ ব্যবহার করেছে।” বলা হয়, ভারতের বেশ কয়েকটি রাজ্য এখন ‘জোরপূর্বক ধর্মান্তরের’ অভিযোগে কোনো ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করার লক্ষ্যে কথিত ধর্মান্তর-বিরোধী আইনকে আরো শক্তিশালী করেছে। যাতে এই আইনের মাধ্যমে যেনতেন অভিযোগেই তাদের দায়ী করা যায়। এর প্রমাণ হলো, সম্প্রতি উত্তর প্রদেশে শুধুমাত্র একটি ব্যক্তিগত বাড়ির ভেতরে প্রার্থনা করার জন্য ১২ জন মুসলিম পুরুষের গ্রেপ্তার। কিছু রাজ্যে ‘মিথ্যা’ অভিযোগে অভিযুক্তদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পর্যন্ত হতে পারেÑ যা ধর্মীয় স্বাধীনতার এক চরম লঙ্ঘন।

এর আগে ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে ইউএসসিআইআরএফ ( USCIRF ) মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরকে ভারতের পদ্ধতিগত, চলমান এবং চরম ধর্মীয় স্বাধীনতা লঙ্ঘনের জন্য ‘বিশেষ উদ্বেগের দেশ’ হিসেবে চিহ্নিত করার সুপারিশ করে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে ইউএসসিআইআরএফ ভারতে পদ্ধতিগত ধর্মীয় নিপীড়নের বিষয়ে একটি হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করে। জানুয়ারিতে ইউএসসিআইআরএফ খ্রিষ্টানদের ধর্ম বা বিশ্বাসের স্বাধীনতা লঙ্ঘনের বিষয়ে একটি শুনানির আয়োজন করে।

আরএসএস-এর ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার আহ্বান

সর্বশেষ আরএসএস-এর উপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার আহ্বান জানায় ইউএসসিআইআরএফ। আগামী ২৯ আগস্ট নিউইয়র্ক সফরে যাওয়ার কথা রয়েছে আরএসএসের প্রধান মোহন ভাগবতের। গতকাল ২২ আগস্ট প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে জানা যায়, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ বা আরএসএসের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানালে ভারত ইউএসসিআইআরএফ-এর সমালোচনা করে। অনলাইন এনডিটিভি জানায়, এ প্রসঙ্গে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, “মার্কিন এই সংস্থা দীর্ঘদিন ধরে ভারতের বিরুদ্ধে ‘অবমাননাকর ও উসকানিমূলক মন্তব্য’ করে আসছে।” ওই সংস্থার বিষয়ে জয়সওয়াল বলেন, “এটি একটি পক্ষপাতদুষ্ট সংগঠন। আমার মনে হয়, এ ধরনের সংগঠন থেকে আমাদের দূরে থাকা উচিত। কারণ তাদের নিজস্ব এজেন্ডা রয়েছে এবং তাদের কোনো বিশ্বাসযোগ্যতা নেই। আমরা আশা করি না যে ইউএসসিআইআরএফ ভারতের বহুত্ববাদী কাঠামোর বাস্তবতাকে বিবেচনায় নেবে কিংবা দেশটির বিভিন্ন সম্প্রদায়ের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানকে স্বীকার করবে।”

প্রতিবেদনে জানানো হয়, মার্কিন এই সংস্থাটি ওয়াশিংটনের প্রতি আরএসএস নেতাদের কূটনৈতিক সৌজন্য না দেখানোরও আহ্বান জানিয়েছে। তারা আরএসএসকে একটি ‘ছাতাসদৃশ সংগঠন’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেছে, এর অধীনস্থ বিভিন্ন সংগঠন ‘ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা চালিয়েছে’। সংস্থাটি বলেছে, “এর পরিবর্তে মার্কিন সরকারের উচিত ধর্মীয় বিশ্বাসের স্বাধীনতা লঙ্ঘনের জন্য দায়ী আরএসএসের সদস্যদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের দিকে মনোযোগ দেয়া।”