স্টাফ রিপোর্টার, গাজীপুরঃ
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি)-তে সরকারি আদেশ বাস্তবায়নকে কেন্দ্র করে তালা, সংঘাত ও তদন্ত নিয়ে চলমান বিতর্কের মধ্যেই এবার নিয়োগ-পদোন্নতি এবং প্রবিধানমালা সংশোধন নিয়ে নতুন করে আইনি প্রশ্ন উঠেছে। প্রস্তাবিত ব্রি প্রবিধানমালা-২০২৫ অনুমোদনের আগ পর্যন্ত সব নিয়োগ ও পদোন্নতি কার্যক্রম স্থগিত এবং বিতর্কিত ডিপিসি-২-এর পুরোনো সুপারিশ ৯৩তম বোর্ড সভায় অনুমোদনের উদ্যোগ বন্ধের দাবি জানিয়ে গত ১১ আগস্ট ২০২৬ পুনরায় লিগ্যাল নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
এর আগে সরকারি আদেশ বাস্তবায়নে বাধা, ব্রির প্রধান ফটক ও প্রশাসনিক ভবনে তালা ঝোলানো, দায়িত্ব পালনে বাধা, পুলিশের সঙ্গে সংঘাত এবং সিসিটিভি ও গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র ক্ষতিগ্রস্ত করার অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত দাবিতে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ সংশ্লিষ্ট সাত কর্মকর্তাকে ৬ আগস্ট আইনি নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। এবার এর সঙ্গে যুক্ত হলো নিয়োগ-পদোন্নতি ও প্রবিধানমালা সংশোধনসংক্রান্ত নতুন দাবি।
প্রবিধানমালা-২০২৫ মন্ত্রণালয়ে--
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ব্রি প্রবিধানমালা-২০১১-এর বিতর্কিত কয়েকটি অনুচ্ছেদ সংশোধনের লক্ষ্যে গঠিত কমিটির সুপারিশ অধিকতর যাচাই-বাছাই ও সংশোধন করে ব্রি প্রবিধানমালা-২০২৫ হিসেবে কৃষি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রস্তাবিত সংশোধনী অনুমোদিত হলে গত ১৫ বছরে রাজনৈতিক কারণে বৈষম্যের শিকার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদোন্নতির সুযোগ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন নিয়োগ ও পদোন্নতির বৈধতা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠতে পারে।
অভিযোগকারীদের দাবি, গত ১৫ বছরে ব্রির নিয়োগ ও পদোন্নতিতে অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে গঠিত কমিটির প্রতিবেদনে বর্তমানে পদোন্নতির জন্য বিবেচনাধীন বেশ কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর নিয়োগ ও পদোন্নতি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। প্রস্তাবিত প্রবিধানমালা অনুমোদিত হলে তাদের কেউ কেউ সংশ্লিষ্ট পদে বৈধভাবে বহাল থাকার যোগ্যতা হারাতে পারেন। একই সঙ্গে ওই সময় বৈষম্যের শিকার হয়ে পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কেউ কেউ প্রকৃত জ্যেষ্ঠতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে পদোন্নতির দাবিদার হতে পারেন বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
৯৩তম বোর্ড সভা নিয়ে আপত্তি---
আইনি নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে, এসব বিষয় তুলে ধরে গত ৩০ মার্চ ২০১৫ তারিখেও একটি উকিল নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে পূর্বনির্ধারিত ৯৩তম বোর্ড সভা স্থগিত করা হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, সাবেক মহাপরিচালকের আমলে গঠিত বিতর্কিত ডিপিসি-২-এর সুপারিশ দীর্ঘ প্রায় চার মাস পর বোর্ড সভায় অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা নীতিসংগত নয়। বিশেষ করে প্রবিধানমালা সংশোধনের প্রক্রিয়া চলমান থাকা অবস্থায় পুরোনো সুপারিশ অনুমোদনের উদ্যোগ নিলে ভবিষ্যতে প্রশাসনিক ও আইনগত জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে বলে তারা আশঙ্কা করছেন।
১০ আগস্টের স্মারক ঘিরে নতুন আপত্তি---
