কূটনৈতিক রিপোর্টার: রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য টেকসই ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরও সমন্বিত ও কার্যকর ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
গতকাল শনিবার রাজধানীর হোটেল শেরাটনে ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটি (আইআরসি) আয়োজিত Confluence 2026: A Convening of Partnership, Appreciation and Commitment অনুষ্ঠানে এই আহ্বান জানানো হয়। মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের আগমনের নয় বছর পূর্তি এবং শরণার্থী সংকটের আগামীদিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় করণীয় আলোচনার লক্ষ্যে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে আলোচক হিসেবে অংশ গ্রহণ করেন, প্রধান অতিথি হিসেবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির, ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটির এশিয়া অঞ্চলের উপ-আঞ্চলিক পরিচালক হাসিনা রহমান, রোহিঙ্গা মানবাধিকার কর্মী মিস লাকি করিম, এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর, মহাপরিচালক (সচিব) ড. মোহাম্মদ জাকারিয়া; শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান; অ্যাকশনএইড বাংলাদেশ এর কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির; বিশ্বব্যাংক এর ডিভিশনাল ডিরেক্টর (বাংলাদেশ ও ভুটান) জ্যাঁ পেসমে; অস্ট্রেলিয়ান হাইকমিশন বাংলাদেশ এর কর্মকর্তা হামাহ হোসেন এবং আইআরসি বাংলাদেশের অ্যাক্টিং কান্ট্রি ডিরেক্টর মোহাম্মদ রিয়াসসহ অন্যান্যরা। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন আইআরসি’র রিজিওনাল আডভোকেসি স্পেশালিষ্ট সাবিরা সুলতানা নুপুর।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ, কূটনৈতিক মিশন, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক এনজিও, শিক্ষাবিদ এবং রোহিঙ্গা সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। হুমায়ুন কবির বলেন, “রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে টেকসই ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সম্মিলিতভাবে কাজ করে মিয়ানমারের ওপর অর্থবহ চাপ সৃষ্টি করতে হবে। পাশাপাশি তৃতীয় দেশে পুনর্বাসন এবং রোহিঙ্গাদের জন্য অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের সুযোগ সম্প্রসারণের মাধ্যমে বাংলাদেশকে এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের বোঝা বহনে সহায়তা করতে হবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে। রোহিঙ্গা সংকটকে কোনোভাবেই একটি বিস্মৃত সংকটে পরিণত হতে দেওয়া যাবে না।”
তিনি আরও বলেন “প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে সরকার রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানকে আমাদের বৈদেশিক নীতির অন্যতম সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে গ্রহণ করেছে। আমরা কেবল মানবিক সহায়তার মাধ্যমে এই সংকট পরিচালনা করতে চাই না; বরং রোহিঙ্গা সংকটের একটি টেকসই ও স্থায়ী সমাধান অর্জনে আমরা দৃঢ়ভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”
ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটির এশিয়া অঞ্চলের উপ-আঞ্চলিক পরিচালক হাসিনা রহমান বলেন, “এই মানবিক সংকটের নয় বছর কেটে গেছে, গতানুগতিক ধারায় আমরা এই সংকটকে সামনের বছরগুলোতে মোকাবেলা করতে পারব না। মানবিক সহায়তার তহবিল কমে আসছে এবং বিশ্বের মনোযোগ এই সংকট থেকে অন্যদিকে সরে যাচ্ছে, আমাদের অবশ্যই সম্মিলিতভাবে পরিকল্পনা করতে হবে । এই সংকটের টেকসই সমাধানে ও সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।”
রোহিঙ্গা মানবাধিকার কর্মী মিস লাকি করিম বলেন, “যেকোনো প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে মিয়ানমারের রাখাইনে শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করতে হবে। রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছায় ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশের আশ্রয়শিবিরে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা ও টেকসই জীবিকা অর্জনের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে মানবিক সহায়তার ওপর তাদের নির্ভরশীলতা কমে।”
অনুষ্ঠানে দুটি প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে সরকার, দাতা সংস্থা, মানবিক কার্যক্রমে সম্পৃক্ত সংস্থার প্রতিনিধি এবং শিক্ষাবিদরা রোহিঙ্গা সংকটের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করেন। তারা রোহিঙ্গা শরণার্থী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অধিকার ও আকাঙ্ক্ষাকে কেন্দ্রে রেখে দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনের ওপর গুরুত্ব দেন। পাশাপাশি, দাতা দেশ ও সংস্থাগুলোকে এই রেসপন্সের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা অব্যাহত রাখার আহবান জানান।