আমীর হামজা, খোকসা (কুষ্টিয়া) সংবাদদাতাঃ একদিকে ছিল ঈদের আগের আনন্দমাখা অপেক্ষা, অন্যদিকে নিয়তি লিখে রেখেছিল নির্মম এক বিদায়। নাতির জন্য বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকা এক বৃদ্ধ নানা কল্পনাও করতে পারেননি, যার জন্য এত অপেক্ষা— সে আর জীবিত ফিরবে না।
“নানা, আমি আর ১৫ মিনিটের মধ্যে খোকসা বাসস্ট্যান্ডে চলে আসতেছি…” মোবাইল ফোনে বলা এই কথাগুলোই ছিল নাবিলের জীবনের শেষ বাক্য। এর কিছুক্ষণ পরই কুষ্টিয়ার খোকসা শিমুলিয়া (কুঠিপাড়া) ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় থেমে যায় তার জীবনের পথচলা।
শনিবার (২৩ মে) সকাল সাড়ে ১১টার দিকে রাজবাড়ী থেকে কুষ্টিয়াগামী একটি যাত্রীবাহী বাসকে বিপরীত দিক থেকে আসা দ্রুতগতির ড্রাম ট্রাক সজোরে ধাক্কা দেয়। এতে বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশের পুকুরে উল্টে পড়ে। ভয়াবহ এ দুর্ঘটনায় ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজের অর্থনীতি বিভাগের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী নাবিলসহ ৪ জন নিহত হন। আহত হয়েছেন আরও অন্তত ২০ জন।
নাবিল বাড়ি ফিরছিল না, যাচ্ছিল নানার বাড়িতে ঈদ করতে। কারণ এবার তাদের বাড়িতে কোরবানি ছিল না। নানা পিয়ার আলী নিজেই নাতিকে বলেছিলেন, “তুমি আমার বাড়িতে চলে আসো।”
শুক্রবার আসার কথা থাকলেও নতুন জামাকাপড় কেনার কারণে একদিন পরে রওনা দেয় নাবিল। শনিবার সকালে ফোনে জানায়, সে পথে আছে। এরপর আরেকবার বলে— “নানা, আর মাত্র ১৫ মিনিট।” তারপরই বন্ধ হয়ে যায় ফোন।
প্রথমে পরিবার ভেবেছিল, হয়তো মোবাইলের চার্জ শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু অজানা এক শঙ্কা বারবার নাড়া দিচ্ছিল বৃদ্ধ নানার মনে। বাসস্ট্যান্ডে এসে দুর্ঘটনার খবর শুনে ছুটে যান হাসপাতালে। সেখানে গিয়ে দেখেন, সাদা কাপড়ে ঢাকা পড়ে আছে তার আদরের নাতি।
হাসপাতালের করিডোরে দাঁড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন পিয়ার আলী। বারবার জ্ঞান হারাতে হারাতে তিনি বলেন, “ও তো ঈদ করতে আসছিল… আমি জানতাম না, এটাই ওর শেষ আসা…”
নাবিলের পরিবার জানায়, অনেক কষ্ট করে তাকে পড়াশোনা করাচ্ছিলেন মা-বাবা। বাবা ছোট ব্যবসা করেন। পরিবারের স্বপ্ন ছিল— একদিন ছেলে বড় চাকরি করবে, সংসারের হাল ধরবে। কিন্তু একটি বেপরোয়া ট্রাক মুহূর্তেই সব স্বপ্ন চূর্ণ করে দেয়।
খবর পেয়ে স্থানীয় লোকজন ও ফায়ার সার্ভিস দ্রুত উদ্ধার অভিযান চালায়। আহতদের খোকসা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে নাবিলসহ দুজনকে মৃত ঘোষণা করা হয়। পরে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও দুজন মারা যান। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন দৌলতপুরের ফিলিপনগর এলাকার রফিয়া (২০)। অপর দুইজনের পরিচয় এখনো শনাক্ত করা যায়নি।
খোকসা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) জানান, আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। কুষ্টিয়া হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু ওবায়েদ জানিয়েছেন, দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত চলছে।
কিন্তু তদন্ত শেষ হলেও হয়তো একটি প্রশ্নের উত্তর কখনও মিলবে না— একজন নানার সেই ১৫ মিনিটের অপেক্ষা কেন আজীবনের কান্নায় পরিণত হলো?