ব্রি স্মারক নং ১২.২২.০০০০.০০০.০৩২.০২.০৩২১.২৬.১৩০১, তারিখ ১০ আগস্ট ২০২৬-এর মাধ্যমে পদোন্নতি বিবেচনা এবং প্রবিধানমালায় না থাকা সত্ত্বেও সৃষ্ট পদে ৯২তম বোর্ড সভায় অনুমোদিত পদসমূহে পদোন্নতির পরিসমর্থনের জন্য ৯৩তম বোর্ড সভা আহ্বান করা হয়েছে বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ অবস্থায় ১১ আগস্ট দেওয়া নতুন লিগ্যাল নোটিশে ৯৩তম বোর্ড সভার কার্যক্রম স্থগিত করে প্রস্তাবিত ব্রি প্রবিধানমালা-২০২৫ দ্রুত অনুমোদনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন এবং প্রবিধানমালা অনুমোদিত না হওয়া পর্যন্ত ব্রিতে সব ধরনের নিয়োগ ও পদোন্নতি কার্যক্রম বন্ধ রাখার দাবি জানানো হয়েছে।
ফটোগ্রাফারকে পদোন্নতি নিয়ে প্রশ্ন--
বিতর্কের আরেকটি বিষয় হিসেবে অভিজ্ঞ মহল প্রশ্ন তুলেছেন, বর্তমান মহাপরিচালক কোন বিশেষ বিবেচনায় ব্রির একজন ফটোগ্রাফারকে পদোন্নতি দেওয়ার জন্য বিতর্কিত ডিপিসি-২-এর পুরোনো সুপারিশ ৯৩তম বোর্ড সভায় অনুমোদনের জন্য এতটা তৎপরতা দেখাচ্ছেন।
তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার যোগ্যতা, পদোন্নতির শর্ত, ডিপিসি-২-এর সুপারিশ এবং বোর্ডে উপস্থাপনের আইনগত বৈধতা যাচাই না করে তাকে নিয়ে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সমীচীন নয়। বিষয়টি নথিপত্র ও প্রযোজ্য প্রবিধান যাচাইয়ের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন।
বৈষম্যের শিকারদের পদোন্নতির দাবি---
অভিযোগকারীদের বক্তব্য, দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিক কারণে যারা নিয়োগ, পদোন্নতি ও অন্যান্য প্রশাসনিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন, তাদের অধিকার পুনর্বিবেচনা না করে বিতর্কিত নিয়োগ ও পদোন্নতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখলে ব্রিতে প্রশাসনিক বৈষম্য আরও দীর্ঘস্থায়ী হবে।
তাদের দাবি, প্রথমে প্রস্তাবিত প্রবিধানমালা-২০২৫ অনুমোদন করা, এরপর নতুন বিধানের আলোকে সংশ্লিষ্টদের জ্যেষ্ঠতা, যোগ্যতা, নিয়োগের বৈধতা ও পদোন্নতির বিষয় পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
আগের আইনি নোটিশের সঙ্গে নতুন দাবি---
এর আগে ৬ আগস্টের আইনি নোটিশে সরকারি আদেশ বাস্তবায়নে বাধা, তালা ঝোলানো, সংঘাত, গুরুত্বপূর্ণ নথি ও ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত করার অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, তথ্য-প্রমাণ সংরক্ষণ এবং তদন্ত চলাকালে স্বার্থের সংঘাত সৃষ্টি করতে পারে এমন প্রশাসনিক দায়িত্ব পুনর্বিবেচনার দাবি জানানো হয়েছিল।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এর সঙ্গে নিয়োগ-পদোন্নতি ও প্রবিধানমালা নিয়ে নতুন আইনি নোটিশ যুক্ত হওয়ায় ব্রির প্রশাসনিক পরিস্থিতি আরও আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে।
এখন নজর বোর্ড ও মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তে---
ব্রি’র মতো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ, পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, প্রযোজ্য বিধি এবং জ্যেষ্ঠতা-যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে আগেভাগে দোষী সাব্যস্ত না করে নিরপেক্ষ তদন্ত ও নথিভিত্তিক যাচাইয়ের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়াই প্রত্যাশিত।
এখন সংশ্লিষ্টদের মূল দাবি-প্রস্তাবিত ব্রি প্রবিধানমালা-২০২৫ অনুমোদনের আগে বিতর্কিত ডিপিসি-২-এর সুপারিশের ভিত্তিতে কোনো পদোন্নতি অনুমোদন না করা এবং ৯৩তম বোর্ড সভার কার্যক্রম পুনর্বিবেচনা করা। শেষ পর্যন্ত কৃষি মন্ত্রণালয় ও ব্রি বোর্ড কী সিদ্ধান্ত নেয়, তার ওপরই নির্ভর করছে চলমান বিতর্কের পরবর্তী গতি।